রমজান এমন একটি মাস, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের দিকে তাকানোর সুযোগ পায়। বছরের অন্য সময় আমরা ব্যস্ত থাকি কাজ, পরিবার, প্রতিযোগিতা ও দুনিয়াবী চিন্তায়। কিন্তু রমজান এসে আমাদের থামতে শেখায়। এই থামার মধ্যেই শুরু হয় আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ—তাওবা ও ইস্তিগফার। অন্তর পরিষ্কার করার কাজ বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে শুরু হয়। আর সেই ভেতরের পরিশুদ্ধির চাবিকাঠি হলো আন্তরিক অনুতাপ।
আল্লাহ তাআলা আল-কুরআন-এ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।” (৬৬:৮)। এই খাঁটি তাওবা মানে কেবল মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা নয়; বরং ভুল স্বীকার করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং আর সেই ভুলে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা। যখন মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে, তখন তার অহংকার ভেঙে যায়। আর অহংকার ভাঙা ছাড়া অন্তর পরিষ্কার হয় না।
গুনাহ মানুষের অন্তরে একটি দাগ সৃষ্টি করে। হাদিসে এসেছে, মানুষ যখন পাপ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে; আর তাওবা করলে সেই দাগ মুছে যায়। অর্থাৎ তাওবা হলো হৃদয়ের ধোয়ার প্রক্রিয়া। আমরা প্রায়ই বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার দিকে যত্নবান, কিন্তু অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ভুলে যাই। রমজান সেই ভুলে যাওয়া কাজটি মনে করিয়ে দেয়। ক্ষুধা, সংযম ও ইবাদতের পরিবেশ মানুষকে সংবেদনশীল করে তোলে। তখন সে নিজের ভুলগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পায়।
ইস্তিগফার মানে ক্ষমা প্রার্থনা। এটি কেবল শব্দ নয়, এটি আত্মার আর্তনাদ। যখন মানুষ বলে “আস্তাগফিরুল্লাহ”, তখন সে আল্লাহর কাছে স্বীকার করে—আমি দুর্বল, আমি ভুল করেছি, আমি আপনার ক্ষমা চাই। এই স্বীকারোক্তি অন্তরকে নরম করে। কঠিন হৃদয় নরম না হলে আলোর প্রবেশ ঘটে না। রমজানের রাতের নির্জনতা, তাহাজ্জুদ, দোয়া—এসব মুহূর্ত ইস্তিগফারকে গভীর করে তোলে।
মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা হলো তাওবার অপরিহার্য অংশ। প্রতিদিন কিছু সময় নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা—আজ আমি কাকে কষ্ট দিলাম? কোথায় মিথ্যা বললাম? কোথায় অহংকার দেখালাম?—এই প্রশ্নগুলো মানুষকে ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে। রমজানের পরিবেশ এই আত্মসমালোচনাকে সহজ করে। কারণ এই মাসে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সংযত থাকে, তাই তার বিবেক বেশি সক্রিয় থাকে।
রমজান আমাদের শেখায়, গুনাহবোধ কোনো দুর্বলতা নয়; এটি ঈমানের লক্ষণ। যে ব্যক্তি ভুল বুঝতে পারে না, সে সংশোধনও করতে পারে না। কিন্তু যে ব্যক্তি ভুল স্বীকার করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে ধীরে ধীরে অন্তরের কালিমা দূর করতে পারে। তাওবা অন্তরকে হালকা করে, ইস্তিগফার হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং মুহাসাবা মানুষকে সৎ ও সচেতন করে তোলে।
এই মাসে রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে। তাই তাওবা দ্রুত কবুল হওয়ার আশা থাকে। যখন মানুষ আন্তরিকভাবে ফিরে আসে, তখন তার অতীতের অন্ধকার ধীরে ধীরে আলোয় রূপান্তরিত হয়। তাওবা মানে শুধু পাপ থেকে ফিরে আসা নয়; এটি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
সবশেষে বলা যায়, অন্তর পরিষ্কার করার প্রথম ধাপ হলো নিজের ভুল স্বীকার করা। রমজান সেই সাহস দেয়। তাওবা ও ইস্তিগফার মানুষকে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ দেয়। যেমন বৃষ্টির পানি ধুলোমাখা জমিনকে পরিষ্কার করে, তেমনি আন্তরিক তাওবা হৃদয়ের কালিমা ধুয়ে দেয়।
রমজান আমাদের আহ্বান জানায়—নিজের ভেতরের দিকে তাকাও, ভুলগুলো স্বীকার করো, ক্ষমা চাও এবং নতুন মানুষ হয়ে উঠো। কারণ পরিষ্কার অন্তরই আল্লাহর নিকটতম হওয়ার প্রথম শর্ত।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


