somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুরের বাঁধনে গড়া মানুষের মন

০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সঙ্গীতের কোন ধারাতেই আমার কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। অনেক ছোটবেলায় আম্মা আমাদেরকে কিছু কিছু কবিতা সুর করে মুখস্থ শোনাতেন। আমরা সেগুলো শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম। এখনও সেসব সুর করে গাওয়া কবিতা ও ছড়াগুলো কানে বাজে। যেমনঃ আমাদের ছোট নদী, পাখি সব করে রব, আমি হবো সকাল বেলার পাখি, ভোর হলো, দোর খোলো, বহুদিন পরে মনে পড়ে আজি পল্লী মায়ের কোল….. ইত্যাদি। তখনকার দিনে ছোট ও মাঝারি ক্লাসে পাঠ্য এ ধরণের প্রায় সব ছড়া ও কবিতাই আম্মার মুখস্থ ছিল। বিশেষ করে “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে” পুরো কবিতাটি তিনি খুব সুন্দর করে সুর করে শোনাতেন, ফলে কবিতাটির চিত্রকল্প আপন মনের মাধুরীতে কল্পনা করতে করতে আমরা নিদ্রাদেবীর কোলে নিমেষেই ঢলে পড়তাম। বিশেষ করে আমার কাছে কবিতার এই স্তবকটা খুব বেশি ভালো লাগতো এবং আমাকে সুদূর কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যেতঃ

“তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে৷
সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে”।


এই স্তবকটা আমার বেশি ভালো লাগতো কারণ, আমাদের বাসার পাশ দিয়ে একটা সরু নালা প্রবাহিত ছিল। সেটা শীতকালে শুকনো থাকতো, কিন্তু বর্ষা হলে ভরে যেত এবং আমাদের প্রায় কোমর সমান পানি হতো। তখন আমরা, আমার সমবয়সী ছেলেপেলেরা সেটাতে নামতাম। আমাদের পদচারণায় নালার পানি ঘোলা হয়ে উঠতো। সেই ঘোলাপানিতে কিলবিল করে ভেসে ওঠা ছোটছোট ডানকানা মাছগুলোকে স্পষ্ট দেখা যেত। সেগুলোকে আমরা গামছার ‘আঁচলে ছাঁকিয়া” নয়, দুই হাতের তালুর ফাঁদে ফেলেই ধরতাম। মাঝে মাঝে অবশ্য অস্বস্তিকরভাবে দুই একটা ব্যাঙাচিও সেই ফাঁদে ধরা পড়তো। আর বাড়ি ফিরে তো অনিবার্যভাবে অবশ্যই আম্মার ভর্ৎসনার সম্মুখীন হ’তাম। তারপরই ছিল ধুন্দলের খোসায় সাবান মেখে আপাদমস্তক ঘষে ঘষে পরিষ্কার করা।

এর পরে আরেকটু বড় হয়ে গান, গজল, হামদ, না’ত ইত্যাদি সুরেলা পরিবেশনার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকলাম। তখন তো এখনকার মত গান শোনার উপকরণ মানুষের ঘরে ঘরে ছিল না। ঠিক বলতে গেলে কিছুই ছিল না। টিভি এসেছে ১৯৬৫ সালে, কিন্তু আমি এখানে তারও কয়েক বছর আগের কথা বলছি। ঘরে অবশ্য রেডিও একটা ছিল, কিন্তু সেটা ছিল বড় ভাইবোনদের দখলে। শুধুমাত্র দুপুরে প্রচারিত ‘আকাশবাণী কোলকাতা’ এর ‘অনুরোধের আসর’ এবং রাতের বেলা বেতারে প্রচারিত নাটকগুলো সবাই মিলে একসাথে বসে শুনতাম। ফলে, গান শোনার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। বড়রা কাজে/ক্লাসে চলে যাবার পর রেডিওটা কিছু সময়ের জন্য আমার দখলে আসতো; কেবলমাত্র তখনই কিছু গান শোনার সুযোগ পেতাম, তাও যদি গান প্রচারের সময়সূচীর সাথে দখলদারিত্বের সময়টা মিলে যেত। সেইকাল থেকেই অবশ্য গানের সাথে সাথে খবর শোনার তীব্র নেশাটাও আমাকে পেয়ে বসে।

শহরে জন্ম এবং শৈশব থেকে শহরে বেড়ে ওঠার কারণে শহুরে জীবন যাপনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু সাংবাৎসরিক অন্ততঃ একবার করে গ্রামে মাসখানেক করে সময় কাটানোর ফলে গ্রামীন সংস্কৃতির সাথেও পরিচিত ছিলাম। ট্রেনে করে গ্রামে যাতায়াতের সময়ের দুটো স্মৃতি স্মরণ করে আজও মনে মনে মুগ্ধ হই। প্রথমটা হলো ট্রেনে দোতারা বাজিয়ে দরিদ্র কিছু মানুষের গান গেয়ে যাওয়া। তারা মন ও কণ্ঠের দরদ মিশিয়ে একমনে গেয়ে যেত। ট্রেনটা কোন স্টেশনে এসে থামলে তারা নীরবে নেমে যেত; নামার আগে কদাচিৎ ভিক্ষা চাইতো। মুগ্ধ শ্রোতাদের কেউ কেউ এমনিতেই সিকিটা, আধুলিটা তাদের হাতে তুলে দিত। যমুনার এপারের এবং ওপারের গানের মধ্যে আবেগ, ভাষা ও সুরে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। এপারের একটি কমন গযল ছিল “দ্বীনের নবী মোস্তফায়, রাস্তা দিয়া হাইটা যায়, হরিণ একটা বান্ধা ছিল গাছেরই তলায় গো ….”। ওপারের জনপদের মূল গান ছিল ভাওয়াইয়া ও বাউল গান। বেশিরভাগ ভাওয়াইয়া গানে নারী হৃদয়ের বিরহ বেদনার আকুল আকুতি ব্যক্ত হতো এবং সেগুলো খুব মর্মস্পর্শী ছিল।

অপর স্মৃতিটি হচ্ছে উপরে ফুটো করা একটা টিনের ডিব্বা (দানবাক্স) হাতে লম্বা শ্মশ্রুধারী ‘হুজুর’দের সুরেলা কণ্ঠে তিলাওয়াত করা পবিত্র ক্বোরআনের আয়াত এবং নবী করিম (সঃ) এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করে গাওয়া না’তে রাসুল। তাদের কণ্ঠও বেশ সুরেলা হতো। ট্রেন থেকে নেমে যাবার আগে ওনারা ধর্মভীরু মানুষের স্বেচ্ছায় দানকৃত অর্থ সংগ্রহ করতেন। সাধারণতঃ অদূরবর্তী কোন এলাকার মাসজিদ কিংবা মাদ্রাসার নির্মাণ কাজে সেই অর্থ ব্যয় করা হবে বলে তারা জানাতেন। এতে দাতা মানুষদের পক্ষে যাচাই করে নেয়া সহজ হতো। তখন গ্রামের কিংবা শহরের পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন উৎসবে ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে মিলাদ পড়ানো হতো। সেসব মিলাদ মাহফিলে সুর করে “ইয়া নবী সালাম আলাইকা” না’ত ও দরুদ পাঠ করা হতো। যদি হুজুরের কণ্ঠ সঠিকভাবে সে না’ত পরিবেশন করতে পারতো, তাহলে তা খুবই মনোগ্রাহী হতো। আজকাল অবশ্য মিলাদ মাহফিলকে বি’দাত জ্ঞান করা হয়। ফলে মিলাদের প্রচলন প্রায় উঠেই গেছে। এমন কি আজকাল বহু মাসজিদের ইমাম সাহেবের ক্বিরাত পাঠ এবং মুয়াজ্জিনের আযান কর্কশ ও বেসুরো মনে হয়। যে ইমাম শুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণে এবং শ্রুতিমধুর কণ্ঠে ক্বিরাত পাঠ করেন, তার পেছনে নামায পড়তে আমি স্বাছন্দ্য বোধ করি।



মানুষ কেন সঙ্গীত ভালোবাসে

পৃথিবীতে বোধকরি এমন কোন মানবগোষ্ঠী নেই, যাদের ভাষা এবং গান নেই। "দর্শনেন্দ্রিয় ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের উপযোগী উপস্থাপিত শিল্পকলা" হিসেবে সঙ্গীত সংজ্ঞায়িত হয়েছে। অর্থাৎ যে কণ্ঠের কথা, সুর কিংবা মূর্ছনা অথবা যে শিল্পকলার অবয়ব শ্রোতাদের কানে, চোখে, মনে ও মননে প্রভাব কিংবা প্রতিক্রিয়া রেখে যায়, সেটাই সঙ্গীত। মানুষ সঙ্গীত ভালোবাসে কারণ জন্ম থেকেই তার কণ্ঠে সুর থাকে। জন্মেই সে যে কান্নাটা করে থাকে, তা সুরে সুরে করে থাকে। প্রথম শোনা থেকেই তার এ সুরটা তার জন্মদাত্রী মায়ের কানে ও মস্তিষ্কে আমৃত্যু রেজিস্টার্ড থাকে। বিলাপিনী নারীর বিলাপেও করুণ সুর থাকে। আনন্দে উল্লাসে, এমনকি মন ভারাক্রান্ত হলেও মানুষ সঙ্গীতের আশ্রয় নিতে চায়। সঙ্গীতের সুরে তার চিত্ত দোলায়িত হয়। তার মনে ইতিবাচক অনুভবের সৃষ্টি হয়, মায়া ও আবেগের ছোঁয়া লাগে।

সঙ্গীত ও প্রকৃতির সাথে মানুষের এক অদৃশ্য মেলবন্ধন রয়েছে। সেজন্য মানুষ একেক ঋতুতে একেক ধরণের সঙ্গীতের সন্ধান করে। এমনকি আবহাওয়া ভেদে একেক দিনেও একেক ধরণের গান শুনতে চায়। ঘন বর্ষার দিনে কেউ বসন্তের দিনের গান শুনতে চায় না। সঙ্গীতের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো তাকে ঘিরে মনের অগোচরে গড়ে ওঠা কিছু স্মৃতি। যেমন উপরের অনুচ্ছেদগুলোতে আমি প্রায় ছয় দশকের পুরনো কিছু স্মৃতি বিজড়িত সঙ্গীতের স্মৃতিচারণ করেছি। যেসব স্মৃতিকে মানুষ বেশি ভালোবাসে, সেসব স্মৃতি বিজড়িত সঙ্গীত মানুষ বেশি শুনতে চায়।


ঢাকা
০৫ এপ্রিল ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৯০৮
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫২
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওনাকে দেখা না গেলেও লেজটা ঠিকই দেখতে পাচ্ছি

লিখেছেন আহা রুবন, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:০১




তারা চলে গিয়েছেন। আসলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কয়েক দিন পর পর বাংলাদেশকে নতুন করে জন্ম দিতেন—নিজেদের
পশ্চাৎদেশে নিজেরাই তালি বাজিয়ে নিজেরাই নাচতেন!

সংস্কার, বিচার, ফ্যাসিস্ট নির্মূল, উঁচা বাসা-নিচা বাসা (উচ্চ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিখোঁজ সংবাদ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫২



কাজকর্ম, রোজা, ঈদ, ছুটি, গ্রামের বাড়ি - সকল কিছুর পরেও আমি মাঝে মাঝেই ব্লগ পড়ি, পড়ার মতো যা লেখা ব্লগে প্রকাশিত হচ্ছে কম বেশি পড়ি। এখন তেমন হয়তো আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রোগাক্রান্ত সাস্থ্য ব্যাবস্থাপনা

লিখেছেন মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্‌, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৪

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ কম—এটা সত্য, কিন্তু শুধু বাজেট বাড়ালেই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। বরং ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা—এই তিনটি জায়গায় শক্তিশালী সংস্কার সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। নিচে বাস্তবভিত্তিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ এর ভয় কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে?

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১২


আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি—
“ডিপ্রেশন ছিল”, “প্রেশার নিতে পারেনি”, “পারিবারিক সমস্যা ছিল”…


তারপর গল্পটা শেষ।

কিন্তু সত্যি কি এতটাই সহজ?

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ৭৭... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়েরা ,আপনার শিশুকে টিকা দিন

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১১


টিকা দান কর্মসূচী আবার শুরু হয়েছে,
মায়েরা আপনার শিশুকে কেন্দ্রে নিয়ে টিকা দিন
এবং সকল টিকা প্রদানের তথ্য সংরক্ষন করুন, যা আপনার সন্তানের
ভবিষ্যৎ জীবন যাপনে কাজে লাগবে ।



(... ...বাকিটুকু পড়ুন

×