মা আমার এই কাজে খুব উৎসাহ দিতেন আর বাবা দেখলেই বকতেন। বাবার ধারণা ছিলো মূর্তি বানানো গুনাহ'র কাজ। তিনি মনে করতেন শিল্পীরা অভাবে দিন কাটায়। এসব করলে ভবিষ্যতে না খেয়ে মরতে হবে। তার চেয়েও বেশী ভাবতেন এই শখ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে পড়ালেখা লাটে উঠবে। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী মানুষ, হিসেব কষতেন সব কিছুতেই। অর্থনৈতিক ভাবনাটা ছিল অনেক স্বচ্ছ। তাইতো অধিক সন্তান সত্ত্বেও কখনো অভাবের মুখ দেখতে হয়নি। বরং অনেক স্বচ্ছলতার মধ্যে দিয়েই দিন কেটেছে। বাবার একদম পছন্দ নয় বলেই শিল্পী হবার ইচ্ছা বা বাসনা মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে পারেনি। আমার বাবার ছিল ট্রেস ব্যবসা, সাথে লাইব্রেরী আর উন্নতমানের একটা স্টেশনারী শপ। সেই কারণেই ছোট বেলাতেই শ্যাবল্ হেয়ারের তুলি, জলরঙ, তেলরঙ, রঙ পেন্সিল, ক্রেয়ন স্টিক, চারকোল, ড্রইং ইংক কোনকিছুর অভাব ছিলনা। চাইলেই পেতাম। স্কুলে ছবি আঁকায় পুরস্কার পেয়েছি অনেকবার। বাবা খুশী হয়েছিলেন। আমার এক স্কুল শিক্ষক "কালাচাঁন" স্যার বাবাকে ডেকে বলেছিলেন- "আপনার ছেলে যা করতে চায় করুক, ওকে কোন কিছুতে বাঁধা দেবেননা। ওর ভবিষ্যত ভাল, আপনি কখনো একে নিয়ে চিন্তা করবেননা"। স্যারের কথা বাবা রেখেছিলেন। আঁকার অভ্যাসটা অনেকদিন পর্যন্ত ছিল। আজ বহুকাল সেই অভ্যাস নেই। এখন আর তেমন আঁকতে মন চায়না। পারিওনা আগের মতো।
ছবি আঁকার যাবতীয় কৌশল রপ্ত করেছিলাম ছোটবেলায়। আমার শৈশব কেটেছে নানীর বাড়ি, পুরোন ঢাকায়। অলিতে গলিতে তখন রিক্সার কারখানা। রিক্সার পেছনে নানা ধরণের ছবি আঁকা হতো। এছাড়া সাইনবোর্ডের দোকান, ক্যানভাস সিনেমার নানা দৃশ্য ও নায়ক নায়িকাদের ছবি আঁকানোর খুপরি ঘর। ঐ সব ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঐ সব ছবি আঁকা দেখতাম। ছোট বড় বিভিন্ন বয়েসের শিল্পীরা (?) কেমন মনযোগ সহকারে ক্যানভাসে একের পর এক ছবি এঁকে যাচ্ছে। রং আর তুলির কী নিখুঁত টানের পর টান। ক্যানভাসের গায়ে সিনেমার এক একজন পরিচিত নায়ক-নায়িকাদের বিভিন্ন পোজের ছবি। রঙের ছোঁয়ায় যেন এক একটা জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। অবাক হয়ে দেখতাম আর ভাবতাম কেমন করে যেন গ্রাফ টেনে টেনে হুবহু এক একটা মানুষের প্রতিকৃতি এঁকে যাচ্ছে অনায়াসে। কোথাও এতটুকু অমিল নেই। আমার কাছে ওরাই তখন নামকরা চিত্রশিল্পী। সুযোগ পেলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেলে এরাই হয়তো এক একজন ভ্যান গগ, দ্যা ভিঞ্চি, মাইকেল এ্যাঞ্জেলো, এস এম সুলতান, জয়নাল আবেদীন হতে পারতো। আমার কাছে তখন ওগুলোই ছিল বিখ্যাত সব শিল্পকর্মের এক একটি নমুনা।
ছবি আঁকার ব্যপারে ওদের সেই সহজ ও সনাতন পদ্ধতি রপ্ত করা ছাড়া নতুন করে আমি কিছুই শিখিনি। কোন প্রতিষ্ঠান বা শিল্পীর কাছে চিত্রকলার কোন নিয়ম কানুন রপ্ত করিনি। মোট কথা ছবি আঁকার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমার নেই। অথচ ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরে ছবি আঁকার আগ্রহটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। প্রথমদিকে কোন ছবি দেখে ভাল লাগলেই সেটাকে নকল করার চেষ্টা এবং আঁকার পর সবাইকে দেখানো, সেটা কেমন হলো! আসলের মতো হয়েছে কিনা! ফলে নিজে নিজেই ছবি আঁকার হাত কিছুটা পাকিয়ে ফেললাম। আর এই ছবি আঁকার অভ্যাস থাকার কারণেই প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশে এবং এ্যাসাইনমেন্টে কোন ছবি আঁকার বিষয় থাকলে কেউ আমার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারতো না। অনার্সে ভুগোলের প্রাকটিক্যালে আমার রেকর্ড মার্ক ছিল।
পোট্রেট আঁকার সখ আমার ছোটবেলা থেকই। আর সেগুলো আঁকতাম ছবি বা ফটোগ্রাফ দেখে। দিনের পর দিন আমি অনুরোধে, উপরোধে বিভিন্ন মানুষ ও আত্মীয়স্বজনের অনেক প্রতিকৃতি এঁকেছি। কোন পয়সার বিনিময়ে নয়। নিজের শখের বশে। পুরোন ঢাকার খুপরি ঘরের সেই সাইনবোর্ড আঁকার পদ্ধতি অনুসরণ করে। সেই পদ্ধতির প্রয়োগ ও কলাকৌশল ভালই রপ্ত করেছিলাম বলেই একদিন ভাল ছবি আঁকা শিখে গেলাম। রঙ ও তুলির ব্যাপারে আমার আগ্রহ তেমন ছিলনা। সাদা-কালোতে মন আটকে গেল। আর এটা সম্ভব ছিল শুধুমাত্র গ্রাফাইট পেন্সিল ব্যবহারের মাধ্যেমই। গ্রে-স্কেল সম্পর্কে বিশদ ধারণা পেয়েছি আরও পরে।
এইচ থেকে ২এইচ, ৩এইচ; বি থেকে ৬বি এইসব গ্রেডের পেন্সিল ছিল আমার ছবি আঁকার মূল মাধ্যম। জল ও তৈল রং-এ ছবি এঁকেছি কম। চারকোল (কয়লা) ব্যবহার করেছি অনেক বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকতে। পোষ্টার কালার ব্যবহার করেছি শুধুমাত্র পোষ্টার আঁকার সময় এবং ঈদকার্ড ও জন্মদিনের কার্ড বানানোর সময়। প্রতিকৃতি আঁকতে আমি ছবি ব্যবহার করতাম। পাসপোর্ট কিংবা বি২ আকারের যে কোন ছবি। ফুল ফিগার ছবিও এঁকেছি। ছবির উপর পেন্সিলের হালকা দাগ টেনে বর্গ বা গ্রাফ এঁকে নিতাম। তারপর ড্রইং পেপার বা সাদা সীটের উপর একইভাবে পেন্সিলের হাল্কা দাগ টেনে হুবহু ঐ ছবির গ্রাফের আনুপাতিক হারে বড় মাপের গ্রাফ এঁকে নিতাম। তারপর ছবির বিভিন্ন উপকরণের প্রতিফলণ ঘটাতাম ড্রইং সিটের উপর পেনসিলের হালকা-গাঢ় শেড-এর মাধ্যমে। ছবি হতো সম্পূর্ণ সাদা-কালো।
এভাবেই শুরু। শুরুটা বেশীদূর পর্যন্ত এগোয়নি। কারণ ছবি আকাঁর চাইতে অন্যকিছু করার তাগিদটা জীবনে বেশী প্রয়োজন ছিল। যে কোন কারণেই হোক আমি কখনো শিল্পী হতে চাইনি। হবার কোন চেষ্টাও করিনি। শিল্পী হবার বাসনা আমার মনে কখনও জাগেনি। শিল্পী হতে গেলে যে আবেগ লাগে, একাগ্রতা লাগে, শিল্পীসুলভ মন লাগে, কল্পনাশক্তি লাগে, অনুভূতি লাগে, দূরদৃষ্টি লাগে এবং সর্বোপরি যেমন দেখার চোখ ও হাতের ছোঁয়া লাগে তা আমার ছিল না। ছবি আঁকতে পারা আর শিল্পী হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক। মজার ব্যপার হলো আমার আঁকা প্রতিকৃতি দেখে সবাই প্রশংসা করতো- বলতো আরে এতো দেখছি হুবহু ফটোগ্রাফ। তার কারণ ছবি নকল করার দক্ষতা ও ক্ষমতা দুটোই ভালভাবে রপ্ত করেছিলাম। সেই অর্জন ধরে রাখতে পারিনি। কলেজ জীবনেই তার ক্রমাবনতি। এক সময় পরিসমাপ্তি। নকল করে যুৎসই ছবি আকাঁ সম্ভব হলেও শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। সবাই শিল্পী হতে পারেনা। আমিও পারিনি।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


