somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা বাস করছি প্রচণ্ড রাজনৈতিক ভণ্ডামোর মধ্যে – হুমায়ুন আজাদ। কিছু কথা।

১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে সেটা হল plausible. যার একটা অর্থ হল “আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত”। হুমায়ুন আজাদের অনেক লেখার মধ্যে এ জিনিসটা পাওয়া যায়। এমনিতে হুমায়ুন আজাদ খুবই ভালো লেখক ও চিন্তাবিদ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অনেক সত্যি কথাই উনি বলেছেন। কিন্তু আবার একই সাথে উনার অনেক বক্তব্য অতিরঞ্জিত এবং প্লাউজিবল বা আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত। যেমন এই ভারতের ব্যাপারে আমাদের নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন । বক্তব্যটি বেশ কিছু দিক দিয়ে বিচার করা যায়। এক দিক দিয়ে দেখলে উনি ঠিকই বলেছেন, দেশের সমস্ত দিকেই ভারত, দোকানে বাজারে গেলেই ভারতীয় জিনিস, ভারতের টাটা গাড়ি সমানে দেশে চলছে, চিকিৎসা করাতে গেলে আকছারই ভারত যেতে হচ্ছে, ভারতীয় টিভি চ্যানেল আর নাচ গানে প্রজন্ম মেতে আছে, আর তারপরও আমরা ভারতবিদ্বেষী। কী ভয়ানক ভণ্ডামি!!
কথা হচ্ছে এই বক্তব্য হল সেটাই যেটা একটু আগেই বললাম অর্থাৎ plausible. যা বলেছেন আপাতদৃষ্টিতে খুবই যৌক্তিক, সন্দেহ নাই।
কিন্তু এখানে কথা আছে। প্রথম কথা হচ্ছে আমরা ভারতীয় জিনিস ব্যবহার করছি খাচ্ছি কোনটাই মিথ্যে নয় ঠিকই, কিন্তু এগুলো কোনটাই আমরা মাগনা বা ফ্রি খাচ্ছি না। অনেকটাই নিরুপায় হয়ে নিজের গাঁটের টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থা এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেছে যে সস্তায় কিনতে হলে ভারত থেকে আনা ছাড়া এক দিক দিয়ে যেমন উপায় নেই, তেমনি আবার বিকল্প কোনও সোর্স থেকে যে এগুলো এদেশের আমদানিকারকরা আনবে সেটাও হয়ে উঠছে না। এক দিক দিয়ে ব্যবসায়ীদের লোভ এর জন্য দায়ী। কারণ সস্তায় ভারত থেকে এনে বেশী দামে বিক্রি করে এরা মুনাফা করছে। চাইলে এরা পাশের দেশ মিয়ানমার বা থাইল্যান্ড থেকেও এগুলো আমদানি করতে পারে। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি করে যে মুনাফা এরা করবে সেটা থাইল্যান্ড বা মিয়ানমার থেকে আমদানি করে সেটা হবে না । তাতে কস্ট পড়বে বেশী। আবার দেশে সেগুলোর দামও পড়বে বেশী। আমরা এদের লোভের কাছে বন্দী হয়ে রয়েছি। যার কারণে অনেকটাই নিরুপায় হয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তারা যা আনে সেটা কিনতে বাধ্য হচ্ছি। এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই ফসল। কারণ পুঁজিবাদ শুধুমাত্র মুনাফা করাকেই সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়। অন্য সমস্ত বিষয় তার কাছে গৌণ। আর তার ওপর এদেশের সমাজ যে কী লোভী সেটা নতুন করে ব্যাখ্যা করারও কিছু নেই। যদিও বাজারে থাইল্যান্ড, চীন বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও পাওয়া যায়, তবে পরিমাণে কম।
আর নাচ গান , টিভি চ্যানেল এসব সাংস্কৃতিক দিক নিয়েও কথা আছে। ভারতের সাথে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগটা ঐতিহাসিক নানা কারণেই গভীর। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সুতরাং তাদের সাথে সাংস্কৃতিক এই যে যোগাযোগ এটা আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না চাইলেও। তার ওপর আমাদের দেশের দেশের টিভি চ্যানেলগুলো এক দিক দিয়ে আমাদের দেশের সংস্কৃতিকে যেমন আকর্ষণীয়ভাবে এদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারছে না, মানুষ যেন এগুলোর দিকে চেয়ে ভারতের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে সেরকমভাবে রিপ্রেজেন্ট করতে পারছে না তেমনি এগুলো আমাদের তেমন কোনও নতুনত্বও দিতে পারছে না বা সুন্দর কোনও কিছু দিতে পারছে না। আমাদের দেশের সিনেমা এক সময় পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে বসে দেখা গেলেও এখন তার যে চরম হতশ্রী দশা তাতে করে এগুলোর নামও মুখে নেয়া যায় না। আমাদের দেশের শিল্প সঙ্গীত যারা চর্চা করেন তারাও নিয়মিতভাবে কোনও উপভোগ্য, রুচিশীল, মননশীল এবং আকর্ষণীয় কিছু আমাদের উপহার দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
চিকিৎসার ব্যাপারেও আমাদের দেশের চিকিৎসকরা যেরকম চূড়ান্ত অদক্ষতা আর অপেশাদারি মনোভাব প্রদর্শন করে আসছেন নিয়মিত তাতে করে সস্তায় মানসম্মত চিকিৎসার আশায় অগত্যা ভারতের দিকেই যেতে বাধ্য হচ্ছে এদেশের মানুষ।
এই ব্যাপারগুলোও আমলে রাখা উচিৎ।
এখন কথা হচ্ছে এই যে আমরা এইরকম একটা অবস্থার ফলে ভারত আর ভারতীয়রা যাই বলবে আর আমাদের ওপর নানা রকমের অন্যায় করবে সেই সবকিছুই কি মেনে নেব? তাদের ওপর নানা কারণে নির্ভরশীল হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছি বলে তাদের দাসত্ববৃত্তি করতে হবে?
সবাই (এক নিতান্ত ভারতের প্রতি দাসানুদাস মনোভাবাপন্ন আর আওয়ামী লীগের অন্ধ সমর্থক বাদে ) জানেন রাজনৈতিকভাবে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ভারত আমাদের সাথে কী করেছিলো আর আজও কীরকম অবন্ধুসুলভ আচরণ ভারত করছে। তো এই সবকিছু তাহলে মেনে নিতে হবে?
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দরকার দেশের উৎপাদন ও বণ্টনের নানা সংস্কার এবং আমদানির ক্ষেত্রে বিকল্প উৎসের দিকে বেশী নজর দেয়া, যাতে ভারত নির্ভরতা কমে আসে। নিজের দেশের ভেতর অনেক সংস্কার করা দরকার এজন্য। এখানে ভারতকে খুব বেশী দোষ দিয়ে লাভ নেই। নিজের দেশের উৎপাদনশীলতা না বাড়াতে পারলে ওদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতেই হবে।
আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে নিজের দেশের নানা অবস্থার কারণে আমাদের বিদেশের ওপর আমদানি নির্ভরশীল হতেই হয়। আমাদের সব জিনিসই আমরা কিন্তু ভারত থেকে আনি না বা আমদানি করি না। চীন থেকে আনি, জাপান থেকে আনি, ইউরোপের ফ্রান্স-জার্মানিসহ নানা দেশ থেকেই নানা জিনিস আমদানি করি বা আনি। তো এই আমদানি নির্ভরশীলতার অর্থ কি এটাই যে তাদের প্রতি আমাদের দাসত্ববৃত্তি অবলম্বন করতে হবে?
এই যেমন চীন থেকে আমরা অনেক কিছুই আনি। বিশেষ করে আমাদের ইলেকট্রিক এবং ইলেক্ট্রনিক বেশীরভাগ জিনিসই আমরা আমদানি করি চীন থেকে। এখন তার মানে কি এটাই দাঁড়ায় যে আমরা তাদের দাসত্ববৃত্তি করছি, না এই কারণে তাদের প্রতি আমাদের দাসত্ববৃত্তি করা উচিৎ?
আমাদের ভারতের প্রতি বিদ্বেষ মূলত তার রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেই, ভারতের রাজনৈতিক নানা অপকৌশলের বিরুদ্ধেই। ভারতের মানুষের বিরুদ্ধে নয়। ভারতের জিনিস কিনছি বা উপযুক্ত বিকল্প না থাকায় ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি বলে তাদের দাস হয়ে থাকার জন্য নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৪০
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে তে কি দেখতে চাই না

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



ওপার বাংলা আর এপার বাংলা মানে কোন দেশের কোন অঞ্চল বোঝায়, সেটা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু দু'বাংলার সংস্কৃতি বেশির ভাগটাই আলাদা। শব্দ উচ্চারন থেকে শুরু করে মন মানসিকতা, পোশাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে এসো অনুরাধা, ভেঙে দিয়ে সব বাঁধা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩

ফিরে এসো অনুরাধা, ভেঙে দিয়ে সব বাঁধা....

শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন- ফিরতেই পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে?

বাংলাদেশে ফিরে আসা তাঁর জন্য অসম্ভব নয়। চাইলে তিনি দেশে ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুপান্তর

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭


কাজী সালাউদ্দিন সাহেবের আসলেই রাজকপাল , এই কথা বললে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হয় না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের মসনদে টানা ষোলো বছর বসে থাকার এক বিরল কীর্তি তিনি গড়েছেন, যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা বাস করছি প্রচণ্ড রাজনৈতিক ভণ্ডামোর মধ্যে – হুমায়ুন আজাদ। কিছু কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৮



ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে সেটা হল plausible. যার একটা অর্থ হল “আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত”। হুমায়ুন আজাদের অনেক লেখার মধ্যে এ জিনিসটা পাওয়া যায়। এমনিতে হুমায়ুন আজাদ খুবই ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ১৭ই মার্চ ১৯২০

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪১




একটা সোনার ছোট্ট ছেলে জন্ম নিলো এই  দিনে,
স্বভাবগুনে স্থান পায় সে কোটি জনতার মনে।

সেই ছেলেটি জন্মেছিল টুঙ্গিপাড়া গ্রামে।
মুক্তিরই এক বার্তা নিয়ে এলো ধরাধামে।

অন্তরটি তাঁর বিশাল বড়ো,বুক ভর্তি  মায়া,
সব মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×