বিকেল বেলা। টঙের দোকানে বেশ ভিড়। মূলত চায়ের দোকান, কিন্তু সিগারেটের বিক্রিবাট্টাই বেশি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে দোকানের চারপাশ। আনাস চায়ের কাপটা নিল মামার কাছ থেকে, হাত কেঁপে উঠল অল্প একটু। ধোঁয়ায় কষ্ট হচ্ছে ওর, কিন্তু অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। বিকেলের সোনালি আলোয় মাখা বেঞ্চিতে এতটুকু জায়গা খুঁজে পেয়ে বসে পড়ল।
চায়ে চুমুক দিল। চিনি বেশি হয়ে গিয়েছে, লিকারটাও কড়া হয়নি। রাস্তার পাশেই দোকান। মেইন রোড না, গলির রাস্তা। রিকশার হর্ন, পুরনো মডেলের করোলা গাড়ির টায়ার ঘষটানোর শব্দ, আর মাঝে মাঝে ওর প্রায় গা ছুঁয়ে পথচারীদের দ্রুতপদে হেঁটে যাওয়া। চায়ের স্বাদ নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ নেই। ওরা হাসছে, জোরে জোরে কথা বলছে, সিগারেট ফুঁকছে- তরুণেরা আবার মুখ গোল করে রিং তৈরি করে ধোঁয়া ছাড়ছে। আনাসের স্থবির দিনগুলোতে গতিময় উচ্ছ্বাসের হাতছানি।
চা খাওয়া শেষ। গলির রাস্তা ছেড়ে ব্যস্ত মেইন রোড ধরে হাঁটছে ও। গাড়ির হর্নের শব্দ এখানে আরও তীক্ষ্ণ, রীতিমত ঝঙ্কার তুলছে কানে। ফুটপাতের একপাশে ছাউনি দিয়ে ঢাকা অনেকগুলো খুপরি। মলিন পোশাকের বাচ্চা ছেলেমেয়েরা জটলা পাকিয়েছে এখানে ওখানে, কালো চোখগুলোয় অপরিসীম শুন্যতা।
আজিমপুর মোড়ে এসে থমকে গেল। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। নীলক্ষেতের দিকে যাবে? এরপর হয়তো ওখানে থেকে সোজা ধানমন্ডি লেক? নাকি নির্দিষ্ট কোথাও না গিয়ে কাছাকাছিই হেঁটে বেড়াবে। হয়তো পলাশী হয়ে টিএসসি, তারপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ ঘাসে বসে সন্ধার আগমনের প্রতীক্ষা করবে।
পলাশীর দিকেই এগোল। ডান পাশে বিশালকায় এক আকৃতি- বুয়েটের ইসিই বিল্ডিং। সোনালী আলোয় রীতিমত জ্বলছে সাদা পাথর আর থাই গ্লাসে ঢাকা ভবনটা। ঢাবি ক্যাম্পাসে এখন সে। দু’পাশে দানবীয় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে পুরনো সব বটগাছ, শতাব্দী-প্রাচীন ডালপালা মেলে আগলে আছে যেন পিচঢালা রাস্তাটাকে।
আনাসের গতি বাড়ছে। ফুরফুরে বাতাস বইছে, ওর চুলে হালকা পরশ বুলিয়ে ছুটে যাচ্ছে উত্তরে। আনাসের জীবনে এক বর্ণিল দিন।
ফুলার রোড ধরে হাঁটার সময় কানে এলো শব্দটা। শুরু হলো মৃদু গুঞ্জনের মতো, তারপর বাড়তে বাড়তে কোলাহলে রূপ নিল। অনেক কন্ঠের সম্মিলিত চিৎকার- সেখানে আর্তনাদ-রাগ-ক্ষোভ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
আনাসের মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেল এক বরফশীতল শিহরণ। মোড় ঘুরে এসেছে বলে ওপাশে কি হছে দেখতে পাচ্ছে না সে, তবে মনে হচ্ছে শব্দটা ধীরে ধীরে ওর দিকেই এগোচ্ছে- বুকে ভর দিয়ে আসা কদাকার সরীসৃপের মতো।
মোড় ঘুরে বেরিয়ে এলো কয়েকজন লোক। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে। আনাসের পাশ দিয়ে যেন দমকা বাতাসের মতোই ছুটে গেল। সে বাতাসে ঘামের বোঁটকা গন্ধ, সেই সাথে আরেকটি আঁশটে গন্ধও ধাক্কা মারল নাকে। রক্ত। সামনে তাকাল আনাস। পিছিয়ে পড়েছে পলায়নরতদের একজন। তাল রাখতে পারছে না। হাঁটুর কাছে ক্ষত, ফোঁটায় ফোঁটায় বেরিয়ে আসা কালচে তরলের ট্রেইল সৃষ্টি করে ছুটছে প্রাণপণে। একটু পরেই দেখা গেল ধাওয়াকারীদের। কমবেশি সবার হাতেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র। ক্যাম্পাসের ধ্যানমগ্ন মৌনতার বিপরীতে বড্ড বেশি হয়েই কানে বাজল তাদের ‘রণহুংকার’।
অকস্মাৎ ছুটতে শুরু করল আনাস। ভয়ে-আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে গেছে সে। কানের পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে গরম বাতাস। পালাতে হবে ওকে। ভিসি চত্বরে এসে ডানে মোড় নিল। সামনের আহত লোকটাকে ধরে ফেলেছে ততক্ষণে। প্রায় থেমে গিয়েছে লোকটা। রক্তের স্রোত বইছে পায়ের ক্ষতটা থেকে। ওর দিকে তাকাল, দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব- কিন্তু সাহায্যের আকুতি নেই। পরিস্থিতিটা বুঝে গিয়েছে সে। আনাস পেরিয়ে এলো তাকে। একটু পরেই লোকটার আর্তচিৎকার চিরে দিল বিকেলের বাতাস। আক্রমণকারীরা নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছে তাকে। পিছন ফিরে দৃশ্যটা দেখার সাহস হলো না আনাসের।
দৌড়ানোর জন্য কখনোই ‘সুখ্যাতি’ ছিল না আনাসের। অন্তর্মুখী হিসেবে খেলাধূলা থেকে দূরে থাকাটাই নিজের ‘অবশ্য কর্তব্য’ ভেবে এসেছে চিরকাল। তার মাশুল দিতে হুচ্ছে এখন। দম ফুরিয়ে এসেছে। কমে এসেছে গতি। পা দুটো কয়েক মণ ভারি মনে হচ্ছে। ঘামে ভেজা শার্ট গায়ে সেঁটে গিয়েছে। এতটুকু বাতাসের জন্য হাহাকার করছে ফুসফুসের বায়ুথলি। দ্রুত কমে এলো দু’পক্ষের দূরত্ব।
হঠাৎ মাথার নিচের অংশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল আনাস। ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল, কঠিন পিচঢালা রাস্তাটা যেন ধেয়ে এলো। মাটিতে নিজের মুখ থুবড়ে পড়ার বিশ্রী শব্দটা কেমন বেখাপ্পা শোনাল।
চিত করানো হলো ওকে। ব্যথাটা মাথা থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আবছা ভাবে কিছু কন্ঠ কানে আসছে। ‘এই জিনিস আমদানি হলো কোত্থেকে, একে তো অপোনেন্ট টিমে দেখিনি কখনো..’, মোটা কন্ঠের একজনের বিরক্তি ঝরে পড়ল। ‘ওদের চাল বুঝবেন না ভাই, বাইরে থেকে কাকে না কাকে নিয়ে আসছে কে জানে..’, বোঝানোর চেষ্টা করল আরেকজন। ‘..বাদ দে তাইলে। এটা এখানেই পড়ে থাক। বাকিগুলোকে ধরা দরকার’।
মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল আনাসের চারপাশ। গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে আসা মিষ্টি রোদ অনুভব করল ওর মুখে। মাথার নিচ থেকে পিচকারির মতো রক্ত বেরিয়ে আসছে, অল্পক্ষণেই ছোটখাট একটা পুলের রূপ নিল। দ্রুত লোপ পাচ্ছে অনুভূতি। ও কি মারা যাচ্ছে? মৃত্যু কি এভাবেই হয়? কিন্তু ওকে যে বাঁচতে হবে। রুমটা সকালে ভালোভাবে গুছিয়ে এসেছে, কিন্তু চায়ের কাপটা ধোয়া হয়নি। ডায়েরিতেও গত কয়েকদিনের দিনলিপি লেখা হয়নি। বিশেষ করে আজকের দিনটা। এত ঘটনাবহুল দিন ওর জীবনে এই প্রথম, আর এটাই লিখতে পারবে না ও। আর.. আর কি যেন বাকি আছে.. ও হ্যাঁ, একটা গল্প লিখছিল- শেষটা বাকি এখনও। গল্পটা কি নিয়ে ছিল যেন… ঠিক মনে পড়ছে না। ঘোলাটে হয়ে আসছে চিন্তাশক্তি। তবে এটা নিশ্চিত, ভালো হয়নি লেখাটা। ভীষণ কাঁচা হাত ওর। লিখতে গেলেই বর্ণনাগুলো কেমন যেন রোবটিক টাইপ হয়ে যায়। এর আগে আরেকটা গল্প পড়ে এক বন্ধু বলেছিল, ‘তোর গল্পে প্রাণ নেই, অনুভব করার মতো কিছুই নেই’।
তীব্র যন্ত্রণায় আচ্ছন্নের মতো হয়ে আছে আনাস। চোখ দুটো বুজে আসছে। ওদিকে গাছের ছায়ায় ছায়ায় ভর করে ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যার আঁধার। আঁধার ঘনাচ্ছে ওর চোখেও, সমগ্র অস্তিত্ব ঢেকে ফেলছে।
হঠাৎ ওর মাথা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। ঝিলিক দিয়ে উঠল যেন কিছু একটা। মনে পড়ে গেছে সব। গল্পটা ওর নিজেকে নিয়েই লেখা ছিল। বন্ধুর মন্তব্যের পর ওর মনে হয়েছিল, নিজেকে নিয়ে লিখলে লেখায় প্রাণ আসবে, জীবন্ত হয়ে উঠবে সব। বিকেলের দিকে ঢাকার রাস্তায় প্রায়ই একাকী হেঁটে বেড়ায় সে। চা খায়। মানুষ দেখে। এসব নিয়েই লিখেছিল গল্পটা। গল্পের শেষে সাদাসিধে এন্ডিং না দিয়ে টুইস্ট দেয়ার চিন্তা করছিল। কিন্তু কিভাবে কি করবে, সেটা মাথায় আসেনি ওর। কত ভেবেছে, কিন্তু বিধিবাম! গল্পটাও আর শেষ করা হয়নি।
অনেক দূরে একটা দীপ্তিময় আভা। সূর্য? কিন্তু কাছিয়ে আসছে যে ওটা! একটু পরেই মর্মটা বুঝতে পারল। সময় ঘনিয়ে এসেছে ওর। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলো। দীপ্তিময় আকৃতিটা এসে স্থির হলো ওর কপালের ঠিক ওপরে। ধীরে ধীরে বুজে এলো আনাসের চোখ।
সবকিছু আঁধার হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ উপলব্ধিটা হলো ওর। ওর গল্পটা শেষ করার আর প্রয়োজন নেই। গল্পের শেষটা জেনে ফেলেছে ও। এই যে এটাই- ঠিক এই মুহূর্তটাই- ওর সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত টুইস্ট, শেষ গল্পের চূড়ান্ত এন্ডিং..

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০২১ ভোর ৪:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




