আমি ভোজনরসিক বিধায় সময়ে অসময়ে একটু বেশী খেয়ে মহা ফাপড়ে পরি। কোথাও কোন দাওয়াত পেলে, মানে বিয়া-সাদী, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা নিজের বাসায় একটু ভাল রান্নাবান্না হলে অথবা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ কারো অতি মেহমানদারির জ্বালায় মাত্রারিক্ত ভোজন করে অনেকসময় বেকায়দা অবস্থায় পরতে হয় বৈকী। খাওয়া শেষে চলনে-বলনে-শয়নে কেমন যেন অস্বস্তিবোধ করি। কিছু বলতেও পারিনা আবার সইতেও পারিনা।
হঠাৎ তেমনি একদিন রাতের দাওয়াত খেয়ে বাড়ি ফিরলাম। খাওয়া শেষে বেশ অস্বস্তি লাগছিল। কাউকে বলার মতো তেমন কিছু না। জামা কাপড় পাল্টিয়ে ব্লগ খুলে বসলাম। হঠাৎ দেখি হিমুর একটা পোষ্ট। সম্ভবত কঙ্কাল নিয়ে লেখা। বেশ মনোযোগ সহকারে পড়তে লাগলাম। পড়তে যেয়ে হাসি আর থামে না। বউ ভাবলো কোন বান্ধবীর সাথে আড্ডা মারছি। সে গেল ড্রেস চেঞ্জ করতে। ফিরে এসে দেখে আমি তখনো হাসছি। হাসতে হাসতে শরীরে বেশ আরামদায়ক হাল্কা পাতলা ঝাকুনি। কিছুক্ষণ পর দেখি অস্বস্তিভাবটা আর নেই। কোথায় যেন উধাও গেল।
হিমুর লেখা পড়ে শেষ করার সাথে সাথে যেন খাবারও হজম। এরপর কোথা থেকে দাওয়াত খেয়ে ফিরলে যদি ভাল না লাগে তবে ব্লগে ঢুকি। হিমু অথবা মুখফোড়, ধূসর গোধুলী কিংবা জেবতিক আরিফ কিংবা শিমুল অথবা নাজমুল আলবাব-এর রম্যজাতীয় পোষ্টগুলো খুঁজে বের করি। এগুলো পড়লে খাবার সহজে হজম হয়। ইদানিং খাবার হজমের জন্য বা পেট ফাঁপার থেকে বাঁচার জন্য ডাবুর’এর “হজমোলা”র যেমন কাজ করে ওদের লেখাগুলোও সেই একই কাজ করে।
মনে পড়ে, ছোটবেলায় হজমের জন্য হজমীদানা খেতাম। “ম্যাকলেট বাবু” নামের এক ফেরীওয়ালা কালো হ্যাট, কালো চশমা, কালো চোস্ত পায়জামা আর কালো ঢিলা কুর্তা গায়ে সেই হজমীদানা পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতো। হাতে ধরা মাইকের মত সরু টিনের চোঙ্গা। সেই চোঙ্গায় মুখ রেখে সে চীৎকার করে বলতো, “হজমীদানা হজম করে, পেটের মামলা ডিসমিস করে; বড় পেটকে ছোট করে, পাতলা পায়খানা নষ্ট করে; গুড়া কৃমি ধংশ করে, বদ হজম থেকে রক্ষা করে”। তার ঘারের সাথে গামছায় বেঁধে ঝোলানো ছোট্ট একটা টিনের বাক্স, সেটার সামনের অংশ স্বচ্ছ কাঁচে ঢাকা।
কোন কারনে কারো পেটের অসুখ হলে বা বদহজম হলে বা পেট ফাপঁলে আমরা মজা করে সেই হজমীদানা খেতাম। সেটা ছিল দেখতে কুচকুচে কালো, খেতে ভীষণ টক। “ম্যাকলেট বাবু” র জামা কাপড়ের সাথে ছিল পারফেক্ট ম্যাচিং। একটা কাগজে সেই হজমীদানা ঢেলে তাতে এ্যাসিটিক এসিডের আরকের সাথে বিট লবন মিশিয়ে লোহার ১২ ইঞ্চি একটা শলাকা দিয়ে দিত পুড়িয়ে। তাতে আগুনের একটা ফুলকী জ্বলেই নিভে যেত। এটা ছিল এক ধরণের রাসায়নিক বিক্রিয়া। সূত্রটা হয়তো তার নিজস্ব আবিস্কার কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। সেটা কারো জানা ছিল না বা কারো জানার আগ্রহও ছিলনা।
ছেলেমেয়েদের কাছে এই যাদুর কাঠির (লোহার শলাকা) আকর্ষণটাই ছিল মস্তবড় পাওয়া। এই হজমীদানা কারো হজম বৃদ্ধিতে কাজ করুক বা নাই করুক, কারো পেট ফাঁপুক বা নাই ফাঁপুক হজমীদানা কিন্তু সকলেরই এক পুড়িয়া খাওয়া চাই। আমিও খেতাম, বাসার আরো অনেকেই খেত। পাড়ায় তার মজাদার হজমীদানা খাবার লোকের অভাব ছিল না। বর্তমান সময়ে এই নিত্য ভেজালের দাপটে সব কিছু হজম করানোর জন্য তেমন একজন “ম্যাকলেট বাবু”র বড্ডো বেশী প্রয়োজন। প্রয়োজন সেই যাদুর কাঠির ঘষামাজায় পরিশুদ্ধ লোভনীয় হজমীদানা। দীর্ঘকাল পরে আমার আবারও সেই হারিয়ে যাওয়া হজমীদানা খেতে লোভ হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



