সাপ্তাহিক ছুটিটা ইদানিং আমার কাছে খুব লম্বা মনে হয়। মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ আছে বৈকি। সপ্তাহের শেষ কর্মদিনে দুপুরের উত্তাপ যত কমতে থাকে অফিস ততই ফাঁকা হতে থাকে। বিকেল গড়াতেই বিশাল এই বিল্ডিং এর ভিতরে গা ছমছম করে। আমি হয়ে পড়ি একা। এমনকি বাসাতেও একা।
বাসার একজন ফ্যামিলিওয়ালা গতকালই পগারপার। বাকি দুজন ট্যুর প্ল্যান করলো। সুতরাং ভোরের আলো ফুটতেই আমি পুরোপুরি একা। মনে মনে খুশিই হলাম, যাক আজ ইচ্ছেমত ঘুমানো যাবে- কেউ ঘুম থেকে উঠানোর জন্য জ্বালাতন করবেনা। ধারনা ভুল প্রমাণ করতে আধাঘণ্টা লাগলো- বুয়া এসে দরজা ধাক্কাধাক্কি করছে। বললাম যান আজ রান্না করা লাগবেনা। ভেবেছিলাম খুশি হয়ে চলে যাবে। গেলনা। বললো রান্না না করলে দুপুরে-রাতে খাইবেন কি? হক কথা। বললাম ঠিক আছে রান্না করেন।
আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আধাঘণ্টা পরে আবার বুয়া ঘুম ভাঙালো।
-নাস্তা রেডি খেয়ে নেন।
-যান পরে খাবো।
-কিছু বাজার লাগবে টাকা দেন।
বেকায়দায় পড়ে উঠতেই হল। নাস্তা করে আবার শুয়ে পড়লাম। এবার কড়া নির্দেশ, ভুমিকম্প হলেও জাগাবেন না। ঘুমাবার শতরকম চেষ্টা বিফলে গেল। বুঝলাম চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন পুরোপুরি সঠিক নয়। মানুষ পুরোপুরি দুশ্চিন্তামুক্ত থাকলে ভাল ঘুম হয়না। পরীক্ষার আগের রাতে প্রচুর পড়াশোনার চাপের মধ্যে ব্যাপক ঘুম পায়, এমনকি সকালেও খুব সহজে ঘুম ভাঙেনা। ইউনিভার্সিটি লাইফে আমার পরিচিত একজনকে এরকম বহু পরীক্ষা মিস করতে দেখেছি। পরে জিজ্ঞাসা করলে হাসিমুখে বলেছে, ঘুমিয়ে যে শান্তি পেয়েছি পরীক্ষা দিয়ে সেই শান্তি পেতাম না।
এরকম সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে ইলেক্ট্রিসিটি গেল। সুতরাং.....
উঠে দেখি বুয়া বিদ্যুৎ গতিতে সব কাজ সেরে চলে গেছে। এমনকি সারা সপ্তাহের জমানো সব কাপড় ধোয়া সারা। ভাবতে লাগলাম এই মস্ত ছুটির দিন কি কাজে লাগানো যায়। আমার কোথায় যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই- এরকম অবস্থা। গানওয়ালা হবার চেষ্টা করা যেতে পারে। সেটাও জমলো না। শ্রোতা না থাকলে গান জমেনা- প্রমাণিত সত্য।
কি করা যায়? হিমু সেজে বরিশাল শহরে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করা যেতে পারে। চিন্তাটা মন্দ না। ছুটির দিনে সবাই ঘুরতে বের হবে। নানা রঙের, নানা ঢঙের মানুষ দেখা যাবে। ভালই লাগবে বোধহয়। কিন্তু রোদ্রের যে চান্দিফাটা তাপ!! সেটা উপেক্ষা করেই রাস্তায় বের হলাম। ধারনা ভুল। এত গরমে কেউ বের হয়নি। যে শ্রেণীর মানুষের ছুটি বলে কিছু নেই তারাই শুধু ছুটাছুটি করছে। বাস্তবতা আধাঘন্টার মধ্যেই আমাকে বাসায় ফেরত পাঠালো।
এবার কি করা যায়? ভাবতেই রুমমেটের ল্যাপটপ চোখে পড়ল। নিজেকে গাধা শ্রেনির মানুষ মনে হল- এত ভাল বিনোদন ব্যবস্থা রেখে আমি কিনা পথে পথে ঘুরছি। ল্যাপটপ চালু হল। হাতে দেখার মত প্রচুর নতুন মুভি। কাটাপ্পা কেন বাহুবলীকে মেরেছিল তা আজ জানা যেতে পারে। সমস্যা একটাই- হাতে প্রচুর নতুন মুভি থাকলে পুরাতন ভাল মুভি দেখতে ইচ্ছে করে।
সেরকমভাবেই শুরু করা যাক। মুভি চালু করলাম। দুই সেকেন্ড পাঁচ সেকেন্ড পরপর মুভি আপনা আপনি পজ হয়ে যায়। কাহিনী কি? ভাবলাম প্রিন্টের সমস্যা। অন্য মুভি চালু করেও একই ফল। তাহলে তো ল্যাপটপের সমস্যা। মনটা ভাল হয়ে গেল। যাক একটা কাজ পাওয়া গেল। ব্যাপক উদ্যম নিয়ে সমস্যা খোঁজা শুরু করলাম। সমস্যা খুব সহজেই ধরা পড়লো। কিবোর্ড নষ্ট। আশার বেলুনটা চুপসে গেল। কিবোর্ড ফেলে দেওয়া ছাড়া সারাইয়ের উপায় নেই। সুতরাং সেভাবেই মুভি দেখা শুরু।
চারটা পর্যন্ত বিপুল ধৈর্য নিয়ে মুভি দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। এবার ঘুম ভাল হবে আশা করা যায়। ঘুম ভালই হল। সন্ধ্যে সাতটায় ঘুম ভাঙল। ফ্রেস হয়ে রাস্তায় বের হলাম। ব্যাপক গরম, তবু হাটতে ভাল লাগছে। বেশখানিকটা হেটে নদীর ধারে চলে এলাম। জোড়া বেজোড়া ব্যাপক মানুষের সমাহার। জনতার মাঝে নির্জনতা বেশ ভালই লাগছে। খালি বেঞ্চ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দশ টাকার বাদাম কিনে একটা খালি বেঞ্চে বসে পড়লাম। বাদাম খেয়ে মজা পাচ্ছিনা। বাতাসে লবল সব উড়ে গেল। তাছাড়া একাএকা বাদাম খেয়ে মজা পাচ্ছিনা।
এর মধ্যে তিনজন অল্প বয়সী ছেলে আমার পাশে বসে পড়ল। তাদের বাদাম অফার করলাম। তিনজনই সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। কেউ কিছু বললো না, বাদামেও হাত দিলনা। এরপর তারা বিপুল আগ্রহে টিনেজার গল্প শুরু করলো। গল্পের ভাষাগুনে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে সসম্মানে উঠে যেতে হল। জোড়াগুলোর পাশের ফাঁকা সিটে বসা যাচ্ছেনা। প্রকৃতি এদের একলা ছেড়ে দিতে বলেছে।
কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে ঘর্মাক্ত হয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম। একটা ঠান্ডা কোল্ড ড্রিংক অর্ডার করলাম। রেস্টুরেন্টও প্রায় ফাঁকা। মনে মনে একটা চরিত্র সৃষ্টি করে তার সাথে গল্প করলে কেমন হয়? এটা ভালই হবে। চরিত্রের থাকা না থাকা আমার হাতে। সে চাইলেও পালাতে পারবেনা। তো শুরু করা যাক। প্রথমেই সে প্রশ্ন করে বসলো-
-এই, তুমি এত ঘামছো কেন?
-আমি খুব ঠান্ডা আছি তাই ঘামছি। তোমাদের ভাষায় কি যেন বলে- I'm very cool.
-বুঝলাম না! Cool থাকলে ঘামবে কেন?
-ঐ দেখো, টেবিলে রাখা সুদৃশ্য ঠান্ডা কোকের বোতলটাও ঘামছে। সে আমার চেয়েও বেশি ঘামছে। সুতরাং সে আমার চেয়েও বেশি Cool.
সে কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এরকম কথোপকথন সে আশা করেনি। ভেবেছিলাম আমি না চাইলে সে যেতে পারবে না। ধারনা ভুল। সে চুপচাপ উঠে চলে গেল।
আমি আতঙ্কিত বোধ করছি। ফাঁকা বাসায় রাতটা একাই কাটাতে হবে।
(চলবে)
২৬/০৫/২০১৭
বরিশাল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




