somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

িজল্লুল
চিকিৎসা সাধনা: হোমিওপ্যাথির দীর্ঘ পথগত ৪৪ বছর ধরে নিয়মিত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা করে আসছি। চিকিৎসা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এটি একটি মানবিক সাধনা। রোগীর শরীরের অসুস্থতার পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থা, পারিবারিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

আদর্শ—বাংলাদেশের আজকের সবচেয়ে জরুরি

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইকবাল জিল্লুল মজিদ
তারিখ ২৬.১২.২৫
বাংলাদেশে “আদর্শ” শব্দটি শুধু নীতিকথার জন্য নয় এটি এখন বেঁচে থাকার, সমাজ টিকিয়ে রাখার, এবং মানুষ হয়ে ওঠার একেবারে মৌলিক শর্ত। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সাফল্যকে প্রায়ই মাপা হয় দ্রুত অর্জন, বাহ্যিক চাকচিক্য, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা, কিংবা সুবিধা আদায় করার দক্ষতায়। এই মাপে মানুষের ভেতরের মেরুদণ্ড সততা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়, সহানুভূতি, সত্যভাষণ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। আদর্শ আসলে সেই অদৃশ্য মেরুদণ্ড; যা না থাকলে ব্যক্তি দাঁড়ায় বটে, কিন্তু সোজা দাঁড়ায় না। ব্যক্তি এগোয় বটে, কিন্তু আলোর দিকে নয় সুবিধার দিকে। আর যখন লাখো ব্যক্তি একই দিকে সরে যায়, তখন সমাজও সরে যায়; নিয়ম থাকে, কিন্তু ন্যায্যতা থাকে না; প্রতিষ্ঠান থাকে, কিন্তু বিশ্বাস থাকে না; প্রচার থাকে, কিন্তু চরিত্র থাকে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদর্শের প্রয়োজন আরও গভীর, কারণ আমরা বহু জায়গায় “সিস্টেম” দিয়ে নয়, “সম্পর্ক” দিয়ে চলতে শিখেছি। সম্পর্ক নিজে খারাপ নয়; কিন্তু যখন সম্পর্ক নীতিকে হার মানায়, তখন যোগ্যতা অপমানিত হয়, দুর্নীতি শক্তিশালী হয়, এবং সাধারণ মানুষের ন্যূনতম ন্যায্য অধিকারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একজন মানুষ যখন দেখে সৎ থাকা মানে পিছিয়ে থাকা, সত্য বলা মানে বিপদ ডেকে আনা, নিয়ম মানা মানে সুযোগ হারানো তখন তার ভেতরের মানদণ্ড ভেঙে যায়। এ ভাঙন শুধু ব্যক্তির নয়; এটা জাতির মানসিক স্বাস্থ্য, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র নির্মাণ সবকিছুর ওপর আঘাত। আদর্শ তাই “ভালো মানুষ হওয়ার বিলাসিতা” নয়; এটি একটি দেশের ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা যাতে কেউ ঠকলে লজ্জা পায় ঠকবাজ, ঠকা মানুষ নয়।
আদর্শ শব্দটি দরকার কারণ “আইন” সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না, কিন্তু বিবেক পৌঁছাতে পারে। আইন মানুষকে ধরে ফেলে; আদর্শ মানুষকে ধরে রাখে। আইন শাস্তি দেয়; আদর্শ লজ্জা দেয় এবং অনেক সময় লজ্জাই শাস্তির চেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, সম্পর্কনির্ভর, এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে নৈতিকতা তৈরি হয় না; নৈতিকতা তৈরি হয় ব্যক্তি-ব্যক্তির দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্র মুহূর্তে নেওয়া “আমি এটা করব না” বলা সাহসে। ঘুষ না নেওয়া, কাজটা ঠিকমতো করা, দুর্বলকে না চাপা, ক্ষমতার অপব্যবহার না করা এসবই আদর্শের ছোট ছোট ধ্বনি। এই ধ্বনি যখন সমাজে কমে যায়, তখন বড় বড় ভাষণও অর্থহীন হয়ে পড়ে; কারণ জাতি ভাষণে বাঁচে না, জাতি বাঁচে আচরণে।
আর “আদর্শ মানুষ” কেন দরকার? কারণ আদর্শ কাগজে লেখা থাকলে সমাজ বদলায় না মানুষের চরিত্রে লেখা থাকলে বদলায়। একজন আদর্শ মানুষ মানে এমন একজন, যিনি সুযোগ থাকলেও অন্যায় করেন না; যিনি প্রয়োজন থাকলেও অন্যের অধিকার কেটে নিজের সুবিধা তৈরি করেন না; যিনি ক্ষমতায় গেলে বিনয় হারান না; যিনি তর্কে জিততে গিয়ে সত্য হারান না। বাংলাদেশে আমরা প্রতিদিন যে ছোট ছোট সংকট দেখি—দুর্নীতি, অবিচার, মিথ্যার স্বাভাবিকীকরণ, নারী-শিশুর নিরাপত্তাহীনতা, জনপরিসরে অসভ্যতা, সহনশীলতার অভাব—এসবের গভীরে রয়েছে “মানুষের মানদণ্ড” নেমে যাওয়া। এই মানদণ্ড উঁচু না হলে উন্নয়ন কেবল সংখ্যার উন্নয়ন হয়; মানুষের উন্নয়ন হয় না। আর মানুষ উন্নত না হলে সমাজের ভেতরে শান্তি থাকে না শুধু চাপা ক্ষোভ থাকে, অনাস্থা থাকে, সন্দেহ থাকে।
আদর্শের সবচেয়ে বড় কাজ হলো মানুষকে মানুষে ফিরিয়ে আনা। যখন মানুষ কেবল “ফলাফল” দেখে, তখন অন্য মানুষ হয়ে যায় “ব্যবহার্য বস্তু” যাকে ঠেলে সরিয়ে এগোনো যায়। আদর্শ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় মানুষ কোনো বস্তু নয়; মানুষ সম্মানের অধিকারী। এই বোধ ছাড়া পরিবার টেকে না, প্রতিষ্ঠান টেকে না, রাষ্ট্রও টেকে না। আদর্শ তাই বাংলাদেশের জন্য একধরনের জাতীয় শ্বাস-প্রশ্বাস: এটা না থাকলে আমরা হাঁটব ঠিকই, কিন্তু দম বন্ধ হয়ে যাবে ভেতরে। উন্নয়নের অবকাঠামো থাকবে, কিন্তু ভেতরের মানবিক ভিত্তি ভেঙে পড়বে।
শেষ কথা হলো বাংলাদেশে আদর্শ শব্দটি দরকার, কারণ আমরা যদি আদর্শকে “ব্যক্তিগত” বলে এড়িয়ে যাই, তবে অন্যায়কে “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিতে হবে। আর অন্যায় যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন ভালো মানুষ হওয়াটাই অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। এই উল্টো পৃথিবী থেকে বের হতে হলে আমাদের দরকার আদর্শ একটা শক্ত, নীরব, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা: আমি মানুষ হব, আমি ন্যায়কে সম্মান করব, আমি সত্যকে সহজে বিক্রি করব না। আদর্শ কোনো আকাশি কল্পনা নয় এটা প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তই একদিন জাতিকে বদলায়।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Epstein File-মানবতার কলঙ্ক

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

গত ৩০ জানুয়ারি Epstein Files এর ৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি, ২,০০০ অধিক ভিডিও এবং ১৮০,০০০টি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সব কুকর্ম ফাঁস করা হয়েছে!
যারা মানবতা, সভ্যতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

রোজার ২৪ আধুনিক মাসআলা, যেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন সকলেরই - রিপোস্ট

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০

রোজার ২৪ আধুনিক মাসআলা, যেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন সকলেরই - রিপোস্ট

ছবিঃ অন্তর্জাল।

পবিত্র মাহে রমজান খুবই নিকটবর্তী। আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা'বান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান। হে আল্লাহ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের আমিরের একাউন্ট হ্যাক আওয়ামী লীগের হ্যাকাররা করে থাকতে পারেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৫৮



নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি। গত বছর, লন্ডন থেকে আমার এক আত্মীয় হঠাত একদিন আমাকে জানান যে, 'গ্রামের রাজনীতি' নামক এক ফেসবুক পেইজে আমার উপরের ছবি দেওয়া হয়েছে। আমি হতবাক!... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একটি জোনাক প্রহর দেবে আমায়=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৮


গাঁয়ের বাড়ি মধ্যরাতে
জোনাক নাকি বেড়ায় উড়ে,
ঝিঁঝি নাকি নাকি সুরে
ডাকে দূরে বহুদূরে?

মধ্যরাতের নীল আকাশে
জ্বলে নাকি চাঁদের আলো!
রাতে নাকি নিরিবিলি
বসে থাকলে লাগে ভালো?

শিয়াল ডাকে হুক্কা হুয়া;
কুকুর ডাকে একা ঘেউ ঘেউ;
মধ্যরাতে গাঁয়ে নাকি
ঘুমায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তানের বির্যে জন্ম নেয়া জারজরা ধর্মের ভিত্তিতে, বিভাজিত করতে চায় বাংলাদেশের নাগরিকদের ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৯



বাংলাদেশী ধর্মান্ধ মুসলমান,
বাঙালি পরিচয় তোমার কাছে অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য।
তুমি কি দেশে দেশে Ehtnic Cleansing এর ইতিহাস জানো? জাতিগত নিধন কী বোঝো?
বাঙালি জাতি নিধনের রক্ত-দাগ প্রজন্ম থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×