ধরে নাও, তোমার একটা লুকানো পৃথিবী আছে। ও, শর্ত হল- তোমাকে ইন্ট্রোভার্ট হতে হবে। এক্সট্রোভার্টদের আবার লুকানো ব্যাপার-স্যাপার বলে কিছু থাকতে নেই।
তো যাই হোক, তোমার লুকানো পৃথিবীটায় কি থাকতে পারে? এর আগে জেনে নিই, এর স্বরূপটা কেমন হতে পারে। এটা হতে পারে স্রেফ একটা স্বপ্নের জগত, তোমার কল্পনার জাল বুনে তৈরি করা। মাঝেমধ্যে ঘুমের ঘোরে ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’(RAM) স্টেজে আচমকা ধরা দেয়। এই ধরনের জগত অনেকটা আবছায়ার মত, গোধূলির ম্লান আলোতে দূরের আমগাছের নিচে জমে থাকা অন্ধকারের মত। চাইলেই যখন-তখন প্রবেশাধিকার নেই এই জগতে।
আবার আরেক ধরনের জগত আছে, যেটার অস্তিত্ব একটু বিতর্কিত। Many World Interpretation Theory অনুসারে একই সাথে অনেকগুলো জগত সমান্তরাল্ভাবে একই সময়ে অবস্থান করছে। মূলত টাইম ট্রাভেলের গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্সের ব্যাখ্যা দিতেই এর উৎপত্তি। এর মানে হলো, টাইম ট্রাভেল করে তুমি হয়তো তোমার আকাঙ্ক্ষিত সময়ে ফিরতে পারবে, কিন্তু আকাঙ্খিত জগতে নয়। এখান থেকেই মাল্টিভার্স ধারণার উৎপত্তি।
তোমারও হয়তো এরকম কোনও জগত থাকতে পারে, ওয়েভফাংশন কলাপ্স করলে সেখানে তুমি প্রবেশ করতে পারো। কিংবা লুসিড ড্রিমের মাধ্যমেও একবার ঢুঁ মেরে আসতে পারো সেখানে। অনেকের চোখে এটা শুধুই হ্যালুসিনেশন, কিংবা আরেকটু ভদ্রভাবে বললে- ইল্যুশন। এই জগতটা আগের জগতের মত একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়। তবে তুমি যখন একই সাথে দুই সমান্তরাল জগতের বাসিন্দা, তখন তোমার কাজটা বেশ কঠিনই বটে। এই দুইটা জগতের কোনও ডাইমেনশন যদি একই বিন্দুতে ছেদ করে, তখন তুমি দুই জগতের বাস্তবতাকে গুলিয়ে ফেলতে পার। সেটাই হয়তো এই জগতের বুদ্ধিমান মানুষদের চোখে স্কিজোফ্রেনিয়া বলে পরিচিত।
তবে আমার এই ধরনের কোনও ভয় নেই, কারণ আমি প্রথম জগতের বাসিন্দা। বুদ্ধিমানদের চোখে নির্বোধ স্বপ্নবিলাসী। আমার জগতটা আহামরি কোনও কিছু নয়। তুমি যদি কখনও আমার জগতে প্রবেশ কর, ভাববে- একটা মানুষের কল্পনার সীমারেখা এত কম হয় কি করে। এহ, কিছুই তো নেই এখানে- ভ্রূ কুঁচকে ভাববে। আসলে আমার জগতে রূপকথার জগত থেকে তুলে আনা নান্দনিক কোনও অনুভূতি কিংবা স্বপ্ন নেই। স্বাভাবিক এই দুনিয়ার মতই নির্জীব মনে হবে তোমার কাছে। তোমাকে ওটা দেখতে হবে আমার চোখ দিয়ে, অনুভব করতে হবে আমার মনোজগত দিয়ে। তখনই এক আশ্চর্য চিন্তালোকে প্রবেশ করবে তুমি, হারিয়ে যাবে আনন্দ, অবিশ্বাস আর পরম শান্তির মোহনায়।
সেখানে তুমি খুঁজে পাবে আমার শৈশবের আমগাছটা, খুঁজে পাবে শেষ বিকেলে পুকুরপারের ঘাসে জমে থাকা একগাদা বিষণ্নতা। জীবনানন্দের হিজলের বনটাও আছে এর মধ্যে। আছে ‘হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে’ বেড়ানোর উদগ্র বাসনা। আছে রবীন্দ্রনাথের ‘আজি হতে শতবর্ষ পরের কোনও এক কবির কবিতা’ পড়ার নিমন্ত্রণ। আর আছে আমাদের সামনের উঠোনটা, যেখানে শিশিরমাখা ঘাস তার সমস্ত সবুজ নিয়ে পদদলনে মথিত করার জন্য আহবান করবে তোমাকে।
তবে এর মধ্যে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত হল আমাদের পিছনের উঠোনটা, তবে শুধুই গোধূলিবেলার সময়টায়। জানো, আমি ঘুমের ঘোরে কতবার স্বপ্নে দেখেছি ওটা। সে-ও এসেছিল উঠোনটাতে একবার। এরকমই ছোট ছোট স্বপ্ন আর অনুভূতি নিয়ে আমার জগত, আমার স্মৃতিগুলো স্তূপ হয়ে আছে যেখানে। অনেক কিছুই বলে ফেলেছি। শুভ বিদায়। আর হ্যাঁ, তোমার স্বপ্নকল্পনার গহীনে যদি এমন কোনও জগত থাকে, সেটাকে নিছক ‘বিভ্রম’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে একটু উঁকি দিয়ে আসতে ভুল করো না যেন।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০২১ রাত ৮:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




