গতরাতে একটা লেখা শেষ করে ঘুমাতে যেতে একটু বেশীই রাত হয়েছিলো। দাঁত ব্রাশ করে বিছানায় যেতে যেতে রাত প্রায় দেড়টা। শোয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ি। অধুনা ফজরের নামাজের সময় প্রায়ই আমার স্ত্রী আমাকে ডেকে দেন। আমি আগে উঠলে আমিও ওকে ডেকে দেই। আমার ডাকের ধরণটা একটু মাইল্ড, ওনারটা প্রয়োজনে বেশ ভায়োলেন্ট হয়, অনেকটা ভূমিকম্পের মতই, না উঠে পারা যায় না।
আজ শেষ রাতে মনে হচ্ছিলো উনি আমাকে মুখে কোন শব্দ না করে ডেকে দিচ্ছেন। অর্থাৎ গা ধাক্কা দিয়ে নামাতে চেষ্টা করছেন। কিছুটা বিরক্ত বোধ করছিলাম, আবার ওঠার তাগিদও ছিল মনে মনে। উঠতেই যখন হবে, তখন তাড়াতাড়িই উঠি, এই ভেবে বালিশটা থেকে মাথা তুলে দেখলাম, না আমার স্ত্রী তো আমাকে ধাক্কা দিচ্ছেন না। কিন্তু তখনো ধাক্কা খেয়ে চলেছি। চট করে বুঝে নিলাম, ভূমিকম্প হচ্ছে। অন্য সময় হলে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখতাম,ফ্যানটা নড়ছে কিনা। অন্ধকারে সেটা করার উপায় নেই। ততক্ষণে আমার ঘুমন্ত স্ত্রীও টের পেয়ে উঠে গেছেন এবং ভূমিকম্প নামটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে ফেলেছেন। তিনি একটা হুলুস্থুল কিছু করার পাঁয়তারা করছেন, এটা বুঝতে পেরে তাকে আস্তে করে একটু শান্ত থাকার কথা বললাম। নিজেও শান্তভাবে বিছানা ছেড়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার। ঘড়িতে তখন সকাল পাঁচটা দশ। একটু পরেই দুই একজন মানুষের ক্ষীণ কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম। নিমেষেই সেটা শোরগোলে পরিণত হতে থাকলো।
এর আগের কয়েকটা ভূমিকম্পের সময় আমিই প্রথমে হৈ চৈ শুরু করে সবাইকে নীচে নামার আহ্বান জানিয়েছিলাম। নিজেও চট করে মানিব্যাগটা আর সামনে যা পাই কিছু ঔষধ পকেটে পুড়ে আর ডাইনিং টেবিল থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে ধাবমান হয়েছিলাম। কিন্তু আজ বড়ই আলস্যভরে নিয়তির কাছে আত্ম সমর্পণ করেছিলাম। স্ত্রীকে বারণ করেছিলাম ছেলে আর বৌ্দেরকে ডেকে তুলতে। উনি বারবার বীম খুঁজছিলেন, যেটার নীচে সবাইকে নিয়ে দাঁড়াতে পারেন। প্রয়োজনের সময় চিরচেনা জিনিসও খুঁজে পাওয়া যায় না। উনি জানেন যে এর আগের বারের ভূমিকম্পের পর আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে একটু হোমওয়ার্ক করেছিলাম। তাই উনি বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন যে কোথায় লুকোতে হবে। আমি বললাম, আর কিছু করতে হবেনা। উনি মনে করিয়ে দিলেন যে আমি এর আগেরবার বলেছিলাম, প্রথমবারের ভূমকম্পের কত মিনিট পরে যেন দ্বিতীয়টা আসে। উনি দ্বিতীয়টার জন্য তৈরী হচ্ছিলেন। ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখে তিনি আবার চীৎকার শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, আমাকে কিছুটা তিরস্কারের সুরেই জানালেন, আমাদের একতলা নীচের শাহীন সাহেবরা নেমেছেন, সিকিউরিটি গার্ডটা টর্চ হাতে সবাইকে নীচে নামার জন্য ডাকছে, আমার বন্ধু শহীদরা সপরিবারে নেমেছেন, তবুও আমরা কেন নামবোনা?
ততক্ষণে আমার মেজ ছেলে চোখ কচলাতে কচলাতে দুয়ার খুলে বের হলো। সে জানালো যে ধাক্কার চোটে তার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। আমরা সবার উপরে ষষ্ঠ তলায় থাকি। সেখান থেকে সবাই মিলে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামাটাও বেশ সময়ের ব্যাপার। আমাদের নীচে নামা উচিত কিনা, আমার স্ত্রী চট করে ওর সাথে সে পরামর্শটা সেরে নিলেন। ওর থেকে কোন সাড়া না পেয়ে এবং আমাকে চরম নির্বিকার দেখে এ যাত্রায় তার আর বেশী কিছু করার ছিলনা। তিনি নামাজ পড়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন। ছোট ছেলেটা কিছুই টের পেলনা। ও সবার আগে বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যায় বলে আমিও ওকে আর ডাকিনি। আমিও ফজরের নামাজ পড়ে নিয়ে ল্যাপটপটা অন করলাম, দেখি বন্ধুরা কে কি করছে বা বলছে! ভূমিকম্পের ব্যাপারে বিশ্ব কী বলছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এবারে আমি কেন এতটা নির্বিকার থাকলাম? সন্দেহ নেই যে আজকের ভূমিকম্পের মাত্রাটা আগেরগুলোর চেয়ে অনেক বেশী ছিলো। তবুও এতটা প্রতিক্রিয়াহীন থাকতে পারলাম কী করে? আমি তো পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি, সামনে একটা বড় ধরণের বিপর্যয় আসছে। আজকেরটার মাত্রা নাকি রিখটার স্কেলে ৬.৭ ছিল। আর সামান্য একটু বেশী হলেই তো প্রচুর প্রাণহানি ঘটতো। তবে কি আমি এখন অদৃষ্টবাদী হয়ে গেছি? সত্যি সত্যি যেদিন ব্যাঘ্রমামা এসে হাজির হবেন, সেদিন কি এত কিছু ভাবার সময় দিবেন? তবে প্রাণ বাঁচানোর জন্য কিছু ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সামগ্রীর একটা কিটব্যাগ হাতের কাছে তৈ্রী রাখলে মন্দ হয়না। আমার মনে হয় সংসারের কর্ত্রীগণ এ নিয়ে অচিরেই একটা গবেষণা শুরু করে দিতে পারেন। কর্তাগণ তৈ্রী থাকতে পারেন, সেই কিটব্যাগ নিজে বহন করার জন্য। বিপদে হায় হায়, কেহ কারো নয়। কোথায় পাবেন ভৃত্য সে সময়ে?
ঢাকা
০৪ জানুয়ারী ২০১৬
সকাল পাঁচটা পঞ্চান্ন।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




