এক
ডায়েরিতে লিখছি আমি। আমাদের দক্ষিণের রুমটায়। সকালের হলদে আলোয় মাখামাখি হয়ে আছে ছোট্ট টেবিলটা। মৃদুমন্দ হাওয়া, জানালার পাশের গাছটা দুলছে- সূর্যের গান শুনছে যেন.. ও আচ্ছা, ডায়েরিতে কি লিখছি সেটা বলি। আমি লিখি না তেমন। আজকে লিখছি। স্কুল নেই আজ। এজন্যই এসব হিজিবিজি লিখছি। স্কুল খোলা থাকলে ক্রিকেট খেলতাম এই সময়ে। ছোট বাউন্ডারির মাঠে খেলে বীরত্ব দেখাতাম।
ক্লাসেও খারাপ কাটে না। শুধু মাঝে মধ্যে বেশি পাকনামি করতে গিয়ে স্যারদের ‘বেতের ছোঁয়া’ সহ্য করা ছাড়া আর তেমন ঝামেলা হয় না। তারপর আস্তে আস্তে রোদ পড়ে আসে, ছায়াগুলো দীর্ঘ হতে থাকে। আমি ক্লান্ত শরীরে বটতলার পাশের রাস্তাটা ধরে বাড়ি ফিরে আসি। মাথার ওপর বিশাল নীল আকাশ। রাস্তার ইঁটের খোয়াগুলো বেরিয়ে এসেছে জায়গায় জায়গায়। বাতাসে ধানের পাতাগুলো দুলছে- ধ্যানমগ্ন হুজুরের মত।
আমি ভাবি ভালোবাসার কথা। ভালোবাসা কি? একটা সুন্দর মুখ। কড়া চোখের মাঝে ঝিলিক দেয়া মিষ্টি হাসি। আর রাতের বেলা স্বপ্নডানায় ভেসে ঘুরতে আসা এক মায়াবিনী। আর কিছু না। শুধু শুধু এত এত কবিতা-উপন্যাস-গল্প। আমি সেই উদার পৃথিবীতে সুদূর দিগন্তে প্রথম জীবনের মিষ্টি অনুভূতির ছবি আঁকতে আঁকতে ফিরে চলি। বাড়ি এসে ঘড়ি দেখি। ৪টা বেজে ২৩ মিনিট। ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ দিয়ে রাখি। ২৩ জুন, ২০০৭।
দুই
একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছি। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। ঘুমালেই এমন হয়। রুমটা অন্ধকার। দিন কি রাত বোঝা যায় না। ঘড়ি দেখলাম। ১০ টা। সকাল বেলা। বাইরে যাব? বুঝতে পারছি না। রাস্তায় গেলেই গাড়ির আওয়াজ, ধূলাবালি.. এই বয়সে এসব সহ্য হয় না।
‘বুড়ো ভাম' টাইপ মনে হচ্ছে, তাই না? আমি আসলে আগেভাগেই বুড়িয়ে গিয়েছি। তোমাদের নতুন এই পৃথিবীতে গ্রামোফোনের মতই সেকেলে হয়ে গিয়েছি আমি। আমি লিখছি। হাত কাঁপছে অল্প। একটু চা খেতে পারলে ভালো হতো। থাক, ইচ্ছে করছে না.. আচ্ছা, এসব বাজে কথা লিখে খাতা ভরিয়ে লাভ নেই। কেউ পড়ে ফেললে বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হবে।
আচ্ছা, আর কিছু যখন লেখার নেই, ভালোবাসার মানেটা বলি একটু। বয়স হয়েছে, এই অজুহাতে কিছু গম্ভীর দর্শন ঝাড়ি। ভালোবাসা শুধুই সুন্দর মুখচ্ছবি নয়, এটা একটা অনুভূতি- প্রগাঢ় অনুভূতি। কাউকে বুঝতে চাওয়ার নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা। এটা শুধুই স্বপ্নে আসা মায়াবিনী নয়, বাস্তবের রূদ্ররূপের মধ্যে এক পশলা দখিন হাওয়া, স্বপ্নের জাল ছিন্ন করে সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার উদগ্র বাসনা। আর সবশেষে ব্যর্থ মনোরথে বিষন্ন জগতে আবারও ফিরে আসা.. হয়েছে, আর ফিলোসফি না ঝাড়ি। চা খেয়ে আসি বাইরে থেকে। আর লিখব না ডায়েরিতে। তারিখটা দিয়ে রাখি। ১৩ ডিসেম্বর, ২০৩৭।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০২১ ভোর ৪:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




