somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবি কো উন : সন্ন্যাস থেকে সংগ্রাম

২৬ শে আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৫:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন ১৯৩৩ সালের ১১ এপ্রিল এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান উত্তর জিওলা প্রদেশের কুনসান নামক এক নিসর্গভূমিতে। ১৯৪৫-এর যুদ্ধে এটি বিধ্বস্ত হয়। কোরিয়া যুদ্ধের সময় তিনি কুনসান মিডল স্কুলের ছাত্র। কোরিয়া যুদ্ধ কো উনের শারীরিক-মানসিক জগতে তীব্র প্রভাব ফেলে। এ যুদ্ধে এসিড দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার শ্রবণযন্ত্র। ১৯৭৯ সালে পুলিশ কর্তৃক প্রহারে তার শ্রবণযন্ত্রের অবস্থা হয় আরো শোচনীয়। ১৯৫২ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তিনি একজন বৌদ্ধ সন্ন্্যাসীতে পরিণত হন। প্রায় দশ বছর ধরে বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরাগী থেকে তিনি সন্ন্যাসব্রত পালন করেন। তবে ১৯৬২ সালেই এ জগৎ থেকে একরকম বিদায় নিয়ে সেক্যুলার মনোভাব নিয়ে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সক্রিয় আন্দোলনকারী হিসেবে সংগ্রামী জীবনে প্রবেশ করেন। সংগ্রামী চরিত্রের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার একজন আধুনিক কবি হিসেবেও তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। একযুগ আগে ঘটে যাওয়া যুদ্ধে শারীরিক-মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত কো উন তীব্র যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করতে যান ১৯৭০-এ, ফিরে আসেন। হতাশাকে ঝেরে ফেলে, নানা প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে তিনি জীবন ও মৃত্যুর সমীকরণ তৈরি করতে পারেন। ১৯৭২-এর পর থেকে এক দশক তার সংগ্রামী জীবনের উত্তুঙ্গ সময়। দফায় দফায় জেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে তার সংগ্রামমুখর জীবনে। ১৯৭২ সালের পর মোট চারবারের মতো তিনি জেল খেটেছেন। ১৯৮০ সালে চুং ডু হুয়ানের নেতৃত্বে 'ক্যু ডি'ট্যাট'-এর ফলে বিশ বছরের সশ্রম কারাদ-াদেশ পান তিনি। ১৯৮২-র এক সাধারণ ক্ষমায় তার দ- মওকুফ হয়। এরপর থেকে অধ্যাপনা ও লেখালেখি তার জীবনের পেশা ও নেশা। ২০০৭ সাল থেকে সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাব্যতত্ত্ব ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে তিনি নিয়োজিত আছেন। কো উন মূলত একজন কবি। কবিতা ছাড়াও উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ লেখক ও অনুবাদক হিসেবেও তিনি পরিচিত। প্রায় ১৫টি দেশে তার লেখা অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। কো উন বর্তমান এশিয়ার প্রভাবশালী লেখকদের একজন। প্রায় একযুগেরও বেশি সময় ধরে নোবেল পুরস্কারের তালিকায় নাম উঠলেও নোবেল পাওয়া হয়নি তার। যেবছর উনের-ই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মো ইয়ান নোবেল পেলেন তখনও সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার নাম অন্তর্ভূক্ত ছিল।

২০০৩ সালে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত 'কো উনের কাব্যবিশ্ব' শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য রাখেন গবেষক চো ওন-শিক। তিনি এই লেখক সম্পর্কে তার পূর্ব কথোপকথনের এক সূত্র উল্লেখ করেছেন। কো উন তাকে বলেছিলেন, 'পুনর্জন্মই মুক্তি।' কিন্তু চো উন-শিক তার এ কথায় একসময়ের বৌদ্ধমতে বিশ্বাসী কবিকে বোঝেননি। তিনি সন্ধান করছিলেন আসলে 'পুনর্জন্ম' বলতে কো উন সত্যি কী বলতে চেয়েছেন। এটা ঠিক ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সাল এই এক দশক তিনি অহিংস বুদ্ধবাদের নীতিকে গ্রহণ করেছিলেন।

চীন-জাপান ও কোরীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য এই_ তার শান্তশিষ্ট ও নিরপদ্রুপ জীবনবোধ একটি আধ্যাত্মিক পৃথিবীর সন্ধানে নিয়ে যাবে।
বৌদ্ধমতে নির্বাণ কিংবা পুনর্জন্মের ধারণাগুলো সেখানে মানুষের মানসিক গঠনের জন্য সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও বটে। পুনর্জন্ম মানুষকে দেয় সেই ধারণা যাতে পুনরাবর্তনের মধ্য দিয়ে আলো-হাওয়ার স্বাভাবিক পৃথিবীটারই একটা পুনঃপ্রাপ্তি ঘটে। কিন্তু কো উনের কাছে নির্বাণ প্রক্রিয়া যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক হলেও তা পুনর্জন্মকে ঠেকিয়ে রাখারই একটা উপায়। বস্তুত এই পুনর্জন্ম আধ্যাত্মিকতা থেকে বাস্তবতায় পদার্পণ। পক্ষান্তরে এই নির্বাণও এখন আর স্বস্তিদায়ক নয়, কারণ এটি ভৌতিক নয়; অবশ্যই বাস্তব অবস্থার দ্বারা মানুষ আক্রান্ত। এই প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থার মধ্য দিয়েই বৌদ্ধধর্মের মৌলিক নীতি থেকে সরে এলেন তিনি।
তার জন্মস্থান কুনসান ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শস্যভা-ার। ১৯৪৫ সালের যুদ্ধে তা ধ্বংস হয়ে যায়। সেই সঙ্গে কবর দিতে হয় দেশের অনেক তরুণ যোদ্ধা ও নিকট আত্মীয়কে। তিনি নিজেও শারীরিক, মানসিকভাবে হন ক্ষতিগ্রস্ত। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিভাজন একটা অস্থিরতা তৈরি করে। দুই কোরিয়াকে নিয়ে টানাহেঁচড়া, তাছাড়া রাশিয়া ও আমেরিকার সাম্রাজ্যনীতি তাকে আধ্যাত্মিক বিশ্ব থেকে বিচ্যুত করে পৃথিবীর বিদ্যমান সংকটের দিকে মনোযোগী করে। ১৯৪৫ সালেই কোরিয়ার উত্তরাংশ রাশিয়ার হাতে, দক্ষিণাংশ আমেরিকার দখলে চলে যায়। রিপাবলিকান চায়নার উৎপত্তি ঘটে ১৯৪৯ সালে। এ সময়ই তিনি বৌদ্ধধর্মের সন্ন্যাসব্রতকে গ্রহণ করেন। অবশ্য তখন কোরিয়া-যুদ্ধের মধ্যবর্তী একটা সময়। ১৯৫০_১৯৫৩ কোরিয়া যুদ্ধের মধ্যকালীন একটি সময়। এই সন্ন্্যাসব্রত অবস্থায়ই কোরীয় যুদ্ধের প্রভাব পড়ে তার লেখায়। এ সময়ের কবিতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও রয়েছে এ বিষয়টির প্রাধান্য। কোরিয়ার এ যুদ্ধ ধীরে ধীরে জনযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। জনজীবনের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির এ যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে চীন ও আমেরিকাই সেখান থেকে ফায়দা লুটতে থাকে। বিশ্ব ইতিহাস সৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল এদের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ যা পরবর্তী বিশ্বরাজনীতির পথ নির্মাণ করে। বিশ্বের তথা দেশের এমনি একটি জটিল ও নারকীয় পরিস্থিতিতে তিনি আশ্রয় খুঁজছিলেন বৌদ্ধধর্মে; কিন্তু ১৯৬২ সালেই কো উন বৌদ্ধধর্মমত থেকে সরে দাঁড়ান।
কোরীয় কবিতায় আধুনিকতার স্বর্ণালী সময়ে কো উনের সাহিত্যজগতে অংশগ্রহণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালের একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তন কোরিয়াকে পূর্বের কৃষিভিত্তিক সভ্যতা ছেড়ে যন্ত্রবিশ্বের দিকে যাত্রা করায়। পঞ্চাশের দশকের পর জাপানের ফ্যাসিবাদী আচরণ, সাম্যবাদবিরোধী প্রেসিডেন্ট সিগন্যাম রি-এর স্বৈরাচার প্রভৃতি ঘটনা রাষ্ট্রকে সংকটের মুখোমুখি করে। অন্যদিকে ষাট দশকের দিকে ছাত্রদের বিদ্রোহের ফলে 'এপ্রিল রেভ্যুলুশন'-এ সিগন্যাম রি-এর পতন ঘটে। এ-ঘটনার পর কোরীয় আধুনিক কবিতার কণ্ঠস্বরে পরিবর্তনের সুর ধ্বনিত হয়। কো উনের প্রথম দিকের কবিতায় বৌদ্ধবাদের সঙ্গে পঞ্চাশের পাশ্চাত্যবাদী সুরের আভাস মেলে। আসলে তখন কবিতার জগতে ঐতিহ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী নামক দুই ধরনের আধুনিকতা নিয়ে একটা সমন্বয় তৈরি হচ্ছিল। ঐতিহ্যবাদী আধুনিকরা রোমান্টিক অধ্যাত্মবাদের জগৎ দিয়ে প্রকৃতিজগৎকে ধরতে চাইলেন। পাশ্চাত্যপন্থীরাও এর সঙ্গে সুর মেলালেন। কো উনের পঞ্চাশের কবিতা 'ওড টু শিম-চং' পড়লে এ সমন্বয়ের ধারণাটি সামনে আসে।
১৯৭৩ সালে কো উন সেনা শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেন। এর আগে ষাটের দশক থেকেই তথাকথিত 'পিউর লিটারেচার'-এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট জিগির তোলা হয়। ৬০-এর শুদ্ধবাদী সাহিত্য আসলে ছিল জাতীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তি সম্পন্ন। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়ক সিঙম্যান রি-এর স্বার্থ হাসিলের একটি পন্থা হিসেবে এর ভূমিকা ছিল। এসব বিষয়ের বিরোধিতার ফলাফল রূপেই 'পপুলার পয়েট্রির জন্ম হতে থাকে। কিম জি হা নামক তরুণ সাহিত্যিকের ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কো উন তখন দ্বিধাহীনভাবেই এদের মতো তরুণদের গোষ্ঠীতে যোগ দেন। শিম চং-এর মতোই তিনি নিজেকে সমুদ্রে ফেলে দেন র‌্যাডিক্যাল ধরনের কবিতায়। প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের ভাবে রচিত হয় 'তীর'-এর মতো কবিতা।
কবিতাটি কোনো সাধারণ প্রচারমূলক রচনা নয়। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রুদ্ধশ্বাসপূর্ণ একটি অনুভূতি এতে সঞ্চারিত হয়েছে। কবিতাটিতে 'এসো' শব্দের প্রত্যেকটি ভাবের আর্জি ব্যক্তিমানুষের চৈতন্যে আঘাত হানে।
১৯৭৯ সালে একনায়কতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হি হত্যাকা- সংঘটিত হয়। কো উন তখন জেলে। একবছর পর ছাড়া পান। কিন্তু সেনাশাসক কর্তৃক পুনরায় কারারুদ্ধ হন। এরপর ১৯৮২ সালে চতুর্থ ও শেষবারের মতো ছাড়া পেলেন তিনি। ছাড়া পেয়ে দুই বছরের মাথায় 'মাতৃভূমির তারাগুলো' নামক কবিতার বই বের করেন। কিন্তু সেখানে পূর্বের কবিতার বীরগণের মৃত্যুশোক আর স্পষ্ট হল না। বরং তার চেয়ে শান্ত স্নিগ্ধ এক কবির ভবিষ্যৎ আশাবাদের স্বপ্ন হল অঙ্কুরিত। সেখানে যুদ্ধের দামামা ধ্বনির চেয়ে দৌড়-ঝাঁপ দিয়ে হেসেখেলে বেড়ানো শিশুদের কথা ব্যক্ত হল। 'আমি জানি/ খেলার শিশুর কলধ্বনি/ যুদ্ধের চিৎকারের চেয়ে তার গুরুত্ব বেশি/ আমি, যে চেঁচিয়েছি যুদ্ধের জন্য তারই কাছে।'
আশির দশকের কোরীয় কবিতা মৃত্যুজনিত শোকে মুহ্যমান। কোয়াংজু অভ্যুত্থানের ভুলগুলো তখন সবার দৃষ্টিতে ভাস্বর। তরুণ সম্প্রদায় প্রগতিশীল ধরনের পপুলার পয়েট্রির জগতে নিজেদেরকে যুক্ত করে। ১৯৮৭ সালে আবারো সেনাশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ফুঁসে ওঠে। অন্যদিকে নব্বইয়ের কবিতা সমাজ থেকে অনেক দূরে সরে যায়। তার পরিবর্তে নিজস্ব গ-ি ছেড়ে বার্লিন দেওয়াল পতনসহ (১৯৮৯) নানা জাতিক-আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের ছাপ পড়ে কবিতায়। ১৯৯৩ সালে কোরিয়ায় গণতান্ত্রিক সরকারের সৃষ্টি হয়। এদিকে সাহিত্য জগতে বড় বড় আখ্যানগুলো ভেঙে ছোট ছোট আখ্যানের জন্ম হতে থাকে। অন্যদিকে ছোট কবিতারও সৃষ্টি হয় অনিবার্য। কো উন তখনো অবশ্য দীর্ঘ আকারের কবিতা লেখা ছাড়েননি; কিন্তু তার কবিতার বিষয়বস্তু আগের চেয়ে পরিবর্তিত হয়। পুরাতনকে ঝেরে ফেলে নতুন দিনের আশার আলোর ঝলকানি তখন তার কবিতায়। 'আগামী দিন' নামক এক কবিতায় এমনি করে মৃত্যু ও জীর্ণতাকে পাশ কাটিয়ে নতুনকে আহ্বান করেন তিনি।
আজকের দিনের যন্ত্রণা ও জটিলতা এড়িয়ে এই সুন্দর সময়ের অপেক্ষা কো উনের তীব্র আশাবাদী মনোভাবের কথা ঘোষণা করে। তিনি এক ভাগ্যাহত বর্তমানকে গ্রহণ করতে চান যার মধ্যে আছে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। তার কাছে আগামী দিন মানে মায়ের গর্ভে থাকা অনাগত নিষ্পাপ শিশু। 'আগামী দিন' কবিতাটি বর্তমান সম্পর্কে একধরনের প্যারাডক্স তৈরি করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে সময়ের গভীর এক বোধ এ কবিতায় সঞ্চারিত।
সময় সম্পর্কে এরকম সূক্ষ্ম বোধের জন্য কো উনের কবিতা দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব ভূগোলকে পেরিয়ে গেছে। উত্তর ভ্রমণ করে দক্ষিণের সীমারেখা অতিক্রম তার পক্ষে এ কারণেই সম্ভবপর হয়েছে। অনেক আধুনিক কোরিয়ানদের লালন করা বদ্ধ জাতীয়তাবাদের হাওয়া ছেড়ে খোলা প্রান্তরে পৃথিবীর এক মহাসভায় তাই তিনি যাত্রা করতে পারেন। সকল বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকতার মেলবন্ধন সূচিত করেন। তার এই অব্যাহত যাত্রা এক মহান স্বাধীনতার বোধ তৈরি করে। আর এই বিরাট স্বাধীনতারই অপর নাম 'পুনর্জন্মে মুক্তি'। বৌদ্ধ সন্ন্যাসধর্মে ব্রতচারী একজন সাহিত্যিকের প্রথম জীবন ছেড়ে শেষ জীবনের ভাবনার ব্যবধান এর মধ্যেই সূচিত হয়। মানুষের স্বাধীনতা তথা মুক্তি নামক এক খোলা বাতায়নের সন্ধানই তাঁর কাছে নির্বাণ কিংবা পুনর্জন্ম হয়ে ওঠে।
[মে ২০০৩ সালে সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত 'কো উনের কাব্যবিশ্ব' শীর্ষক কনফারেন্সে গবেষক চোই ওন-শিক কর্তৃক পরিবেশিত রচনা থেকে এটি গৃহীত। প্রবন্ধটি কোরিয়ান ভাষা থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন চুং সোহ-ইয়ং। তার ইংরেজি অনুবাদ থেকে এটি বাংলায় ভাষান্তরিত হল।

কবি কো উনের কয়েকটি কবিতার অনুবাদ

আগামী দিন

যন্ত্রণাময় এইসব দিনের মধ্যেও
আগামী দিন আমার কাছে সৌরভময়,
আত্মার শক্তি আমি হারিয়েছি,
যেভাবে হারিয়েছিলাম
বিদায়ী দিনে
প্রতিটি দুঃখের দিনে।
তা কি সত্যি?
ঠিক কি? তাই কি?
সত্যি কি?
যদি ভালোবাসি বা ঘৃণা করি,

এবং আমার পিতৃভূমিকে
যদি আজকের জন্যও
অগণিত অতিক্রান্ত রাত্রির
তারার ঝিকিমিকি আলোর নিচে,
কাঁচের গ্লাস শূন্য করে রাখি,
অভুক্ত রাখি কিছু না দিয়েই।

আগামী দিন।
কী চমৎকার এক নাম!
আহ্! আনন্দময় গন্তব্য এক_
যদিও এখন ঝলসানো মাংসের
মতো এক স্বৈরাচারী দিন,
আজকের দিনকে আড়াল করো,
দেখো তারও বাইরে,
বাতাসে যদি শব্দ শোনো,
যুদ্ধের দামামা এড়িয়ে আগামী শিশুর।

তীর

তীরে রূপান্তরিত হয়ে
এসো একত্রে শূন্যে উঠি দেহ ও মনে!
উঠে যাই আকাশ ছিদ্র করে ওপরে
এসো উঠে যাই দেহ ও মনে।
ফেরবার বাসনা নেই
কিন্তু সেখানে মন্ত্রপূত হয়ে
বুকে নিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত স্বদেশের ক্ষত,
কখনোই নেই ফিরতে।

একটি শেষ নিঃশ্বাস! এসো সমাপ্ত করি এ ধারা
ছুড়ে ফেলে দিই ব্যবহারহীন পাঁজর
যা কিছু পেয়েছি বছরব্যাপী
যা কিছু উপভোগ করেছি বছরব্যাপী
যা কিছু জমেছে বছরব্যাপী
সুখশান্তি
যা কিছু আরো।
রূপান্তরিত হয়ে তীরে

এসো সকলে শূন্যে উঠি দেহ ও মনে।
চিৎকার করছে বাতাস! আকাশ ভেদ করে
এসো শূন্যে উঠি দেহ ও আত্মায়!
ধোঁয়াশা এই দিনে উদ্দেশ্য সামনে আসে
অবশষে যখন তা মুখ থুবড়ে পড়ে
রক্তের বন্যায়,
এসো সকলেই একবার তীরের মতো
রক্ত ঝরাই।
ফিরে আসতে নয়!
ফিরে আসতে নয়!
জয়, সাহসী তীর, আমাদের জাতীয় তীর!
অভিবাদন, যোদ্ধাদের! গতি দানকারী যত পতিত মানুষের।


ওড টু শিম চং

গভীর নীলে আচ্ছাদিত ইনদাংসু সাগর,
গর্জন করছে যেন মেঘে মেঘে আঘাত।
জানে সমুদ্রের জল, জানে সমুদ্রের নাবিকেরা
পৃথিবীর কালো দুঃখের এক অধ্যায়
অতীতে মিশে আছে যে পথ, কখনো ওঠে ভেসে
পৃথিবীতে জন্মানো শিশুর কান্নার বিলাপ,
নাবিকেরা জানে আমার কন্যার পথ।
ধরা বিনা থাকে না জলের অস্তিত্ব
শুধু ভীতি এখন এ বিশ্বের চাওয়ার উপাদান,
আমার মেয়ের কান্না পদ্মের পাপড়ির ওপর যেমন;
ভালোবাসা দিতে পারে উজ্জ্বল পৃথিবী
কিন্তু অন্ধকারে চোখ ডুবে যায়
কন্যা, এখন জলই তোমার মাতা,
জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাও,
জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাও
জলের ওপর বাষ্প যেভাবে পতিত হয়।
কন্যা আমার, এগিয়ে যাও ভ্রমণ কর পৃথিবীময়।
ইনদাংসুর উজ্জ্বল নীল, কাঁদো গভীরতায়।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০১৪ সন্ধ্যা ৭:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×