একটি ফোনকল। ওপাশে দুবাইয়ের একটি নম্বর। পরিচয়—‘ডেভিড ইমন’। দাবি—দুই কোটি টাকা। এরপর প্রতি মাসে দশ লাখ টাকা ‘নিয়মিত’ দিতে হবে। না হলে ব্যবসা চলবে, তবে মালিকের নয়—‘তার ছেলেদের’।
এটি কোনো সিনেমার সংলাপ নয়, কোনো অপরাধভিত্তিক ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্যও নয়। এটি চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, যেখানে চাঁদাবাজি যেন আর গোপন অপরাধ নয়; বরং প্রকাশ্য ক্ষমতার প্রদর্শনী।
ব্যবসায়ী রাজি হননি। ঠিক দুই দিন পর, যেদিন অফিসে কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য ৩৫ লাখ টাকা রাখা ছিল, সেদিন ৩৪ জন মুখোশধারী কিরিচ ও চাইনিজ কুড়াল হাতে অফিসে ঢুকে সব লুট করে চলে যায়। ঘটনাটি এমনভাবে ঘটানো হয়, যেন এটি কোনো ডাকাতি নয়—বরং পূর্বনির্ধারিত ‘কালেকশন’।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি টাকার অঙ্ক নয়, অস্ত্রের ঝনঝনানিও নয়। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো অপরাধীর আত্মবিশ্বাস।
ফোনের শেষ কথাগুলো ছিল আরও শীতল—“আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনারের কাছে জিজ্ঞেস করবেন। নম্বরটা দেখাবেন, চিনতে না পারলে।” একজন অভিযুক্ত চাঁদাবাজ যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার নামকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার সাহস দেখায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সে এই আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে পেল?
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি হুমকি—“স্মার্ট গ্রুপের মুজিব ভাইয়ের ঘরে কী হয়েছে, দেখেছেন তো?” অর্থাৎ, ভয় সৃষ্টি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। একটি ঘটনার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আরেকটি ঘটনার আগাম বার্তা।
এরপর আরও বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, ডেভিড ইমনেরও ‘উপরের’ একজন আছেন। তারও ওপর আরেকজন। শহরের মানুষ সেই নামও জানে—একজন জনপ্রতিনিধি।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা নয়; এটি হবে অপরাধ, প্রভাব ও ক্ষমতার এমন এক শৃঙ্খল, যেখানে অস্ত্রধারীরা শুধু মাঠের কর্মী, আর প্রকৃত নির্দেশদাতারা থেকে যান আড়ালে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আজ প্রশ্ন করছেন—ব্যবসা করতে হলে কি এখন কর, ভ্যাট ও শুল্কের পাশাপাশি চাঁদাও বাজেটে রাখতে হবে? একজন উদ্যোক্তা কি আইনকে ভরসা করবেন, নাকি অস্ত্রধারীদের সঙ্গে সমঝোতা করবেন?
এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ, যদি সত্যিই কোনো অপরাধী প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে থাকে, তবে তার জবাব আইনের মাধ্যমেই আসা উচিত। আর যদি অভিযোগের পেছনে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক থাকে, তবে সেটিও উদ্ঘাটন হওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা। সেই আস্থা ক্ষয়ে গেলে শুধু একজন ব্যবসায়ী নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শহরের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাবোধ।
চট্টগ্রাম বন্দরের শহর, ব্যবসার শহর, সম্ভাবনার শহর। এই শহরকে যদি মুখোশধারীদের ভয়ে ব্যবসা চালাতে হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একজন উদ্যোক্তার নয়—পুরো অর্থনীতির।
আজ তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—চট্টগ্রাম কি আইনের শাসনে চলবে, নাকি ফোনের ওপাশ থেকে আসা একটি কণ্ঠই ঠিক করে দেবে কার ব্যবসা চলবে, আর কার অফিসে পরের 'ডেলিভারি টিম' যাবে?
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




