somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিদায় বন্ধু, বিদায়ঃ

১২ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমার এই লেখার পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা (অবঃ), আজ দুপুর ০১-৪০ ঘটিকায় ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে আরজ করছি, তিনি যেন মরহুমের জীবনের ছোট বড় সকল গুনাহ মাফ করে দেন, তার জীবনের সকল নেক আমল এবং নেক নিয়তসমূহকে কবুল করে নেন, তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের সহায় হন এবং তাকে জান্নাত নসীব করেন। তার পুরনো একটি ও সাম্প্রতিক দুটো ছবি সংযোগ করলাম। সাম্প্রতিক ছবি দুটো সিএমএইচে গত ১০-৩-২০১৬ তারিখে তোলা।

মৃত্যুর ঠিক ৪৮ ঘন্টা আগেও আমি কিছুক্ষণ তার হাত ধরে তার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। উনি তখন ঘুমের ঔষধের প্রভাবে আধো ঘুমে ছিলেন। তার চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো ছিলো। ফর্সা মুখটিতে তার দু’দিন আগে ঘটে যাওয়া হার্ট এটাকের কষ্টের কোন ছাপ ছিলনা, ছিলো একটা প্রশান্তির ছায়া। তিনি কয়েকবার চোখ দুটো খুলে আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার কথা বলার শক্তিও ছিলনা, আবার নিষেধও ছিল। তাই আমি তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে ইশারায় ঘুমাতে বললাম। উনি চোখ বন্ধ করছিলেন, আবার খুলছিলেন। তার এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলাম, তিনি আমাকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলতে চাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তার লাঞ্চ আসায় তাকে লাঞ্চ করার সুযোগ দিয়ে আমি আস্তে আস্তে তার কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই চলে এলাম। হায়, তখন কে জানতো যে এটাই হবে আমাদের শেষ চাক্ষুষ দেখা! এখন সেটা ভেবে আফসোস হচ্ছে। আমি জানি তার কাছে বিদায় নিতে চাইলে তিনি বলতেন, “স্যার, দোয়া করবেন”। এর আগের দু’বারে তাকে দেখে চলে আসার সময় তার কাছ থেকে বিদায় নিয়েই এসেছিলাম। তখন তিনি একথাই বলেছিলেন।

আজ বিকেল সাড়ে তিনটার সময় সেলফোনে এক ক্ষুদে বার্তায় তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে চমকে উঠলাম। কারণ গত পরশুদিনও তাকে দেখে আমার একবারও মনে হয়নি যে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী। বার্তায় বলা হয়েছে তার জানাজার নামায অনুষ্ঠিত হবে আজই বাদ আসর এবং দাফন হবে তার পরপরই। বুঝলাম, তার অন্তিম যাত্রার সব আয়োজন খুব দ্রুতই সম্পন্ন করা হয়েছে/হচ্ছে। আমাকেও এই দুই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য খুব দ্রুতই তৈ্রী হতে হলো। জানাযায় তার অনেক বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীর সাথে দেখা হলো। সবাই শোকাহত। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। জানাজার আগে তার ছেলে শোকের প্রতীক একটা কালো পাঞ্জাবী পরিহিত মেজর এস এম হাসিব আজিজ অতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। তাকে খুব শান্ত ও সৌ্ম্য (কাম এন্ড কম্পোজড) দেখাচ্ছিলো। নামাজ শেষে বনানী কবরস্থানের দিকে রওনা হলাম। জ্যাম ঠেলে কোন রকমে সেখানে পৌঁছলাম। তার ছেলে সবার আগে কবরে নেমে গেলেন, তারপর তার দুইজন বন্ধু। একটি চৌকষ ক্ষুদ্র সামরিক দল তাকে ‘মরণোত্তর সশস্ত্র সালাম’ বা ‘গার্ড অব অনার’ দিল। যারা কবরে নেমেছিলেন, তারা উঠে এলেন। এবারে গোর খোদকগণের পালা। তারা একে একে বাঁশদন্ড আর চাটাই বিছাতে লাগলো। তারপর আমরা একে একে মাটির গুড়া ও দলা হাতে নিয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাভরে তার কবর ঢেকে দিলাম আর মাওলানা সাহেবের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে থাকলাম, “মিনহা খালাক নাকুম, ওয়া ফিহা নুয়িদুকুম, ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম, তা’রাতান উখরা” - "মাটি দিয়ে আমি সৃষ্টি করেছি, এই মাটিতেই আবার ফিরিয়ে নেব, এই মাটি থেকেই আবার আমি তুলে আনব।“ (সূরা ত্বাহা :২০ :৫৫)

মেজর হাসিবের জন্য খুব ব্যথিত বোধ করছি। তিনিও তার পিতার মত অত্যন্ত সুদর্শন। বিষন্নতার ছায়া যদিও তার সুন্দর মুখটাকে মলিন করে দিয়েছিল, যা খুবই স্বাভাবিক, এর মাঝেও তিনি নিজেকে অত্যন্ত কম্পোজড রেখেছিলেন। আমি যে ক'দিন সিএমএইচে তার বাবাকে দেখতে গিয়েছি, তাকে দেখেছি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তার অসুস্থ বাবার সেবা শুশ্রূষা করতে। আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন!

মাত্র পরশুদিন যার শয্যাপাশে হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলাম, তিনি এখন কবরস্থ- এক নবযাত্রার মোসাফির।

ঢাকা
১২ এপ্রিল ২০১৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।


সার্ভিসে থাকাকালীন লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা


লেখকের সাথে লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা (অবঃ)। ছবিটি গত ১০-৩-২০১৬ তারিখে তার হাসপাতাল শয্যায় বসে তোলা হয়।


লেখকের সাথে লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা (অবঃ) এবং তার একমাত্র ছেলে মেজর এস এম হাসিব আজিজ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১২:১৫
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?
============================================
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×