
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
একজন অভিভাবকের কাছে জানতে চান, তিনি তাঁর সন্তানের জন্য স্কুল থেকে খাবার, পোশাক, জুতা-মোজার ব্যবস্থা চান, নাকি সবার আগে চান একটি মানসম্মত শিক্ষা? নিঃসন্দেহে, একজন অভিভাবক চাইবেন তাঁর সন্তান ভালোভাবে পড়াশোনা করুক, যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারুক। স্কুলের পক্ষ থেকে খাবার, পোশাক কিংবা শিক্ষা উপকরণ দেওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এসব আয়োজন যেন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে না ফেলে।
একই প্রশ্ন একজন শিক্ষকের কাছেও রাখা প্রয়োজন। তিনি কি শুধু শ্রেণিকক্ষে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, আধুনিক বোর্ড ও ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ চান? নাকি তিনি এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ চান, যেখানে নির্বিঘ্নে পাঠদান করতে পারবেন, রাজনৈতিক প্রভাব, টাউট রাজনীতি, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং অযাচিত হম্বিতম্বি থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন? যেখানে একজন শিক্ষককে তাঁর পেশাগত যোগ্যতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে, যেখানে তাঁর সিদ্ধান্তের মর্যাদা থাকবে এবং তাঁকে সামাজিকভাবে সম্মানিত করা হবে?
বাস্তবতা হলো, একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু সুন্দর স্কুল ভবন, আধুনিক আসবাবপত্র, ডিজিটাল ক্লাসরুম কিংবা বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না। এসব প্রয়োজনীয় উপাদান শিক্ষার পরিবেশকে উন্নত করতে পারে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষক। সেই শিক্ষক যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন, সামাজিকভাবে অবমূল্যায়িত হন, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিংবা প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে থাকেন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের পাঠদান আশা করা কতটা যৌক্তিক?
আমাদের সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে একজন শিক্ষক কতটা সম্মান, স্বাধীনতা ও আর্থিক নিরাপত্তা পান, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একজন শিক্ষককে যদি তাঁর ন্যায্য বেতনের জন্য আন্দোলন করতে হয়, পেশাগত অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হয়, কিংবা পাঠদানের চেয়ে বেশি সময় দিতে হয় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজে, তাহলে সেখানে শিক্ষার মানোন্নয়ন কতটা সম্ভব?
শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়; এটি একটি জাতি গঠনের দায়িত্ব। একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন বাঁচান, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন, আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য মানুষ। অথচ যাঁরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন, তাঁদের পেশাগত মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নে আমরা অনেক সময় উদাসীন থাকি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের দায়িত্ব শুধু বাজেট বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা নতুন প্রকল্প গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন ও আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া, অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
পাশাপাশি শিক্ষকদেরও নিজেদের দায়িত্বের জায়গায় সৎ, দক্ষ, আন্তরিক ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীলতা, নিয়মিত পাঠদান, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নৈতিকতার চর্চা একজন শিক্ষকের মৌলিক কর্তব্য। শিক্ষকের অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি তাঁর দায়িত্ব পালনের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—শিক্ষার্থীর হাতে খাবার তুলে দেওয়া মানবিক উদ্যোগ, শরীরে পোশাক তুলে দেওয়া সামাজিক দায়িত্ব, আর হাতে বই তুলে দেওয়া ভবিষ্যৎ নির্মাণের বিনিয়োগ। কিন্তু সেই বইয়ের ভেতরের জ্ঞান শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন একজন যোগ্য, মর্যাদাবান ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম শিক্ষক।
আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পড়বে না, বরং চিন্তা করতে শিখবে, প্রশ্ন করতে শিখবে, নৈতিকতা অর্জন করবে এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্যতা অর্জন করবে। আর সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।
কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু স্কুলের দেয়াল, বেঞ্চ, ল্যাপটপ কিংবা প্রজেক্টরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দাঁড়িয়ে থাকে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শিক্ষকের ওপর, যিনি আগামী প্রজন্মকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন চাইলে তাই প্রথমে শিক্ষকের উন্নয়ন, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আর মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র গঠনও সম্ভব নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




