somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেশ মাতৃকার বীর সন্তান

১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে একেকটি অধ্যায়ে পরিণত হয়। তারা শুধু ব্যক্তি নন, একটি সময়ের প্রতীক, একটি আদর্শের বহনকারী। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন তেমনই এক নাম—যার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম, ত্যাগ ও বিতর্ক মিলেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিস্তৃত অধ্যায়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে তরুণ বয়সের স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্ভাবনাময় জীবনের পথ ছেড়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে। স্বাধীন দেশের স্বপ্নে বিভোর সেই প্রজন্মের একজন হয়েও তিনি কখনো নিজেকে কেবল ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং রাজনীতিকে দেখেছিলেন দায়বদ্ধতা, আদর্শ ও দলীয় আনুগত্যের জায়গা থেকে।

দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, একাধিকবার মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন, দলের শীর্ষ পর্যায়ে থেকেছেন। অথচ তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি কখনো দল বদল করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন সুবিধাবাদ, পালাবদল ও অবস্থান পরিবর্তন প্রায় স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে, তখন তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সংগঠনকে ধরে রাখতে গিয়ে হামলা, মামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছিলেন। নিউমার্কেট মোড়ে নির্মম হামলায় তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তাকে সরানো যায়নি।

তার রাজনৈতিক জীবনের পথে ছিল অসংখ্য ঝুঁকি, মৃত্যু ভয়, হামলা ও প্রতিহিংসা। ফটিকছড়ি থেকে ফেরার পথে গাড়িবহরে হামলা, সহযাত্রীদের নিহত হওয়া, নিজের জীবন বাঁচাতে কচুরিপানার ভেতর লুকিয়ে পালিয়ে আসা—এসব কেবল গল্প নয়, বাংলাদেশের সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির নির্মম বাস্তবতা। অথচ তিনি চাইলে যেকোনো সময় ক্ষমতার সুবিধাজনক স্রোতে ভেসে যেতে পারতেন। বিভিন্ন শাসনামলে মন্ত্রী হওয়া কিংবা আপসের রাজনীতি করা তার জন্য কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি মাঠ ছাড়েননি।

জীবনের শেষ অধ্যায়েও তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও কারাগারে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। একজন প্রায় নব্বই বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিবিদকে ঘিরে রাষ্ট্র ও রাজনীতির আচরণ নিয়ে সমাজে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক হয়েছে, আবার সমর্থনও এসেছে। কিন্তু এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি বহু পুরোনো এবং প্রায় প্রতিটি সরকারই কোনো না কোনোভাবে এই সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে।

এই গল্প শুধু একজন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি। এখানে মতের অমিল মানেই কখনো কখনো শত্রুতা, বিরোধিতা মানেই প্রতিশোধ। আমরা রাজনৈতিক ভিন্নতাকে সহনশীলতার জায়গা থেকে দেখতে শিখিনি। ফলে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসার আগুনও নতুন করে জ্বলে ওঠে। মানবিক রাজনীতির কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই মানবিকতার প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়।

তবুও ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তিনি থেকে যান অন্যরকম একজন মানুষ হয়ে। চট্টগ্রামের রাজপথে, দলীয় কার্যালয়ে, শহীদ মিনারের কর্মসূচিতে কিংবা রাজনৈতিক বৈঠকে—তার উপস্থিতি ছিল দৃঢ়, অথচ স্নেহময়। তিনি তরুণ কর্মীদের নাম মনে রাখতেন, খোঁজ নিতেন, কাঁধে হাত রেখে কথা বলতেন। বড় নেতা হয়েও সেই ব্যক্তিগত আন্তরিকতাই অনেককে তার প্রতি আলাদা টান তৈরি করে দিয়েছিল। রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার ভেতরেও এই মানবিক দিকগুলোই হয়তো একজন নেতাকে মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জীবিত রাখে।

আজ তিনি আর নেই। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সকল রাজনৈতিক হিসাব, বিতর্ক, অভিযোগ কিংবা অর্জন এক নতুন পরিসরে চলে গেছে—যেখানে মানুষের বিচার নয়, শেষ বিচার মহান সৃষ্টিকর্তার কাছেই। কিন্তু তার জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি কখনো এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পারব, যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমত মানেই ঘৃণা হবে না? যেখানে বার্ধক্য, অসুস্থতা বা মানবিকতার জায়গা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে?

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই। প্রতিহিংসা নয়, সহনশীলতা; দমন নয়, সহমর্মিতা; বিভক্তি নয়, সহাবস্থান—এসবের ওপরই একটি সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ঘৃণার উত্তর ঘৃণা হতে পারে না। রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করার মধ্যে নয়, বরং সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সংগ্রামী মানুষ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জীবন তাই কেবল একজন নেতার জীবনী নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতি, ইতিহাস, ত্যাগ, সহিংসতা, আনুগত্য এবং মানবিকতার এক দীর্ঘ উপাখ্যান।

মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া,সতেজ,অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে গাছ !... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন-উচাটন

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:৫০


তিড়িং বিড়িং ফাল পাড়ি,
যাচ্ছে রে মন কার বাড়ি?
পুড়ছে তেলে কার হাঁড়ি,
আমি কি তার ধার ধারি!

পানে চুনে পুড়ল মুখ,
ধুকছে পরান টাপুর-টুপ;
তাই বলে কি থাকব চুপ?
উথাল সাগর দিলাম ডুব।

আর পারি না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভয়ংকর সেই খবরের পর… সন্তানের হাতটা শক্ত করে ধরুন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫

আজ সকালে খবরটি পড়ে আমার মনটা একদম ভেঙে গেল। ভাবতেই ভয় লাগছে—আমাদের সন্তানদের আমরা আসলে কতটা অরক্ষিত পরিবেশে বড় করছি! ছোট্ট একটি নিষ্পাপ শিশু, যে পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনতেই শেখেনি, তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু খতরে মেঁ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


শুধুমাত্র মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু। তার বক্তব্যের মূলপ্রতিপাদ্য হলো হিন্দু খতরে মেঁ! আশ্চর্যের বিষয় হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা নাকি মুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, কিছুদিন পরেই নাকি পশ্চিমবঙ্গ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩০

দিনগুলো কেমন যেন দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে!
দেখতে দেখতে মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে,
এইতো সেদিন থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করলাম,
আর এদিকে দেখি চার মাস শেষ হয়ে পাঁচ মাস চলছে। অথচ আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×