somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রত্যাবর্তন

০৪ ঠা আগস্ট, ২০১৭ দুপুর ২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাবা মারা যাবার পর যেই বড় ভাই আমাদের অভিভাবক হবার কথা ছিলো, বাবা মারা যাবার বছর দুইতিনেকের মাথায় সে হঠাৎ কেমন যেনো হয়ে গেলো। তাঁর হাসি-আনন্দ, খেয়াল-খুশি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিছুই আর পূর্বের মতো নেই।
ব্যবসায় নিয়ে একদম ব্যস্ত, কথা একেবারেই কম বলে। মেজাজ চড়া থাকে, এবং সময় সময় বায়বীয় নেশায় বুদ হয়ে রয়। বাড়ির বোনেদের বিয়ে দেয়া হয়ে গেলে সে তাদের বাড়িতে কদাচিৎ যায়। ভালো লাগলে যোগাযোগ করে নইলে না। আমরা যারা বাড়িতে থাকি, আমি আর মা আর ছোট বোন, তাদের সে কোনোরকম খোঁজখবর নিতো। এমনই খোঁজখবর নিতো যে যেবার আমি মেট্রিক পাশ করলাম সেবার সে বলে বসলো, আরে তুই যে মেট্রিক পাশ করে ফেললি টেরইতো পেলাম না! কেমনে কেমনে জানি তুই বড় হয়ে গেছিস!

আমাদের যে বোনের সাথে তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো, স্কুলে পড়ার সময় দুজনে সেম ক্লাসে পড়তো, সেই বোনের সাথে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া ই কথা বার্তা বন্ধ করে দিলো।
এর পরের বোনটা যার ভিন্ন জেলায় বিয়ে হয়েছে, তাঁর বাড়ি বারকয়েক গিয়েছিলো, তারপর সেদিকেও বিমুখ।
আমার পিঠাপিঠি যে ভাই, সে একটু ভিন্ন আমেজের লোক, বড় ভাই তাঁর সাথেও একরকম কোনো কারণ ছাড়া ই কথা বলে কম কম।
আমাদের যে সবার ছোট বোন, সবার আদরের বোন। ছোটবেলা তাঁকে কোলে নেবার জন্য আমরা হুড়োহুড়ি জুড়ে দিতাম। বড় ভাইকে সে মাম বলে ডাকতো। আমরা সবাই আনন্দে হাত তালি বাজাতাম। আর তাঁকে খুশি করতে বড়ভাই মামের কতো কসরত! পাতা কেটে বাঁশি বানানো, রশি বেঁধে দোলনা টানানো, কাপড় দিয়ে পুতুল বানানো, ছেলেদের মতো চুল কেটে দেয়া কতো কিছু!
সেই ছোট বোনটাও তাঁর আদর বঞ্চিত অনেকদিন ধরে। কথাই বলে না তাঁর সাথে!

আর আমার সাথে, সেই যে কবে মেট্রিক দিয়েই বাড়ির বাহির হয়েছিলাম তারপর থেকেই ছন্নছাড়া যোগাযোগ। ইচ্ছে হলে বছরে একআধবার খবর নিবে নইলে না।

আমরা ঈদে চাঁদে ভাইবোনেরা যখন বাড়িতে একত্র হই বা আমরা যখনই কেউ কারোর সাথে যোগাযোগ করি আমাদের আলোচ্য বিষয়ের বেশির ভাগই থাকে আমাদের বড় ভাইয়ের কথা।
তাঁর বদলে যাওয়ার কথা।
বদলে যাবার সম্ভাব্য কারণের কথা।
আমাদের কি কি ভুল ভ্রান্তি সেসব কথা।
আমরা কি করলে ভাই আমাদের আগের মতো হবে সে কথা।
পরবর্তীতে আমরা বাড়িতে একত্র হলে ভাইকে আমাদের কাছে ভিড়াবার জন্য আমরা কী কী করবো তার কথা।

যদিও আমাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা আমাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে।
কি জানি এক অজানা ভয়ে বাড়িতে গেলে আমরা ভাইয়ের সামনে বেশি কথা বলতে পারিনা।
খাবার সময় হয়েছে খেতে আসো বলা আর কেমন আছো ছাড়া কোনো প্রশ্নও করতে পারিনা আমরা। বিশেষ করে আমি। আমার এমনও হয়েছে ভাইকে একটু বেশি সময় দেখার জন্য গাছের আড়ালে চেয়ার পেতে বসে রয়েছি ঘন্টার ঘন্টা। সে যে আমার ছোটবেলার আদর্শ পুরুষ! আমাকে সবচে বেশি আদর করা লোক! কিন্তু সরাসরি প্রাণ খুলে কথা বলা হয়ে উঠে নি।

জানিনা আমাদের ভাইবোন কে তাঁর ব্যাপারে কেমন ভাবে, আমার ভেতরে সেই মেট্রিকের পর থেকেই তাঁর প্রতি অভিমান কাজ করে।
আমি কতো আয়েজন করে মেট্রিক দিলাম, পাশ করলাম, আর আমারই ভাই, যে আমাদের অভিভাবক হবার কথা সে কতো উদাসীন!

এভাবেই চলে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। বছর দশেক তো হবে ই। কতো দিন আমরা ভাইবোনেরা চোখের জল ফেলেছি ভাই কে আগের মতো পেতে! সে কথা আমরা জানি আর জানে বিধাতা।

এভাবেই যখন চলে আসছে আমাদের বিরহ যন্ত্রণা আর তাঁর উদাসীনতা, আমরা ধরে নিয়ছিলাম আমাদের ভাই এরকম ই রবে। আগের মতো হবে না।
ধরেই নিয়েছিলাম বিধাতাপুরুষের রুদ্রদৃষ্টি আমাদের উপরে পতিত হয়েছে আমাদেরই কোনো পাপ কর্মের ফল হিসেবে।
সেজন্য আমার বোনেরা বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও করেছে কিন্তু, যেই সেই।

এই যেই সেই নিয়েই যখন আমরা ছিলাম তখন হঠাৎ সেদিন ভাই আমাকে ফোন দিলো।
ফোন তাঁর নাম্বার দেখে আমার পিলে চমকে যাবার যোগার! আমার হা পিত্যেশ শুরু হয়ে গেছে কি বলবো ফোন ধরে!
কতোদিন পর আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলবো! কতো বার আমার ভাই কে ফোন দিতে গিয়ে অভিমানে আর দেয়া হয়ে ওঠে নি। সেই ভাই আমায় ফোন দিয়েছে!
কি বলবো না বলবো ঠিক করতে করতে ফোন রিসিভ করে অনভ্যস্তের মতো বললাম, কেমন আছো?

আমার সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়ে আমার ভাই আমার সাথে টানা আটাশ মিনিট বত্রিশ সেকেন্ড কথা বলেছে ফোনে।
কথা বলেছে আমাকে কোনো কথা না বলিয়েই।
কথা বলেছে কেমন আছে সেটা না বলেই।
একা একা অপ্রকৃতিস্থের মতো কথা বলেছে।
যেসব বলার সেসব বলেছে, যেসব বলার নয় সেসবও বলেছে।
তাঁর ভেতরের সব কথা সম্ভবত এই আটাশ মিনিট বত্রিশ সেকেন্ডে বলে ফেলেছে।
আমি তার আধা বুঝেছি আধা তন্ময় হয়ে শুনেছি।
বলেছে সে তাঁর সুখ, তাঁর দুঃখ।


কিন্তু আমার কেমন জানি লাগছিলো, আমার ভাই এরকম কেনো আমার সাথে হঠাৎ সব বলবে! আমার ভাই কি তবে বদলাচ্ছে আবার!

আমার কেমন জানি লাগাটা বিষাদে রূপান্তরিত হলো সন্ধ্যায় বড় আপার ফোনে।
কাঁদতে কাঁদতে বললো জানিস, ভাই এসে বিকেলে আমার বাড়িতে কি করেছে! আমাকে বলে খাবার কিছু থাকলে আগে দে। তিন চার দিন ধরে তেমন ভালো করে কিছু খাইনি, খিদেয় পেঠ জ্বলছে!
তারপর খেতে বসে সে কি পাগলের মতো কথা!
যেনো সব বলে দিবে আজ!
যেনো এই বিগত দিনের না বাসা ভালো গুলো আজ বেসে নিবে।
কথায় এতো আবেগে, যেনো প্রলাপ বকছে!
যেনো কোনো বাচ্চা আপন মনে বসে একা একা কথা বলছে!
চেহারায় তাঁর অপার্থিব শিশুসুলভ আভা।



আমার চোখ তখন জ্বলে টলোমলো, মুখে কোনো শব্দ করতে পারছি না, শুধু বারবার নাক টানছি। বহু কষ্টে, বুকের পাথর সরিয়ে আমার সাথে ভাইয়ের ফোনে কথা বলার ব্যাপারটা বললাম, বললাম আমাদের ভাই কি পাগল হয়ে গিয়েছে?
আমার হৃৎপিণ্ড যেনো বুক ছেড়ে গলায় এসে ঠেসে আছে। কথা বলতে পারছিনা আর। শরীর জুড়ে এক অসহ্য জ্বালা, যেনো এখনই আমার মরণ হবে!


বড় আপা বললো তুই কাঁদছিস কেনো?

আমি বললাম তুমি কাঁদছো কেনো!

বললো আমাদের ভাই ফিরেছে আমাদের কাছে, সুখে কাঁদছি।


শেষকথা:
ভাই বোনদের পাগলের মতো ভালোবাসুন, নইলে সময় যাবে,শান্তি পাবেন না। পৃথিবীর সব সংসারে প্রেম থাকুক অটুট। সুখ থাকুক স্বর্গের মতো।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:৩১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×