somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইজ্জত বাঁচানোর সংসার

২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই বয়সে এসে আছিয়াকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে—এটা হয়তো তার জীবনের কোনো পরিকল্পনায় ছিল না।

ক্যামেরা কীভাবে ধরতে হয়, কোথায় তাকাতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয়—এসব তার জানা নেই। সে কোনো বক্তা নয়, কোনো রাজনীতিক নয়, কোনো মিডিয়া-ব্যক্তিত্বও নয়। সে শুধু একজন স্ত্রী। বহু বছর ধরে সংসার করা একজন নারী। স্বামীর পাশে থেকে বয়সের ভার, অসুখ-বিসুখ, অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ—সবকিছু পার করে আসা এক নারী।

কিন্তু সেদিন তাকে ক্যামেরার সামনে বসতে হলো।

হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো একটি চিরকুট।

আছিয়া অভ্যাসহীন হাতে চিরকুটটি খুললেন। তারপর অস্বস্তি নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। কথাগুলো যেন তার নিজের নয়। তবুও তাকে বলতে হবে।

যে তরুণী নারীর সঙ্গে তার স্বামীকে একটি হোটেল কক্ষে পাওয়া গেছে, সে নাকি তার সতীন। তার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী।

অতএব, তাদের ঘনিষ্ঠতা অবৈধ নয়। বরং বৈধ। সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। সুন্দর।

ক্যামেরার সামনে বক্তব্য শেষ হলো।

আছিয়া একবার ঘরের দিকে তাকালেন।

তারপর তাকালেন স্বামীর দিকে।

হ্যাঁ, ঘরের ইজ্জত বেঁচে গেল।

স্বামীর পদ বেঁচে গেল। পদবী বেঁচে গেল। এত বছরের সংসারের সামাজিক মুখটাও আপাতত রক্ষা পেল।

এত বছরের সঙ্গীর জন্য এতটুকু তো করাই যায়।

সবাই তো করে।

সংসারে স্ত্রীদের অনেক কিছুই করতে হয়। কখনও স্বামীর ভুল ঢাকতে হয়, কখনও তার অপমান নিজের কাঁধে নিতে হয়, কখনও তার ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দিতে হয়। কখনও আবার স্বামীর এমন কোনো কাজকেও বৈধতার সনদ দিতে হয়, যার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরটাই ভেঙে পড়ে।

আছিয়াও সেটাই করলেন।

কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার পর?

সেই প্রশ্নটির কোনো উত্তর নেই।

হয়তো তিনি ঘরের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

যে ঘরে এত বছর সংসার করেছেন। যে বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে কত রাত কেটেছে। যে দরজার ভেতরে তিনি স্বামীর সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করেছেন। যে উঠানে দাঁড়িয়ে তিনি অতিথি আপ্যায়ন করেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন, সংসার সামলেছেন।

সেই ঘরটিই হঠাৎ যেন অপরিচিত মনে হলো।

হয়তো বুকের ভেতর দিয়ে হু হু করে একটা বাতাস বয়ে গেল।

হয়তো চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো।

হয়তো নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগল—

আমি কি সত্যিই এটা বিশ্বাস করি?

নাকি শুধু বললাম?

স্বামীর সম্মান রক্ষার জন্য?

সমাজের চোখে মুখ রক্ষার জন্য?

পদ-পদবী বাঁচানোর জন্য?

নাকি এত বছরের সম্পর্ককে শেষ অপমানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য?

মানুষের শরীরের বয়স বাড়ে। চাহিদা কমে। শক্তি কমে। অসুখ আসে। ক্লান্তি আসে। সংসারের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একজন নারী হয়তো বিছানায় আগের মতো সঙ্গ দিতে পারেন না। আছিয়াও হয়তো সেটা জানেন। হয়তো সেই সত্য তাকে ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে ভোগায়।

তাই স্বামী যদি অন্য কোথাও নিজের চাহিদা পূরণ করে—তাহলে কি সেটাকে মেনে নেওয়া যায়?

পুরুষ মানুষ।

পুরুষের চাহিদা আছে।

পুরুষের প্রয়োজন আছে।

পুরুষের ভুল হয়।

সমাজ যুগ যুগ ধরে পুরুষের জন্য এসব যুক্তি তৈরি করেছে।

কিন্তু একজন স্ত্রীর বুকের ভেতরেও তো একটা হৃদয় থাকে।

সেই হৃদয় কি যুক্তি বোঝে?

সেই হৃদয় কি আইন বোঝে?

সেই হৃদয় কি দ্বিতীয় স্ত্রী, বৈধতা, সামাজিক মর্যাদা—এসব শব্দের অর্থ বোঝে?

হয়তো না।

হয়তো সে শুধু জানে—যে মানুষটির সঙ্গে এত বছর জীবন কাটিয়েছে, সে অন্য কারও কাছে গেছে।

আর সেই সত্যকে ঢাকার জন্য তাকেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হয়েছে—

“সবকিছু বৈধ।”

সেই মুহূর্তে হয়তো তার নিজের জীবনের বহু বছরের স্মৃতিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে।

বিয়ের প্রথম দিনের কথা।

প্রথম সন্তান।

অসুস্থতার রাত।

স্বামীর জন্য অপেক্ষা করা অসংখ্য সন্ধ্যা।

একসঙ্গে খাওয়া খাবার।

অভিমান।

ক্ষমা।

ভালোবাসা।

সেইসব কি সত্যিই ছিল?

নাকি আজকের একটি দৃশ্য এসে সবকিছুর ওপর নতুন অর্থ চাপিয়ে দিল?

সবচেয়ে ভয়াবহ অপমান সম্ভবত সেটাই—যে অপমানের কোনো শব্দ নেই।

কেউ গালি দেয়নি।

কেউ চিৎকার করেনি।

কেউ প্রকাশ্যে অপমান করেনি।

বরং সবাই চুপ।

ঘরের ভেতর সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

স্বামী নিজের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

স্ত্রী স্বামীর সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

পরিবার সামাজিক মুখ রক্ষা করছে।

আর সেই পুরো প্রক্রিয়ায় একজন নারী নিঃশব্দে নিজের ভেতরটাকে হারিয়ে ফেলছেন।

সংসারে সবচেয়ে বড় কাঙাল হয়তো সে-ই—যার সম্মান নীরবে লুট হয়ে যায়, অথচ লুটের শব্দটুকুও শোনা যায় না।

যার চোখের সামনে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অর্থ বদলে যায়, অথচ তাকে হাসিমুখে বলতে হয়—

“সব ঠিক আছে।”

আছিয়াও হয়তো সেই কাজটিই করছেন।

স্বামীর সম্মান রক্ষার জন্য।

সংসারের ইজ্জত রক্ষার জন্য।

পদ-পদবী রক্ষার জন্য।

সমাজের চোখে মুখ রক্ষার জন্য।

কিন্তু কেউ কি একবারও আছিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছে—

“আপনি কেমন আছেন?”

সম্ভবত না।

কারণ এই সমাজে স্বামীর সম্মান রক্ষা করা স্ত্রীর দায়িত্ব বলে ধরে নেওয়া হয়।

কিন্তু স্ত্রীর ভেঙে যাওয়া সম্মান, অপমান, কষ্ট—এসবের দায়িত্ব কে নেয়?

কেউ না।

তাই আছিয়া চিরকুট পড়েন।

ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান।

স্বামীর পক্ষে কথা বলেন।

একটি সম্পর্ককে বৈধতার ভাষা দেন।

ঘরের ইজ্জত বাঁচান।

স্বামীর পদ বাঁচান।

সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেন—কিছুই হয়নি।

কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেলে, মানুষ চলে গেলে, দরজা বন্ধ হয়ে গেলে—

সেই ঘরে কি সত্যিই কিছুই থাকে না?

থাকে।

একজন বৃদ্ধ নারীর নীরবতা থাকে।

একটি দীর্ঘ সংসারের ক্লান্ত স্মৃতি থাকে।

একজন স্ত্রীর গোপন অপমান থাকে।

আর থাকে সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন—

যে ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে একজন নারীকে নিজের বুকের ভেতরটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলতে হয়, সেই ইজ্জত আসলে কার?
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৪
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৭ জুনে বিয়ে, অথচ ২২ জুনের সিভিতে ‘অবিবাহিত’? এমপি সাহেবের এই গণিত কে মেলাবে?

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮



ধরা খাইলেই “দ্বিতীয় বিবি”! কিন্তু ১৭ জুনের বিয়ার পর ২২ জুনের সিভিতে মাইয়া 'আনম্যারিড' থাকে কেমনে?
সাতক্ষীরার এমপি সাবের এই ভণ্ডামির জট ছাড়াইতে পারবেন তো, নাকি এআই (AI) এর ওপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ খুশি ভাগ করতে এসেছি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৫



আসসালামু আলাইকুম। শুভ সন্ধ্যা। কেমন আছেন সবাই?

আলহা গত বৃহস্পতিবার আমি প্রমোশন পেয়েছি। অতিরিক্ত পরিচালক (৪র্থ গ্রেড)। খুশির সংবাদ জানাতে দেরি করে ফেলেছি সরি।

আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২০


আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই। ইন্টারনেট এর স্পিড খুবই কম। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হতে আসবে না। অল্প লেখায় নিজের মনোভাব ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ আর পাকনা পাকনা কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয়ী

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিজয়ী
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

বিজয়ী কখনো কখনো হেরে যায়
হঠাৎ কেউ টপকে যায় তাকে
সেরা সবসময় সেরা থাকে না
পরাজিত হয়ে সে কাঁদে, ভেঙে পড়ে।
জয়লাভ প্রায় প্রত্যেকে আনন্দিত করে
আর হার প্রায় প্রত্যেকে দুখি করে।
আমরা কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×