somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টুপটুপ রিসোর্ট: মৃত্যুর মুখেও পরিবারকে ছাড়েননি, আগুনে পুড়ল দশ প্রাণ—দায় নেবে কে?

১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কিছু মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় না, আমাদের বিবেককেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কক্সবাজারের উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তেমনই এক মর্মান্তিক ঘটনা। আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের একাধিক সদস্য। আর উদ্ধার হওয়া একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্যের বর্ণনা মানুষের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে দেয়।
প্রকাশিত বর্ণনা অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের অবস্থান দেখে ধারণা করা হচ্ছে, একজন স্বামী মৃত্যুর মুহূর্তেও স্ত্রীকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছিলেন, আর স্ত্রী বুকের সঙ্গে আগলে রেখেছিলেন তাঁদের ছোট্ট সন্তানকে। তাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না হয়ে থাকলে, সেই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা জরুরি। তবে দৃশ্যটির বর্ণনাই যথেষ্ট—মৃত্যুর মুখেও মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয়জনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টা করে।
কী ভয়াবহ অসহায়ত্বের মুহূর্ত ছিল সেটি! একজন স্বামী হয়তো নিজের শরীর দিয়ে স্ত্রীকে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন। একজন মা হয়তো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সন্তানকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগুনের কাছে তাঁদের ভালোবাসা নয়, পরাজিত হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার নির্মম বাস্তবতা। যে আলিঙ্গন হওয়ার কথা ছিল জীবনের আশ্রয়, সেটিই হয়ে রইল মৃত্যুর পরও একসঙ্গে থাকার হৃদয়বিদারক স্মৃতি


স্বজনেরা হয়তো এখনো অপেক্ষা করছেন। নিখোঁজ প্রিয় মানুষগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আশায় হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ঘুরছেন। তাঁরা জানেন না, তাঁদের প্রিয়জনেরা ফিরবেন কি না। এই অপেক্ষার যন্ত্রণা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আগুনে শুধু কয়েকটি জীবন নিভে যায়নি; অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে গেছে অসংখ্য স্বজনের পৃথিবী।
কিন্তু এই মৃত্যুর পেছনের প্রশ্নগুলোও আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কাঠ, টিন আর বোর্ড দিয়ে তৈরি একটি স্থাপনা। নিচতলায় রান্নাঘর ও গ্যাস সিলিন্ডার, ওপরে কাঠের মেঝে ও দেয়াল। অথচ অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। ফায়ার সার্ভিস গত জুনে নোটিশ দিয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে। যদি এসব তথ্য সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—আগুন লাগার আগেই বিপদের সংকেত পাওয়া সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
একটি রিসোর্টে মানুষ যায় নিরাপদে বিশ্রাম নিতে, পরিবারের সঙ্গে আনন্দের সময় কাটাতে। অথচ সেই আশ্রয়ই যদি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তাহলে দায় কেবল আগুনের নয়; দায় সেই অব্যবস্থাপনারও, যা মানুষকে পালানোর পথহীন করে দেয়।
ভাবুন, আপনি দোতলায় ঘুমিয়ে আছেন। নিচে আগুনের সূত্রপাত। মুহূর্তেই কাঠের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। নেই কার্যকর অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, নেই নিরাপদে বের হওয়ার বিকল্প পথ। তখন আপনার হাতে কতটুকু সময় থাকবে? আগুন থেকে বাঁচতে জানালা দিয়ে লাফ দেওয়াই যদি একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই স্থাপনাকে রিসোর্ট বলা যায় কীভাবে?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে তিন বোনের পাঁচ সন্তান ও এক নাতিসহ মোট দশজনের প্রাণহানির কথা উঠে এসেছে। একটি পরিবারের এতগুলো প্রাণ একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া নিছক পরিসংখ্যান নয়। তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল স্বপ্ন, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য স্মৃতি। বেঁচে থাকা স্বজনদের জন্য এখন প্রতিটি স্মৃতিই হয়ে উঠবে দীর্ঘশ্বাসের কারণ।
এই বিপর্যয়ের দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। রিসোর্টটির অনুমোদন, জমির বৈধতা, অগ্নিনিরাপত্তা, ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ—সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। মালিক ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ নয়, আবার প্রভাবশালী বলে কাউকে দায়মুক্তিও নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব ভ্লগার ও ইউটিউবার রিসোর্টটির প্রচার করেছেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। তবে প্রচার করেছেন বলেই কাউকে অপরাধী বলা যাবে না; তাঁদের জ্ঞান, ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, এমন মৃত্যুর পরও কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখছেন, কেউ নিহতদের সম্পর্কে অনুমান করে বলছেন, সেখানে নিশ্চয়ই অনৈতিক কিছু ঘটেছিল। অথচ পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করা কিংবা ছুটির দিন কাটানো কোনো অপরাধ নয়। মানুষের পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে না জেনে তার মৃত্যুকে নৈতিক শাস্তি হিসেবে ঘোষণা করা নিষ্ঠুরতা।
মৃত মানুষের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো, শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকানোর দাবি তোলাই এখন আমাদের দায়িত্ব।
টুপটুপের আগুন নিভে যাবে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামও একসময় বদলে যাবে। কিন্তু যে পরিবারটি এক ঘণ্টায় তাদের পৃথিবী হারিয়েছে, তাদের শোক কখনোই কয়েক দিনের সংবাদ হয়ে শেষ হবে না। আর যে স্বামী মৃত্যুর মুখেও স্ত্রীকে জড়িয়ে ছিলেন, যে মা সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে—সেই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপদের মুহূর্তে মানুষ শেষ পর্যন্ত তার প্রিয়জনকেই আঁকড়ে ধরে।
তাহলে যাদের দায়িত্ব ছিল মানুষের জীবন রক্ষা করা, তারা কি নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর চাই। চাই নিরপেক্ষ তদন্ত, দৃশ্যমান জবাবদিহি এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা। পর্যটন এলাকার সব হোটেল ও রিসোর্টের নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে—আরেকটি দুর্ঘটনার অপেক্ষায় নয়, এখনই।
কারণ আগুনে পুড়ে যাওয়া জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না। কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হয়তো পরের পরিবারটিকে এমন শোকের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচানো যায়।
টুপটুপের আগুনে দশটি প্রাণ হারানোর পরও যদি আমরা না জাগি, তাহলে প্রশ্ন শুধু প্রশাসনের নয়—প্রশ্ন আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আমাদের বিবেক এবং মানুষের জীবনের মূল্য নিয়ে।
আল্লাহ নিহতদের ক্ষমা করুন, তাঁদের স্বজনদের এই অসহনীয় শোক বহন করার শক্তি দিন এবং এমন বিপর্যয় থেকে সবাইকে রক্ষা করুন। আমিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৩
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বঙ্গভঙ্গ থেকে চব্বিশ, পূর্ব বাংলার ইতিহাস ও বাংলাদেশের আত্মপরিচয়

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমান সময়ে একটি বিরাট পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে যা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং আত্মোপলব্ধির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ পনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:১১

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×