আমি আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমার এই লেখার পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা (অবঃ), আজ দুপুর ০১-৪০ ঘটিকায় ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে আরজ করছি, তিনি যেন মরহুমের জীবনের ছোট বড় সকল গুনাহ মাফ করে দেন, তার জীবনের সকল নেক আমল এবং নেক নিয়তসমূহকে কবুল করে নেন, তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের সহায় হন এবং তাকে জান্নাত নসীব করেন। তার পুরনো একটি ও সাম্প্রতিক দুটো ছবি সংযোগ করলাম। সাম্প্রতিক ছবি দুটো সিএমএইচে গত ১০-৩-২০১৬ তারিখে তোলা।
মৃত্যুর ঠিক ৪৮ ঘন্টা আগেও আমি কিছুক্ষণ তার হাত ধরে তার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। উনি তখন ঘুমের ঔষধের প্রভাবে আধো ঘুমে ছিলেন। তার চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো ছিলো। ফর্সা মুখটিতে তার দু’দিন আগে ঘটে যাওয়া হার্ট এটাকের কষ্টের কোন ছাপ ছিলনা, ছিলো একটা প্রশান্তির ছায়া। তিনি কয়েকবার চোখ দুটো খুলে আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার কথা বলার শক্তিও ছিলনা, আবার নিষেধও ছিল। তাই আমি তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে ইশারায় ঘুমাতে বললাম। উনি চোখ বন্ধ করছিলেন, আবার খুলছিলেন। তার এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলাম, তিনি আমাকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলতে চাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তার লাঞ্চ আসায় তাকে লাঞ্চ করার সুযোগ দিয়ে আমি আস্তে আস্তে তার কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই চলে এলাম। হায়, তখন কে জানতো যে এটাই হবে আমাদের শেষ চাক্ষুষ দেখা! এখন সেটা ভেবে আফসোস হচ্ছে। আমি জানি তার কাছে বিদায় নিতে চাইলে তিনি বলতেন, “স্যার, দোয়া করবেন”। এর আগের দু’বারে তাকে দেখে চলে আসার সময় তার কাছ থেকে বিদায় নিয়েই এসেছিলাম। তখন তিনি একথাই বলেছিলেন।
আজ বিকেল সাড়ে তিনটার সময় সেলফোনে এক ক্ষুদে বার্তায় তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে চমকে উঠলাম। কারণ গত পরশুদিনও তাকে দেখে আমার একবারও মনে হয়নি যে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী। বার্তায় বলা হয়েছে তার জানাজার নামায অনুষ্ঠিত হবে আজই বাদ আসর এবং দাফন হবে তার পরপরই। বুঝলাম, তার অন্তিম যাত্রার সব আয়োজন খুব দ্রুতই সম্পন্ন করা হয়েছে/হচ্ছে। আমাকেও এই দুই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য খুব দ্রুতই তৈ্রী হতে হলো। জানাযায় তার অনেক বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীর সাথে দেখা হলো। সবাই শোকাহত। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। জানাজার আগে তার ছেলে শোকের প্রতীক একটা কালো পাঞ্জাবী পরিহিত মেজর এস এম হাসিব আজিজ অতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। তাকে খুব শান্ত ও সৌ্ম্য (কাম এন্ড কম্পোজড) দেখাচ্ছিলো। নামাজ শেষে বনানী কবরস্থানের দিকে রওনা হলাম। জ্যাম ঠেলে কোন রকমে সেখানে পৌঁছলাম। তার ছেলে সবার আগে কবরে নেমে গেলেন, তারপর তার দুইজন বন্ধু। একটি চৌকষ ক্ষুদ্র সামরিক দল তাকে ‘মরণোত্তর সশস্ত্র সালাম’ বা ‘গার্ড অব অনার’ দিল। যারা কবরে নেমেছিলেন, তারা উঠে এলেন। এবারে গোর খোদকগণের পালা। তারা একে একে বাঁশদন্ড আর চাটাই বিছাতে লাগলো। তারপর আমরা একে একে মাটির গুড়া ও দলা হাতে নিয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাভরে তার কবর ঢেকে দিলাম আর মাওলানা সাহেবের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে থাকলাম, “মিনহা খালাক নাকুম, ওয়া ফিহা নুয়িদুকুম, ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম, তা’রাতান উখরা” - "মাটি দিয়ে আমি সৃষ্টি করেছি, এই মাটিতেই আবার ফিরিয়ে নেব, এই মাটি থেকেই আবার আমি তুলে আনব।“ (সূরা ত্বাহা :২০ :৫৫)
মেজর হাসিবের জন্য খুব ব্যথিত বোধ করছি। তিনিও তার পিতার মত অত্যন্ত সুদর্শন। বিষন্নতার ছায়া যদিও তার সুন্দর মুখটাকে মলিন করে দিয়েছিল, যা খুবই স্বাভাবিক, এর মাঝেও তিনি নিজেকে অত্যন্ত কম্পোজড রেখেছিলেন। আমি যে ক'দিন সিএমএইচে তার বাবাকে দেখতে গিয়েছি, তাকে দেখেছি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তার অসুস্থ বাবার সেবা শুশ্রূষা করতে। আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন!
মাত্র পরশুদিন যার শয্যাপাশে হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলাম, তিনি এখন কবরস্থ- এক নবযাত্রার মোসাফির।
ঢাকা
১২ এপ্রিল ২০১৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সার্ভিসে থাকাকালীন লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা

লেখকের সাথে লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা (অবঃ)। ছবিটি গত ১০-৩-২০১৬ তারিখে তার হাসপাতাল শয্যায় বসে তোলা হয়।

লেখকের সাথে লেঃ কর্নেল এস এম আবু রেজা (অবঃ) এবং তার একমাত্র ছেলে মেজর এস এম হাসিব আজিজ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


