somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অনতিক্রম এক দূরত্ব

২৩ শে আগস্ট, ২০০৬ রাত ২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


1988 সালের আগষ্ট মাস। দুই সপ্তাহের জন্য একটা প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে একটা টিমের সঙ্গে সিঙ্গাপুর এসেছি। টিমের সবাই অরচার্ড হোটেলে উঠেছি। আমি ও সহকমর্ী কালাম এক রুমে। প্রশিক্ষণ, বেড়ানো, কেনাকাটা সব মিলিয়ে ভালই কেটে যাচ্ছিল ব্যস্তবহুল দিনগুলো। সিঙ্গাপুর এমনিতেই আমার প্রিয় শহর। অত্যন্ত নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন এই শহরে আমি আগেও এসেছি একবার। প্রথমবার এসেই এই শহর দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। রাত দুটোর সময় আমি ফুটপাতে হেঁটেছি কোন রকম ভয়ভীতি ও আতঙ্ক ছাড়া। চাঙ্গি এয়ারপোর্ট, সেন্তোসা আইল্যান্ড, জুরাং পার্ক, জু্যলোজিকাল গার্ডেন এবং বর্ণাঢ্য সব শপিং মল দেখে মনে হয়েছিল এগুলো সিঙ্গাপুরের প্রাণ। পর্যটকদের আকর্ষণের মূল উৎস।

আমার প্রশিক্ষণ শেষ হতে তখনও দিন কয়েক বাকি। আমার স্ত্রী পুত্র তখন ঢাকায়, মগবাজারে। আকষ্মিক ঢাকা থেকে আমার স্ত্রী'র একটা ফোন কল আসে। রাজশাহী থেকে পাওয়া একটা ফোন কলের মাধ্যমে পাওয়া খবরের সূত্র ধরে আমার স্ত্রী আমাকে জানায় আব্বা নাকি ভীষণ অসুস্থ। তাঁকে রাজশাহীর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মাইল্ড স্ট্রোক। খবরটা শুনে আমার মনে অমঙ্গলের কালো ছায়া নেমে এলো। আমি সমস্ত অন্তর দিয়ে বাবার সুস্থতা কামনা করছি। আল্লাহত্দ কাছে তখন আমার একটাই চাওয়া আমি যেন খুব শীঘ্র এবং নিরাপদে রাজশাহী ফিরে যেতে পারি এবং আমার বাবাকে যেন সম্পূর্ণ সুস্থ দেখতে পাই।

1983 সালে আব্বা যখন হজ্বে যান তখন তাঁর বয়স ছিল 65 বছর। সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে ভেবে মানসিক ও শারীরিক ভাবে ঐ সময় তিনি খুব দুর্বল ছিলেন। সেই দুর্বল শরীর নিয়ে আব্বা হজ্বে গেলেন। বাড়ীর সকলে আব্বাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি যখন হজ্ব থেকে ফিরলেন তখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। এরপর আর কখনও তাঁকে বড় ধরণের অসুখে ভুগতে দেখিনি।

আব্বার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমার প্রশিক্ষণ লাটে উঠলো। আমার সহকমর্ীরা সবাই আমার দেশে ফেরার ব্যাপারে সহযোগিতা করলো। আমার যাবতীয় ফরম্যালিটিজ একদিনের মধ্যেই শেষ করে ফেললাম। লাগেজ গোছানো থেকে শুরু করে দরকারি কিছু ঔষধপত্র এবং বাচ্চাদের জন্য সামান্য কিছু কেনাকাটা সব কিছুই রাতের মধ্যেই শেষ করে ফেললাম। দেশে ফেরার সকল প্রস্তুতি সমাপ্ত।

আমার আসা যাওয়ার টিকেট ছিল সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সের। এয়ার লাইন্স অফিসে যেয়ে রিটার্ণ টিকেটের তারিখ পরিবর্তন করলাম। বাবার অসুস্থতার কথা খুলে বলাতেই বুকিং ম্যানেজার পরের দিন সকালের ফাইটের একটা সিট কনফার্ম করে দিলো। 23শে আগষ্ট, সিঙ্গাপুর সময় সকাল 8.00 টায় আমার ফাইট। নানা রকম দুশ্চিন্তায় সারারাত কিছুতেই ঘুমাতে পারলাম না।

ভোর 6.00 টার মধ্যেই হোটেল থেকে চেক আউট করে ট্যাঙ্েিত উঠলাম। এয়ারপোর্ট মাত্র বিশ কিলোমিটারের রাস্তা তবুও মনে হলো অনেক দূর। মনে মনে ভাবছিলাম সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে রাজশাহী যেন গ্রহ থেকে গ্রহান্তরের কোন পথ পাড়ি দিতে যাচ্ছি। বাবা আর সন্তানের মধ্যে এতো দূরত্ব আর কখনও কোনদিন মনে হয়নি।

দুপুরের মধ্যেই ঢাকা পেঁৗছে গেলাম। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা মগবাজারের বাসায়। বাসায় এসে দেখি আমার স্ত্রী ছেলেদের নিয়ে রাজশাহী যাবার সকল প্রস্তুতি সস্পন্ন করে রেখেছে। শুধু আমার আসার অপো। মেজ মামা নারিন্দা থেকে আরও আত্মীয় স্বজন নিয়ে রাজশাহী যাবার সকল প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন। চট্টগ্রাম থেকে আমার চাচাতো ভাই রাজা যাকে আব্বা ছোট বেলা থেকে মানুষ করেছেন সে'ও ভাবি সন্তানসহ এসে হাজির। সেও নারিন্দায় মামাদের ওখানে অপো করছে। মেজ মামা আমাকে ফোনে জানালেন সোজা গাবতলি চলে যেতে। ওখানে বিউটি সিনেমা হলের সামনে একটা মিনিবাস ভাড়া করে রাখা আছে। আমরা সবাই ওই মিনিবাস নিয়ে একসাথে রাজশাহী যাব।

সবাই সময় মত গাবতলি পেঁৗছে গেলাম। বেলা দুটোর সময় বাস ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বাসে আমরা সব আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে মোট 17 জন। মাঝখানে আরিচা ঘাটে ফেরীর জন্য অপো। ফেরী পাড় হবার পর আবার নগরবাড়ী থেকে যাত্রা শুরু। যতই রাজশাহী শহর কাছে আসছে ততই মনে দারুণ উৎকণ্ঠা আর অজানা আশঙ্কা ঘিরে ধবছে। বাসে সবার মন খারাপ। কেউ কেউ কাঁদছে রীতিমত। আমি সবাইকে সান্তনা দিয়ে যাচ্ছি। কান্নার কী আছে বলে। আল্লাহর রহমতে সব ঠিক আছে, এই বলে যাচ্ছি আর নিজের মনকেই সান্তনা দিয়ে যাচ্ছি। হায়াত মউত সব আল্লাহর হাতে।

রাত প্রায় 11টার সময় আমরা যখন বাসার মুখে গলির সামনে বাস থামালাম তখন সব শেষ। বাসার ভেতর থেকে কান্নার রোল শুনতে পাচ্ছি। এক নিমিষেই সবার মুখে মেঘের কালো ছায়া। চোখে নেমে এলো বর্ষার ঢল। সবাই একনাগাড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কাউকেই থামাতে পারলাম না। কাউকেই সান্তনা দিতে পারলাম না। আর আমি নিজেই পাথর। চোখে একবিন্দু পানি নেই। মুখে কোন হাহাকার নেই। সবাই দ্রুত বাস থেকে নেমে বাসায় ছুটে গেল। বাসায় প্রবেশ করে দেখি আমার বাবা আর বেঁচে নেই। সকালেই মারা গেছেন। একটা খাটে চিরনিদ্রায় শায়িত। সবাই কান্নাকাটি করবে বলে কাউকে জানানো হয়নি। তাঁকে শেষ দেখাটা দেখতে পেলাম সেটাই আমার কাছে বিরাট পাওয়া। তার মুখের শেষ কথা আমি শুনতে পাইনি। আর কোনদিনও শুনতে পাবো না ভেবে বুকের মধ্যে প্রচন্ড একটা কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠলো।

একটা দিনের মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে রাজশাহী সকল দুরত্ব অতিক্রম করে এসেও বাবার শেষ কথাটি শুনতে পেলাম না। তাঁকে চোখ বন্ধ শায়িত অবস্থায় চোখের দেখা দেখলাম ঠিকই কিন্তু তাঁর চোখের চাওয়ার শেষ আকুতিটুকু দেখতে পেলাম না। হায়রে দূরত্ব ! এক বাবা আর সন্তানের মাঝে কত বিস্তর দূরত্ব । স্থানিক সব দূরত্ব অতিক্রম করেও চাওয়া পাওয়ার এই সামান্যতম দূরত্ব টুকু রেখেই উনি চলে গেলেন। যে দূরত্ব কোন রকেট বা স্পেসশিপ দিয়েও অতিক্রম করা সম্ভব নয়।


এই লেখাটা আজকের দিনে আমার শ্রদ্ধেয় পিতাকে উৎসর্গ করলাম
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:০০

আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?



বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×