তাঁর নাম প্রথম দেখি আশির দশকে যখন সাপ্তাহিক রোববার-এ ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছিলো। একআধ ছিলিম বই আর পত্রিকাসেবী এক কিশোরের সাধ্য ছিলো না এতো সিঁড়ি ভেঙ্গে চিলেকোঠার সেপাইয়ের কাছে প্যেঁছার। সেই চিলেকোঠায় ওঠা হলো দেড় দশক পরে। হলো মুগ্ধতার সূচনা।
ইলিয়াসের প্রতি মুগ্ধতা শ্রদ্ধায় মোড় নিলো লেখালেখিতে তাঁর নিবিড় শ্রম আর নিষ্ঠা দেখে। একজন লেখক ‘খোয়াবনামা’ লেখার জন্য এমন প্রাণপণ পরিশ্রম করেন! গবেষকের ধৈর্য আর নিষ্ঠার নমুনা দেখান। লেখার জন্য মনন, কল্পনার সাথে পর্যবেক্ষণ আর 'ঘর হতে দুই পা ফেলা'র সংস্কৃতি জুড়ে দেন। বগুড়ার প্রত্যন্ত এলাকার কাতলাহার বিলের কাছে ছুটে গেছেন বারবার। একজন গুন্টার গ্রাস যেমন লেখার জন্য দুই বছর বসবাস করেন কলিকাতায়, ভ্রমণে আসেন ঢাকায়।
চিলেকোঠাতেও অনেক শ্রমের আঁচ লেগেছে। প্রথমে খানিকটা লেখেন ১৯৬৯-এ। ১৯৭৫-এ বেশখানিটা লেখেন। ধারাবাহিকভাবে ছাপতে ছাপতে দৈনিক সংবাদ হঠাৎ ছাপা বন্ধ করে দেয়। খোয়াবনামা নিয়েও একই কাণ্ড করেছে দৈনিক জনকণ্ঠ। এরপর চিলেকোঠা ছাপা হলো সাপ্তাহিক রোববারে। বই হয়ে ছাপার সময়ও অদলবদল হয়েছে। প্রথমে নাম ছিলো ‘চিলেকোঠায়’। রোববারে ছাপার সময় নাম হয় ‘চিলেকোঠার সেপাই’। লেখক নিজেকে শ্রমসাধ্য অভিজ্ঞতায় পুড়ে পুড়ে ক্রমাগত খাঁটি করেন। নতুন অভিজ্ঞতার আঁচে আগের অলংকারটি গলিয়ে বারবার নতুন করে গড়েন। একই লেখার শিল্পের প্রয়োজনে, নতুন মাত্রাদানের জন্য বারবার লেখার শ্রমস্বীকার করেন।
কবিতা দিয়ে শিল্পযাত্রার পর ইলিয়াস শেষ অবধি নিজেকে খুঁজে পান কথাসাহিত্যে। আমাদের সৌভাগ্য, শিল্পের যে সুর তাঁর স্বভাবের ভেতরে নেই সেই অসম্ভবের পায়ে মাথাকুটে তিনি নিজের সাধ্যের অপচয় করেননি। গল্পে, উপন্যাসে ঠাসবুনন আর ডিটেলের অসাধারণ ব্যবহার এ দুই সদাবিরোধী বিষয়কে তিনি একঘাটে জল খাইয়ে ছেড়েছেন। বাস্তবকে ছেনে এনেছেন বাস্তবের মতো করে, তাই বলে সেটা হয়ে ওঠেনি বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিং।
বাংলা সাহিত্যের আরেক অসাধারণ কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকই যখন বলেন, ‘অবাক হয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্য পড়ি।’ তখন সে গদ্য পড়ে আমরাও বিস্মিত না হয়ে পারি না। একজন কর্মকার যেমন আগুনে পোড়া লোহাকে পিটিয়ে দা, কুড়াল বানান ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে, ইলিয়াসও তেমনি নানা বর্ণ,গন্ধের শ্রমনিবিড় গদ্য উপহার দেন। সেখানে কখনো কোদালের কৌশল কুড়ালের গায়ে উঁকি মারেনি ---
‘বুলার হাসি আর থামে না, স্বামীর প্রাক-বিবাহ প্রেমের গল্প শোনে আর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, খিলখিল এবং খিকখিক আওয়াজ বন্ধ হবার পরেও গোলগাল ফর্সা মুখের এ-কোনে ও-কোনে হাসির কুচি চিকচিক করে।’ ( প্রেমের গপ্পোঃ জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল )
এবং
‘শিমুলতলার বুড়ো বুড়ো চার ভাইয়ের পানজর্দা খাওয়া ও গড়গড়া টানা চার জোড়া ঠোঁটের বাঁকা হাসির কুচিতে তার নিজের চোখজোড়া খচখচ করতে পারে- এই ঝুঁকি নিয়েও শরাফত দুই বার গিয়েছিলো তাদের দাওয়াত করতে।’ ( খোয়াবনামা)
মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ ছাড়াও পুরনো ঢাকা আর উত্তরবঙ্গের বগুড়া অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস। বাস্তবতার দাবী মেনে সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাতে সহজেই টের পাওয়া যায় কারিগরের দারুন নৈপুণ্য আর নিবিড় শ্রমের ওম ---
ক) ঢাকার আঞ্চলিক
‘বিয়ানে গেছিলাম তো। বুবুর কতা কইতে দেয় না, কী করুম ? হাফিজুদ্দি ভাইজানরে অরা হাবিজাবি কি কইছে; মায়ে কয় তাবিজ করছে।’ (কীটনাশকের কীর্তিঃ দোজখের ওম )
খ) পুরনো ঢাকার আঞ্চলিক
‘কালাকুলা হইব ক্যালায় ? মোমের লাহান পিছলা মুখ, টোকা দিলে রক্ত বারাইবো।’ (জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জালঃ জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল )
গ) বগুড়ার আঞ্চলিক
‘ত্যাল লিবু ? খাড়া। ওটি থাক। বেজাতের মানষেক হামরাও ঘরোত ঢুকবার দেই না।’ ( খোয়াবনামা )
জীবন ও বাস্তবতার খাতিরে ইলিয়াসের ভাষা হয়ে ওঠে চাঁছাছোলা, দুঃসাহসী। মধ্যবিত্ত রুচির মাপকাঠিতে যা মনে হবে অশালীন ---
‘ইস্টুডেন হালারা কি করবো তুমি জানো না, না ? কেলাব থাইকা, হোটেল থাইকা সাহেবরা বারাইবো মাল টাইনা, অরা হেই গাড়ীগুলা ধইরা মালপানি কামায়, মাগীউগি পছন্দ হইলে ময়দানের মইদ্যে লইয়া হেইগুলারে লাগায়।’ ( উৎসবঃ অন্য ঘরে অন্য স্বর )
ইতিহাস-ভূগোল খুঁড়ে খুঁড়ে, বাস্তবতার অলিতে গলিতে পা রেখে চিলেকোঠা, ভাঁড়ার ঘর, ঘুপচি কিংবা অবচেতনে মুখলুকানো জীবনকে হাত ধরে আলোয় নিয়ে আসেন ইলিয়াস। বিশ্বাসে মার্কসবাদী ইলিয়াসের আরাধ্য শ্রমজীবী মানুষ। মানুষ সেখানে ‘ব্যক্তি’। ব্যক্তির সঙ্কট এবং সম্ভাবনা, সাহস এবং অসহায়ত্ব, ভালোত্ব এবং ভণ্ডামি, অবদমন এবং ইচ্ছাপূরণ, স্বপ্নভঙ্গ এবং স্বপ্নবুনন সবই তাঁর কাছে বিবেচ্য। আবার নিজের অধিকারের সীমানা সম্পর্কেও তিনি সচেতন। তাই চাকমাদের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস চান চাকমা লেখকদের কাছে। তিনি চাইলে যে চাকমাদের নিয়ে উত্তম উপন্যাস লিখতে পারতেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
ইলিয়াস সবাইকে হতবাক করেন ঘটনা বা ব্যক্তির বিশ্লেষণে দৃষ্টিভঙ্গীর নির্মোহতা আর সার্বিকতা দিয়ে। বিশ্বাসে নাস্তিকতার সূতোছোঁয়া পাঁড় অসাম্প্রদায়িক ইলিয়াস ‘বাঙালী মুসলমান’-এর বাস্তব অস্তিত্ব অস্বীকার করেন না। বিষয়টি তাঁর চোখে ধর্মের ব্যাপার নয়। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ স্থাপনের মাধ্যমে যে আলোকপ্রাপ্ত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছিলো, মুসলমানদের বেলায় তা শুরু হয় ১৯২৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার পর। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশে যা পরষ্পরকে একশ’ বছর আগুপিছু করে দিয়েছে। এ ব্যবধান শুধু একটি শতাব্দীর নয়, আলাদা identity’রও। তাই বলে ইলিয়াস দ্বি-জাতি তত্ত্ব বা দেশভাগে সায় দেন না।
গান্ধিজীকে ইলিয়াস শ্রদ্ধা করেন এবং মনে করেন, ‘মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি পৃথিবীর সর্বকালের এক বিরল ব্যক্তিত্ব।’ সেসাথে গান্ধিজীর যে বিশ্বাস বা কাজের সাথে তিনি একমত নন সেটাও নির্দ্বিধায় বলে দেন - ‘অহিংসা একটি রাজনৈতিক মতবাদ বা দার্শনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। ... দক্ষিণ আফ্রিকার জীবনে গান্ধি সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সরাসরি সেবা করতে উৎসাহী ছিলেন এবং তাদের হিংসাত্মক কার্যকলাপে সাহায্য করতেও তাঁর বাধেনি। ... জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি বর্জন করেন। কাইজার-এ-হিন্দ উপাধিটি কিন্তু গান্ধি তখনও আঁকড়ে ছিলেন এবং ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় সরকারি উপাধি বর্জনের জন্য কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে পর্যন্ত এটাকে তিনি সগৌরবে বহন করে গেছেন। ... It takes a great deal of money to keep Bapu in poverty- কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডুর এই উক্তিতে গান্ধির সৌখিন দারিদ্র্য চর্চার স্বরূপ ধরা পড়ে।’ ( সায়েবদের গান্ধিঃ সংস্কৃতির ভাঙা সেতু )
ইলিয়াস কখনো তাড়াহুড়া করে ফাঁকাগুলী করেননি। যা নিয়ে লিখবেন তার ওপর পুরো প্রস্তুতি নিয়ে দেখেশুনে বুকে নিশানা করে গুলী ছুঁড়েছেন এবং নির্ভুল লক্ষ্য ভেদ করেছেন। তাই লেখায় কোন ফাঁক থাকেনি। অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠেনি কোনোকিছু। বক্তব্যও থেকেছে সুস্পষ্ট। তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই অঙ্গীকারাবদ্ধ। শোষণ, ভণ্ডামি, কূপমণ্ডুকতা, সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি এসব কিছুর জাতশত্রু। ইলিয়াস শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্নপূরণ আর বিজয়ের খোয়াব দেখতেন। সে খোয়াবের রোশনীতে চিকচিক করতো তাঁর তীক্ষ্ম শাণিত চোখ। তেমনি শাণিত ছিলো তাঁর ব্যক্তিত্ব আর নীতিবোধ। চরম সঙ্কটেও আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ পকেটে ভরেননি। নত হননি। নিজের বিশ্বাসে স্থির ইলিয়াস শিল্পরীতি বা বোধে কখনো বৃত্তাবদ্ধ হননি। নিরন্তর বদলেছেন। নিজেকে প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত রেখেছেন। ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করেছেন নিবিড় শ্রমে।
চিরবঞ্চিত মানুষের জীবনের দুঃসাহসী রূপকার মহাশ্বেতা দেবী যখন বলেন,‘ইলিয়াস-এর পায়ের নখেরতূল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।’ তখন আমাদেরকে নির্দ্বিধায় কবুল করতে হয় ইলিয়াসের প্রশংসা করার যোগ্যও আমরা নই। শুধু অনেক সাহস করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০১৬ রাত ১১:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



