মৃত্যু - কিঙ্কর আহ্সান
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১
মৃত্যুর খবর শুনলে শুরুতে কখনই বিশ্বাস হয়না আমার।
বরং আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি মরে যাওয়া মানুষটি হুট করে কোন একদিন এসে হাজির হবে। হাজির হয়ে চমকে দেবে তার পরিবারের সবাইকে।
শোকে আচ্ছন্ন পরিবারটির প্রতিটি সদস্যের বুকে সেদিন আনন্দের বান ডাকবে। সেই সাথে থাকবে হারিয়ে যাওয়া মানুষটির হারিয়ে যাবার অপরাধের জন্যে এক চিমটি অভিমান।
কিন্তু আমার বিশ্বাস মেনে দুনিয়া চলেনা।
এই ডিসেম্বরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে খুব দ্রুত চলে গেলেন সেজ মামা। মৃতদেহ ছিলো খুলনায়।
মারা যাওয়ার দিনটিতে আমার চেয়ে বয়সে ছোট সেজ মামার ছেলেটিকে তার বাবার মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে পৈাছানোর আগ পর্য়ন্ত পুরোটা পথ অভিনয় করে যেতে হয়েছে ভাইটার সাথে। মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়বে এই ভয়ে তাকে বলা হয়েছে,‘ বাবাটা একটু বেশি অসুস্থ আজ তার। জরুরী একটা অপারেশন হবে তাই সবাই মিলে ঢাকা ছাড়ছি।’
এ ধরনের অভিনয় খুব কষ্টের। মিথ্যে বলাটা ঝামেলার। তাছাড়া অভিনয়ে পটু নই বলে অল্পকিছু সময় পার হতেই ধরা পড়ে যাই আমি।
জীবন নিষ্ঠুর। তাই বলে এতটা তা জানা ছিলোনা !
বাবা মারা যাওয়ার দু মাসের মাথায় স্ট্রোক করায় মা’টাকেও হারাল মামাত ভাইটা। মাস দুয়েকের ভেতর শোকের এতটা ধাক্কা,কান্না করাটা সহজ কাজ নয়।
যথারীতি এবারও ‘মামি মারা যায়নি। অপারেশন দরকার। অসুস্থ বেশি তাই ঢাকা ছাড়া হচ্ছে।’ এমনটা বলে অভিনয় করতে হয়েছে আমাকে। ধরাও পড়েছি দ্রুত।
মৃত্যুর খবর শুনে এবারও আমার বিশ্বাস হয়নি। আমি এই ভেবে আনন্দে আছি যে তারা শীঘ্রই ফিরে চমকে দেবেন তাদের ছোট্ট ছেলেটিকে।
স্রষ্টা, ‘তাই হোক। তাই হোক। আমার বিশ্বাস ঠিক হোক।
ঠিক ঠিক ঠিক হোক।
কাউকে যেন আমার মতন অভিনয়ও না করতে হয় আর। এমন অভিনয়ের ভেতর দিয়ে যাওয়াটা খুব কষ্টের। বড্ড যন্ত্রনার।
আমার মামাত ভাইটার মতন কষ্ট যেন না পায় আর কেউই। কেউই না।
অনুরোধটা রাখবেন স্রষ্টা। রাখবেন কিন্তুু। প্লিজ।’
প্রার্থনা করি, পৃথিবীর মা-বাবা গুলো অন্তত যেন বেঁচে থাকে কয়েকশত কোটি বছর। কয়েক হাজার কোটি বছর। কয়েক লক্ষ কোটি...।
২
বাড়ির সামনে লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান। ঠিক পাশেই কাঠের কফিন ভর্তি চা পাতি। গোসল করানো হয়েছে লাশ । কাফনের কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে শরীর। তারপর কফিনে রেখে ওপরে নিচে দেওয়া হয়েছে চায়ের পাতি। কয়েক দিনের জন্যে নিশ্চিন্ত থাকা যায় এতে। পঁচবেনা আর লাশ।
বাড়ির ভেতর সুর করে কাঁদছে আপনজনেরা। পাল্লা দিয়ে কয়েকজন করছে কুরআন তিলাওয়াত। কে যেন আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো দুটো। বোকার মতন আর একজন গোলাপ জলের ছিটে দিলো গায়। মরা বাড়িতে চুলা জ্বলবে না আজ। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো পেটে েিধ নিয়ে ঘুরতে লাগলো এদিক সেদিক। তারাও বোঝে শোকের সময় খাবারের জন্য মাকে বিরক্ত করতে নেই। বিরক্ত করতে হয়না। একটু পরেই জানাযা। বাড়ির সামনেই মাদুর পেতে করা হয়েছে নামাজের আয়োজন। গতকাল রাতেই খুড়ে রাখা হয়েছে কবর। কবরে বিছানো হয়েছে নতুন মাদুর আর কলাগাছের পাতা। আমার কাল ধর্ম পরীা। এমন সময়ে মারা গেলো কেন লোকটা ? পড়াশোনার মাঝে এসব বড্ড তেতো লাগে। ধর্ম পরীার জন্যে কষে মুখস্ত করেছি জানাযার দোয়া। ভালোই হয়েছে। নামাজের সময় আরামসে ঝেরে দেবো।
ঘরের জানালা লাগোয়া হাøাহেনার কয়েকটা ডাল পাতাসমেত চলে এসেছে ভেতরে। তীব্র ঘ্রান। মাথা ধরে যায়। ঘোর লাগে। এই এমন সময় বড্ড মরে যেতে ইচ্ছে করে। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে মৃত্যুচিন্তা। ভয় হয়। শীত লাগে। মনে হয় এই আমি নিতান্তই অসহায় একজন মানুষ। কত্ত পাপ ! মৃত্যুর কথা ভুলে গেলে চলবেনা। আমারও চলে যেতে হবে। সবাইকে চলে যেতে হয়।
ক্ষমা করো প্রভু। প্রভু ক্ষমা করো...।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
'মাহাথিরনোমিক্স'- মালয়েশিয়াকে যেভাবে নিজ পায়ে দাঁড় করালো (পর্ব - ১)

আমাদের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া গেলেন। এটা খুব ভালো এক মুভ ছিলো। সারা বিশ্বকে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু, সারা বিশ্বে মালয়েশিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অগ্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন
গোসাইপুর ১৯৭১

জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
নিউইয়র্কের ডায়েরী: ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে লং-আইল্যান্ড

আমাদের সামার ভেকেশন চলছে এখন। প্রায় তিন মাসের ছুটি। এই ছুটিতে বসে না থেকে নিউইয়র্কের একটি ন্যাশনাল ল্যাবে জয়েন করলাম ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে! গবেষণা করে যে পৃথিবীকে উদ্ধার... ...বাকিটুকু পড়ুন
কবিতাঃ মোহমায়া

খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।
ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।
হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।