
(আমার দার্শনিক দাদুটা এভাবেই মাঝে মাঝে এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখে, কি যেন ভাবে.....)
এবারেরটা নিয়ে গত তিনটা ঈদের নামায বাসাতেই পড়লাম, ঘরোয়া ব্যবস্থাপনায়। স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি যে কোনদিন ঈদের নামাযে ইমামতি করতে হবে। করোনার কারণে সেটাও বাস্তব হলো। মুসল্লীর সংখ্যা দুই শিশুসহ সাতজন। নামায শুরুর আগে নামাযের পদ্ধতিটা সবাইকে জানিয়ে দিলাম, কেননা বছরে মাত্র দু’বার পড়া হয় বলে এ পদ্ধতিটা অনেকেই ভুলে যায়। এই প্রথম ঈদের নামাযে আমাদের সাথে দুই নাতি নাতনিও শামিল হলো। নাতনি আনায়া’র বয়স সাড়ে ছয়, ও সুরা ফাতিহাসহ আরেকটি সুরা শিখেছে, সাথে কিছু দোয়া দরুদ। নাতি আরহাম এর বয়স এখনো দেড় বছর হয়নি, নামায বলতে ও বুঝে জায়নামাযের উপর উপুর হয়ে সিজদা দিতে দিতে একসময় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়া। ছোটটা সকালে একা একাই উঠেছে। বড়টাকে ডাকতে ডাকতে হয়রান হয়ে ওর মা কিছুটা জোর করেই বিছানা থেকে নামিয়েছে। এ নিয়ে ওর মন খুব ভার ছিল নামায শুরু হবার আগে পর্যন্ত। নামায শুরু হবার সাথে সাথে ও অবশ্য সবকিছু ভুলে সবাইকে অনুকরণ করে নামায পড়েছে।
নামাযের পর সালাম পর্ব শুরু হলো। বোধশক্তি হবার পর এবারই প্রথম আনায়া এ আদব-আচারের সাথে পরিচিত হলো। প্রথম সালামীটা পেয়ে সে খুব উচ্ছ্বসিত হলো। জনে জনে সে নোটটা দেখাতে লাগলো এবং আশ্চর্য্য হতে থাকলো যখন জনে জনে সবাই ওকে একটা করে নোট দিতে থাকলো। দৌড়ে গিয়ে সেসব নোট সে মায়ের কাছে জমা দিতে থাকলো। ওর দিদি ওর জন্যে একটা লাল ফ্রক নিজ হাতে বানিয়ে রেখেছিল, সাথে ম্যাচিং লাল স্যান্ডেল। এটা পেয়েও সে খুব খুশি। ছোটটা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে ওর টুপিটা পেয়ে। এতদিন সে দাদার টুপি নিয়ে টানাটানি করতো। আজ নিজের টুপি পেয়ে খুব খুশি। মাঝে মাঝে নিজের মাথা থেকে খুলে সে সেটা আমার মাথায় পরাতে চায়। কিন্তু পরাতে পারেনা বলে আমার মাথারটা খুলে নেয়। ওর এ বয়সে আর সবগুলো ইন্দ্রিয়ের চেয়ে প্রখর হচ্ছে স্পর্শেন্দ্রিয়। সবকিছু সে হাত দিয়ে স্পর্শ করে পরখ করতে চায়। ফলে ওর হাত খুব ঘন ঘন ধোয়াতে হয়। ঘরের যেসব আনাচে কানাচে সচরাচর কারো স্পর্শ পড়ে না, যেমন খাটের নীচ, দরজার চিপা, পর্দার পেছন দিকটা, জুতো স্যান্ডেলের তলা, গ্রিলের কোণা, এসবের দিকেই ওর নজর বেশি থাকে। এমনকি আমি বেসিনে হাত ধোয়ার সময় কখন যে ও পিছে পিছে ঢুকে পড়ে, তা টেরই পাই না। বাথরুমে ঢুকে ওর প্রথম আকর্ষণ কমোডের সীট কভার তুলে তার উপর দু’হাত রেখে একবার পানির দিকে তাকানো, আরেকবার আমার চোখের দিকে। আমাকে বেখেয়াল দেখতে পেলেই ও কমোডের পানি স্পর্শ করতে চায়। গোসলের আগে হলে ওকে সাথে সাথে গোসল দেয়া হয়। পরে হলে ওকে হাত ধোয়ার জন্য টেনে তুলতে গেলে কান্না জুড়ে দেয়। আমি তখন আনায়াকে ডেকে ওর হাত ধোয়াতে শুরু করি। সেটা দেখে ও কান্না থামিয়ে নিজেই দু’হাত বাড়িয়ে দেয়। সাবান লাগাতে দেরি করলে নিজেই সাবান দেখিয়ে ওটা লাগাতে বলে। হাত ধোয়া হলে ও প্রায়ই পর্দা সরানো জানালার কাছে এসে অনতিদূরের গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকে। কর্কশ স্বরে ডাকতে ডাকতে টিয়া পাখির ঝাঁক উড়ে যায়, ও সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ওর ভাষায় কিছু কথাও বলে।
ছোট থাকতে আনায়াকে আমি প্রতিদিন দুপুরে বুকে নিয়ে গান গেয়ে ঘুম পাড়াতাম। ও যত বড় হতে থাকলো, ততই ঘুম পরিহৃত হতে থাকলো। এখন যদি বাসার সবাই ঘুমিয়েও পড়ে, ও একাই হয় কার্টুন দেখবে, নয়তো ছবি আঁকবে, নয়তো পুতুল নিয়ে খেলবে। কিছুতেই বিছানায় আসবে না, শত গল্প বলার প্রলোভনেও। এদিক থেকে ছোটটা খুব ভাল। ওকে ঘুম পাড়াতে আমার পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি সময় লাগে না। একবার ঘুমালে দুই আড়াই ঘন্টা নিশ্চিন্তে ও ঘুমিয়ে থাকে। তরমুজ ও কলা ওর খুব প্রিয়। সকাল থেকে এটা ওটা খেয়ে ওর পেট ভরাই ছিল। ঈদের রানাবান্নায় যখন ওর মা ও দিদি ব্যস্ত, আমি ওকে ওর প্রিয় ফলদুটো খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম, নিজেও ঘুমিয়ে পড়লাম। ৩০ দিন রোযা রাখার অভ্যাসের ফলে সকালে নাস্তা করার কোন তাগিদ ছিল না, তাই অনেক দেরি করে নাস্তা করা হলো। নামায পড়া, গল্প করা, কাছে দূরের থেকে আসা টেলিফোন রিসীভ করা, প্রবাসী ছেলেদের সাথে কথা বলা, ইত্যাদি করতে করতে বেলা যে কখন গড়িয়ে গেল, সেদিকে রাঁধুনীদের যেমন খেয়াল ছিল না, বিলম্বে নাস্তা করাতে পেট ভরা থাকায় ভোক্তাদেরও তেমন তাগিদ ছিল না। ফলে আমিও বেশ স্বাচ্ছন্দেই একটা দিবানিদ্রার সুযোগ নিলাম। ঘুম ভাংলো যখন টেবিলে লাঞ্চ রেডী করে আমাকে ডাকা হলো।
সন্ধ্যার পর আনায়া ও আরহাম ওদের মায়ের সাথে ঈদ আনন্দের বাকি অংশটুকু নানুদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য ওদের নানুবাড়ীতে চলে গেল। ছোট বৌমাও ছোট ছেলেকে সাথে নিয়ে ওদের বাড়ীতে চলে গেল ঈদের বাকি অংশটুকু কাটাতে। এ ক’টা দিন গমগম করা বাড়ীটা আবার ফাঁকা হয়ে গেল। গিন্নীকে দেখলাম বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সারাদিনের কর্মব্যস্ত দিনের ফাঁকে ফাঁকে তোলা ছবিগুলো দেখছে আর এটা ওটা মন্তব্য করছে। মন্তব্যের সারাংশ, ‘ওদের খুশিই আমাদের খুশি’। আমিও সে কথায় সায় দিয়ে ভাবতে লাগলাম, কেমন কাটালাম এবারের ঈদের দিনটা! ভাবতে ভাবতেই কবিতার মত কিছু একটা লিখেও ফেললামঃ
ঈদ আনন্দ – ২০২১
ঈদ আনন্দ কখনো আর সবার মত আমার
এ অন্তর্মুখী মনে আনন্দধারা বয়ে আনতো না।
কখনো ঈদমুখী হয়ে থাকতাম না। তবুও-
যখন ঈদ আসতো, দিনশেষে চলেও যেত,
যথারীতি নিষ্ঠার সাথে যাবতীয় আচারাদি
মান্য করে যেতাম ঠিক সুবোধ বালকের মত।
আজকের কথা ভিন্ন।
আজকের মানে পরিণত বয়সের কথা বলছি।
আজ মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে
অপত্য উত্তরপুরুষের আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে।
এ আনন্দ হিল্লোল হয়তো বাহ্যিক দৃশ্যমান নয়।
অতি সঙ্গোপনে তা মানস সরোবরে তরঙ্গ ছড়ায়।
অপত্য স্নেহ ভালবাসা যত নিম্নমুখী, তত গভীর।
কোলে পিঠে বুকে ওদের থাকে নিরঙ্কুশ অধিকার।
যতদিন ওরা থাকে দৃষ্টির সামনে, ওদের খুশির
একটি হাসির দ্যূতিও চোখের পাতায় লটকে রয়।
ইচ্ছে হয়, ওদেরকে ছায়া দিয়ে রাখি, হাত ধরে
ওদেরকে নিয়ে পাড়ি দেই দুস্তর পথ, যতটা পারি!
(আজ পবিত্র ‘ঈদুল ফিতর’ এর কিছু আনন্দময় স্মৃতিকে ঘিরে)
ঢাকা
১৪ মে ২০২১

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০২১ সকাল ৮:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




