somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শব্দের কূটনীতি ও জুলাইয়ের শহীদদের স্বীকৃতি: তেহরানের মঞ্চে বাংলাদেশকে ইরানের অনন্য সম্মান

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় ও সম্মাননা জানানোর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি শুধু শোক প্রকাশের মঞ্চ হয়ে থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছিল মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য দর্পণে। প্রথাগত কূটনৈতিক বিবৃতির গণ্ডি পেরিয়ে ইরান যেভাবে প্রতিটি দেশের অতীত, বর্তমান ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে পবিত্র কুরআনের আয়াত নির্বাচন করেছিল, তা বিশ্বজুড়ে দারুণ এক আলোড়ন তৈরি করেছে। তুরস্কের নিষ্ক্রিয়তা, সৌদি আরবের সুবিধাবাদ কিংবা পাকিস্তানের চিরন্তন পরনির্ভরশীলতাকে কুরআনের আয়াতের তীক্ষ্ণ আলোয় তুলে ধরার পর, যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের পালা এলো, তখন পুরো হলের পরিবেশ এক পরম শ্রদ্ধা ও গাম্ভীর্যে আপ্লুত হয়ে উঠল।

বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল যখন সম্মান জানাতে মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন ইরানি ক্বারীর গম্ভীর ও দরদি কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো সূরা আলে-ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে—আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত এবং জীবিকা লাভ করছে।


উপস্থিত অন্যান্য দেশের জন্য ইরানের আয়াত নির্বাচন যেখানে ছিল এক সুক্ষ্ম তিরস্কার কিংবা মনস্তাত্ত্বিক খোঁচা, সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক গৌরবময় স্বীকৃতি। এই আয়াতটি তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইরান যেন সরাসরি বাংলাদেশের জুলাই-আগস্টের মহান গণ-অভ্যুত্থানের সেই সব অকুতোভয় তরুণ ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকে কুর্নিশ জানাল, যারা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বুক পেতে দিয়েছিল বুলেটের সামনে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমে নিজ দেশের মাটিতে এই শহীদদের রক্তে যে নতুন ভোরের সূচনা হয়েছিল, তেহরানের এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরান যেন সেই রক্তস্নাত বিপ্লবকেই এক স্বর্গীয় সিলমোহর দিল। পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে অমোঘ ও শক্তিশালী বাণীর মাধ্যমে তারা বিশ্বমঞ্চে ঘোষণা করল যে, জুলাইয়ের এই বীরেরা মরে যাননি; তারা আল্লাহর দরবারে জীবিত এবং চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে এই ধরনের প্রতীকী বার্তা অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। এর মাধ্যমে ইরান শুধু বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকেই সম্মানিত করেনি, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লড়াই এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অর্জিত বিজয়কে একটি বৈশ্বিক ও ইসলামিক মর্যাদা দিয়েছে। যখন মুসলিম বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থের অঙ্কে নিষ্ক্রিয় বা দোদুল্যমান, তখন বাংলাদেশের এই অবিনাশী তরুণ প্রজন্ম যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে, ইরান এই আয়াতটির মাধ্যমে সেই সত্যকেই বিশ্ববাসীর সামনে সগৌরবে তুলে ধরল।

কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা বা আনুষ্ঠানিক প্রশংসাপত্র ছাড়াই, সূরা আলে-ইমরানের এই একটি মাত্র আয়াতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পুরো দেশের ত্যাগ যেন এক পরম প্রাপ্তি খুঁজে পেল। তেহরানের সেই সভাকক্ষে উপস্থিত প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিরা সেদিন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশ হয়তো সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি নয়, কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে জান বাজি রাখার যে অসীম সাহস এ দেশের ছাত্র-জনতা দেখিয়েছে—তা আজ বিশ্বমঞ্চে কতটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। ইরান আরও একবার দেখাল যে, শব্দের সুক্ষ্ম ও সঠিক প্রয়োগে যেমন প্রতিপক্ষের সুবিধাবাদকে বিদ্ধ করা যায়, ঠিক তেমনি সত্যের পথের সৈনিকদের এনে দেওয়া যায় এক চিরন্তন ও ঐতিহাসিক সম্মাননা।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×