
স্টিফেন থানায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল এগারোটা বেজে যায়। থানার চারপাশে সে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। নতুন থানা যেই রকম টা ভেবেছিল বাস্তবে সেইরকম নয়। থানায় তেমন লোকজন নেই। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া যেন পুরো থানা নিস্তব্ধ।ডেস্কের পেছনে বসা অফিসারটি উদাস চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এগিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। টেবিলের পেছনে বসে থাকা একজন মাঝবয়সী কনস্টেবল অলস ভঙ্গিতে একটা পুরনো খবরের কাগজ পড়ছিল।
"আমি ইন্সপেক্টর স্টিফেন ব্লাকউড। আজ থেকে এখানে পোস্টিং।" স্টিফেন হালকা গলায় বলল।
কনস্টেবল চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে তাকাল।
"ও, আপনিই আসবেন বলেছিল উপর থেকে। আমি কনস্টেবল মার্টিন।" বলল কনস্টেবল মার্টিন।
স্টিফেন এগিয়ে গিয়ে বলল, " আমি অফিসার ক্লার্কের সাথে দেখা করতে এসেছি। জরুরি বিষয়। উনি বলেছিলেন থানায় এসেই যেন উনার সঙ্গে দেখা করি”
কনস্টেবল চশমা খুলে হাতে নিল। শার্টের হাতা দিয়ে চশমা মুছে আবার চোখে পরল। তারপর বলল,
"আপনার একটু আগে আসা উচিত ছিল, স্যার। উনি কিছু জরুরি কাজে একটু আগেই বেরিয়ে গেছেন। আপনার জন্য একটা রুম ঠিক করা হয়েছে। থানা সম্পর্কে কিছু বলার নেই। থানাটা যেমন দেখছেন ঠিক তেমনই। মানুষ কম তবে ঝামেলা বেশি। তবে বেশিরভাগ সময় শুয়ে বসে কাটে। অফিসার ক্লার্ক বলেছেন থানায় এসেই কাজে লেগে পড়তে। ডেস্কের ওপর কিছু ফাইল রেখে গেছেন আপনার জন্য।”
“বসে শুয়ে কাটে কেন?” জিজ্ঞেস করল স্টিফেন।
“সেটা আপনি কয়দিন পরেই বুঝতে পারবেন” বলেই আবার পত্রিকা পড়ার মনোযোগ দিল মার্টিন।
স্টিফেন তার জন্য রাখা রুমের ভেতর প্রবেশ করলো।স্টিফেন একবার রুমের চারপাশটা দেখে নিল। দেয়ালের রং উঠে গেছে, ছাদের কোণায় স্যাঁতসেঁতে দাগ। একটা পুরনো চেয়ার টেবিল আর টেবিলের উপর রাখা একগাদা পুরনো রেকর্ডের ফাইলের স্তূপ।
এছাড়াও ওর নজর চলে যায় দেয়ালের কোনা ধরে ঝুলে থাকা নোটিশ বোর্ডের উপর।পুরনো নোটিশ বোর্ডে মাকড়সার জাল বাসা বেঁধেছে। স্টিফেন চেয়ারে বসে ফাইল গুলো নিয়ে বসে পড়লো।
পুরো সকাল দুই বোন বৃষ্টিতে ভিজে খেলাধুলা করেছে তাই এখন শরীরে হালকা জ্বরের মতো অনুভূতি হচ্ছে।দুজনেই কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় রাত নামতেই গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। শহরের মানুষের কাছে এটা কেবলমাত্র সন্ধ্যা তখন এখানের মানুষ ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
“সবাই ঘুমিয়ে পরেছে।চলো এটাই সুযোগ। কেউ কিচ্ছু জানতে পারবে না” বলল সারা
“কি করবি ?” জিজ্ঞেস করল রেবেকা।
“ওইযে ওই ঘরটার কথা ভুলে গেছো ? বললাম না আজকে ওখানে কি আছে দেখবো” বলল সারা ।
রেবেকা মুখে কিছু বললো না কেবল মাথা নাড়ায়।দুই বোন চুপিচুপি বিছানা থেকে নেমে পড়লো। নিঃশব্দে দরজা খুলে করিডোর ধরে হেঁটে হলওয়েতে এসে পৌঁছায়। হলওয়েতে এসে অন্য আরেকটা করিডোরে এগিয়ে গেল।এই করিডোরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত সেই ঘরটা। আশেপাশে কেউ নেই। সবাই ঘুমে বিভোর।হাঁটতে হাঁটতে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দুজনে বেশ কৌতূহল হয়ে আছে ভেতরে কি আছে দেখার জন্য।
রেবেকা ধীরে ধীরে দরজার লোহার হাতল টা চেপে ধরলো। একটা মৃদু কড়কড়ে আওয়াজ তুলে দরজা টা খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার। বাতাসের মধ্যে একটা ভ্যাপসা গন্ধ। গন্ধটা কোন মৃত প্রাণীর শরীর থেকে আসা পচা গন্ধের মতোই। দুর্গন্ধে দুজন নাক চেপে ধরলো। সারা টর্চ লাইট জ্বালিয়ে নিল। দুইজনের হাতে দুটো টর্চ লাইট আছে। ঘরের ভেতর প্রবেশ করে পেইন্টিং এর দিকে এগিয়ে গেল। পেইন্টিং টা সরাতেই সেই কাঠের দরজা দেখা গেল। রেবেকা দরজাটা খুলে নিল। দরজা খুলতেই দরজার ওপাশে একটা সরু সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে মাটির ভেতর।দুজন একে অপরের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর রেবেকা বলল , “যাবি ? এত রাত হয়ে গেছে।
সিঁড়িটা অনেক নিচে নেমে গেছে।
টর্চের আলো দিয়েও শেষটা দেখা যাচ্ছে না।”
“এসেই যখন পরেছি তখন যাই। গিয়ে দেখে আসি ওখানে কি আছে। হয়তো কোন গুপ্তধন থাকতে পারে কিংবা কোন গুপ্ত পথ। এই বাড়িতে একটা সময়ে জমিদার বাস করতো। শুনেছি এইসব জমিদাররা বাড়িতে একটা গোপন পথ রাখতো। যাতে শত্ররা আক্রমণ করলে লুকিয়ে পালিয়ে যেতে পারে।” বলল সারা
“ঠিক আছে চল তবে।” বলল রেবেকা।
টর্চের আলোয় দুইবোন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতে লাগলো।যতই হাটছে তবুও যেন সিঁড়ি শেষ হচ্ছে না।টর্চের আলো দিয়েও শেষটা দেখা যাচ্ছে না। তবুও দুইবোন বেশ আগ্রহ নিয়ে নিচের দিকে এগিয়ে যায়।একটা সময় সিঁড়ি শেষ হয়ে যায়। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটা ছোট লোহার তৈরি দরজা দেখা যায়। দরজার পাশেই দুটো চাবি ঝুলছে। রেবেকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেয়। একটা ছোট ঘরে গিয়ে পৌঁছায় দুজনে।পুরো ঘর ঘর জুড়ে ছড়ানো ধুলো আর মাকড়সার জাল।যেন শতবছর ধরে এখানে কেউ প্রবেশ করেনি।ঘরের এক কোণে পুরনো কাঠের একটা বাক্স পড়ে আছে।রেবেকা বাক্সটা খুলতেই মেঝেতে একটা ভারী শব্দ হলো।বাক্সের ভেতর কিছু পুরনো বই ও কাগজপত্র রাখা ছিল, জংধরা একটা ছোট চাবি আর একটা মোড়ানো কাগজের গুচ্ছ। রেবেকা বইটা রেখে বাক্সটা বন্ধ করে দিল। টর্চের আলোয় পুরো ঘরটা দেখার চেষ্টা করলো।পুরো ঘরের দেয়ালে অসংখ্য অদ্ভুত সব লেখা আঁকা রয়েছে। ছবি গুলো ভয়ংকর আর বিচ্ছিরি রকমের দেখতে। ঘরের মধ্যে অসংখ্য কাগজ পত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এছাড়া একটা বড় সদর দরজার মতো দরজা আছে। কিন্তু তালা লাগানো। রেবেকা পুরনো চাবি দিয়ে খোলার চেষ্টা করে কিন্তু কোন লাভ হয় না। অগত্যা রেবেকা তার বোনকে নিয়ে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।ঠিক আগের মতো দরজা গুলো বন্ধ করে নিজেদের ঘরে এসে শুয়ে পড়ে।
রাতের বেলা।সারা ও রেবেকা তাদের বেডরুমে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও সারা টের পেলো তাদের ঘরে যেন কেউ বা কিছু ঢুকেছে। কেউ যেন একজন অনুপ্রবেশ করেছে তাদের বেডরুমে। রেবেকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।সে কতটুকু টের পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে না।সারার সজাগ হলেও কম্বলের বাইরে বের হয় না।মুখটা কম্বল দিয়ে ঢাকা।ভয়ে কি হচ্ছে দেখার সাহস নেই তার। ঘরের ভেতর কেউ প্রবেশ করলে দরজা খোলা বা বন্ধ করার শব্দ শোনা যেত। কিন্তু ঘরের দরজা খোলা বা বন্ধ হওয়ার শব্দ তার কানে আসেনি কিন্তু তা স্বত্তে ও সারার মনে হতে লাগল কেউ যেন তার বেডরুমে ঢুকেছে।সে পুরো ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্পষ্ট অনুভব করছে তার হাঁটা চলার চাপা শব্দ।খুব নিঃশব্দে হেঁটে বেড়াচ্ছে যেন সে। হঠাৎ সারার মনে হতে লাগল কেউ যেন ওর বিছানার শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কিন্তু শোবার আগে সে বেডরুমের দরজাটা ভালো করে এটে লক করে শুয়েছিল। বাইরে থেকে কারোর ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব না। তাহলে ঘরের ভেতর কে এমন নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এই কনকনে শীতের রাতেও সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে উঠল সারার শরীর। অজানা আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে এলো ওর।
".. রেবেকা শুনছো কেউ মনে হয় এসেছ আমাদের ঘরে?" হালকা শব্দ করে করে বলে উঠল সারা ।
রেবেকা তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।একাকী ঘরে ওর কথাগুলো কেমন যেন শূন্যগর্ভ ফাঁকা আওয়াজের মতো শোনাল।মনে সাহস নিয়ে পুরো বেডরুম টা একবার চোখ বুলিয়ে নিল।রুমে কেউ নেই।অথচ কিছুক্ষণ আগে মনে হয়েছিল কেউ যেন ছিল তার ঘরে। দাঁড়িয়েছিল ঠিক তার বিছানার কাছেই। তার নিঃশব্দ উপস্থিতি সে স্পষ্ট অনুভব করেছে। ঘামে জ্যাবজ্যাব করছে তার পুরো শরীরটা।হৃদপিন্ডটা যেন রেসের ঘোড়ার মতো ছুটছে। ভয় হলো, এই বুঝি না থেমে যায়। এখনো সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার ঘরে সত্যিই তৃতীয় কোন ব্যক্তি নেই। ফাঁকা ঘর দেখেও যেন সে নিজের চোখদুটোকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। খানিক আগে খানিকক্ষণ আগেও কেউ ওকে ঠিক এই খাটের কাছে দাঁড়িয়ে ওকে লক্ষ্য করছিল অথচ জেগে উঠে সে দেখছে ঘর খালি সেটা যেন নিজের চোখে দেখেও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না সারা। হাপরের মতো ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে ওর।
হঠাৎ সারা লক্ষ্য করলো বেডরুমের দরজা টা খোলা।তার মানে একটু আগে সত্যি কেউ তাদের রুমে এসে হেটে বেড়িয়েছে।কোন সাধারণ মানুষ নিশ্চয়ই হবে না। অথবা এই বাড়ির কোন সদস্য।এই বাড়ির কোন সদস্য অন্তত এইভাবে এর রাতে চোরের মত এসে উকি মেরে চলে যেত না।
সারা বেশ ভয় পেয়ে যায়। কেউ একজন দরজা খুলে ঘরে ঢুকে পড়েছে অথচ তারা কোনো শব্দই শুনতে পায়নি। সাধারণত মানুষের চলাফেরায় কিছু না কিছু শব্দ হয় পায়ের আওয়াজ, দরজার কড়া নাড়া কিংবা নিঃশ্বাসের শব্দ যতই নিঃশব্দে হাঁটুক না কেন। কিন্তু সেই আগন্তুকের চলা ফেরায় ছিল সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা যেন অদৃশ্য কোনো সত্তা ঘরের ভেতরে পা রেখেছে। সারা আবারও কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। ঘুম যেন হাজার মাইল দূরের কোনো দ্বীপ ।ধরা দিচ্ছে না কিছুতেই। এদিকে একটা কালো অবয়ব নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াতে থাকে পুরো বাড়ি জুড়ে। নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াতে লাগল ঘরের ভেতর একদিক থেকে আরেকদিকে। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। এবার ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসে একটা জানালার দিকে। বাইরে থেকে আসা স্ট্রিটল্যাম্পের আলোয় জানলার পর্দার ওপর তার ছায়া পড়ল। তারই উপর ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় ছায়া। অচেনা আগন্তুকের ছায়া। ঘোর কালো কুয়াশা মাখা সেই ছায়া টি দ্রুত সরে যায় জানালার একপাশ থেকে অন্যপাশে। জানালার পাশে রয়েছে একটা বড়সড় ডেস্ক। ডেস্কটি বইয়ে ঠাসা। হঠাৎ করেই একটা ভারী বই নিচে পড়ে যায়। চারপাশের নিস্তব্ধতায় বই পড়ার শব্দটা কাঁপিয়ে দেয় ঘরের বাতাস।
পরদিন সকালে সারা ও রেবেকার ঘুম ভাঙে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজে। দুই বোন তড়িঘড়ি করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। উঠোনে অসংখ্য মানুষের ভিড় জমেছে। গেটের ভেতরে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে তারা বেশ অবাক হয়ে যায়। কৌতূহলবশত সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে মিসেস ইলমা তাদের বাধা দেন।
“বাড়িতে এত মানুষ কেন ? পুলিশ এসেছে কেন ?” কৌতূহলী নিয়েই জিজ্ঞেস করল রেবেকা
“আমাদের বাড়ির মালি রবার্ট মারা গেছে। শরীরে খুব বাজে ভাবে আঘাত পেয়েছে।হয়তো কোন হিংস্র পশুর আক্রমণের শিকার হয়েছে। তোমরা বাড়ির ভেতরে চলে যাও। হুটহাট না বলে কোথাও চলে যেও না” বলল মিসেস ইলমা
দুই বোন ভদ্র মেয়ের মতো ঘরে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল। সারা ধীরে ধীরে গত রাতের ঘটনার সবকিছু বোনকে খুলে বলল। রেবেকা জানাল সে তো দরজা বন্ধ করেই রেখেছিল তাই কোনও হিংস্র পশু তাদের ঘরে ঢোকার কথা নয়। কিন্তু সারার বিশ্বাস কেউ তো কাল রাতে তাদের বেডরুমে এসেছিল।সে সেই আগন্তুকের উপস্থিতি টের পেয়েছে।
চলব...
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সকাল ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


