somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গোলাম আজম ও ভাষা সৈনিক

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয় এটি আত্মত্যাগ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের প্রতীক। অন্যদিকে, ভাষা সৈনিক শব্দটি একটি সম্মানসূচক পরিচয়। যারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সংগ্রাম করেছিলেন। অথচ সময়ের প্রবাহে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকে ভাষা সৈনিক আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়, যার মধ্যে অন্যতম নাম গোলাম আজম। এই প্রসঙ্গে ইতিহাসভিত্তিক একটি পরিষ্কার বিভেদ রেখা টানা জরুরি।

ভাষা সৈনিকঃ সংজ্ঞা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ভাষা সৈনিক বলতে বোঝায় সেইসব ব্যক্তি যারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন—মিছিল, সংগঠন, প্রচার, গ্রেপ্তার বা আন্দোলনের নেতৃত্বে ভূমিকা রেখেছেন। এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চেতনা ছিলঃ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা, পাকিস্তানি শাসনের ভাষাগত বৈষম্যের প্রতিবাদ। এই আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হলো ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২তে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে শহীদ হওয়া। তাঁদের আত্মত্যাগ একুশকে দিয়েছে চিরন্তন মর্যাদা।

গোলাম আজমের অবস্থানঃ ঐতিহাসিক বিতর্ক
গোলাম আজম ততকালীন সময়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর মতো মৌলবাদ বিতর্কিত একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতা। ১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে তাঁর ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কিছু সূত্রে বলা হয় তিনি ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক ধারার সঙ্গে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের একটি স্পষ্ট সাংঘর্ষিক সম্পর্ক দেখা যায়।

বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সুস্পষ্ট বিতর্কিত ভূমিকা, যেখানে তিনি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, শুধু তাই নয় ততকালীন পশ্চিম পাকিস্তান গিয়ে ভাষা আন্দোলনে তার অবস্থান কে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বলে আক্ষায়িত করেন। যা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে ভাষা আন্দোলনের চেতনার বিপরীতে দাঁড় করায়। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্দোলন, আর মুক্তিযুদ্ধ ছিল সেই চেতনার পরিণত রূপ। ফলে এই ধারাবাহিকতার আলোকে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

একুশে ফেব্রুয়ারি বনাম রাজনৈতিক পরিচয়
একুশে ফেব্রুয়ারি একটি সর্বজনীন ঐতিহাসিক চেতনা। এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়। কিন্তু যখন কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ভাষা সৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে, তিনি কি আন্দোলনের মূল আদর্শের ধারক ছিলেন?
তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কি ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল? ইতিহাস বিশ্লেষণে ব্যক্তির সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ড বিবেচনা করা জরুরি। কেবল একটি সময়ের আংশিক সম্পৃক্ততা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ভাষা সৈনিক পরিচয় নির্ধারণ করলে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিভেদের মূল জায়গা
এখানে বিভেদটি মূলত তিনটি স্তরেঃ

ক. আদর্শিক বিভেদ
ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ। গোলাম আজমের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান ছিল পাকিস্তানপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার পক্ষে।

খ. ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা
১৯৫২ -১৯৬৯ -১৯৭১ এই ধারায় ভাষা আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। যিনি ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন, তাঁর অবস্থান ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

গ. নৈতিক অবস্থান
একুশ মানে আত্মত্যাগ, গণঅধিকার ও মানবিক মর্যাদা। কোনো ব্যক্তির পরবর্তী ভূমিকা যদি মানবাধিকারের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে তাঁকে একুশের প্রতীকী মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা নৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে।

ইতিহাসকে রাজনীতিমুক্ত রাখা প্রয়োজন
ইতিহাসকে ব্যক্তিপূজা বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। ভাষা সৈনিক পরিচয় একটি গৌরবময় স্বীকৃতি, যা প্রমাণ-নির্ভর ও ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। একইভাবে, একুশে ফেব্রুয়ারি একটি সর্বজনীন চেতনা এটি কোনো বিতর্কিত ব্যাক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়াল হতে পারে না। সুতরাং গোলাম আজমের ভাষা সৈনিক পরিচয় এবং একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিভেদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং দলিলভিত্তিক ইতিহাস, আদর্শিক সামঞ্জস্য ও নৈতিক মূল্যবোধকে ভিত্তি করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:১২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জোর করে যুবককে নামাজে নেওয়ার চেষ্টা কিশোরের, অতঃপর...

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২৬


বরিশালের হিজলা উপজেলার চরবিশোর গ্রামে আরিফ রাঢ়ী (১৩) নামে এক স্কুলছাত্রকে লাথি মেরে হত্যার পর মরদেহ খালে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এশার নামাজের আগে মোশারফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুক্তরাজ্যের ভিসা পাওয়া এতো কঠিন কেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:২৪

আমার বড় মেয়ে মারিয়ার সাথে আজ কথা হলো। সে যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করে। এখন ৭ম শ্রেণীতে। মারিয়ার নানাবাড়ি ইংল্যান্ডে হওয়ায় সেখানে থেকে পড়ালেখা করাটা একটু সহজ হয়ে গিয়েছে। আমার সাথে ফোনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্প : পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য

লিখেছেন মোঃমোস্তাফিজুর রহমান তমাল, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৮


ছবিসূত্র: Freepik.com

পড়ন্ত বিকেলে যখন গাছের পাতা ভেদ করে নরম রোদ অনেক কষ্টে মাটির রাস্তার উপর পতিত হয় অথবা যখন আওলাদের মায়ের রূপা ও বাতাসী নামক ছাগল দুটো তার দলবল নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮০ দিন কর্ম পরিকপ্লনা : সমালোচনা ও শপথ একই দিনে ।

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

১৮০ দিনের কর্ম পরিকল্পনা : সমালোচনা ও শপথ একই দিনে ।



নূতন সরকার, নূতন পরিকল্পনা, নূতন চিন্তা ভাবনা ।
অনেকেই আগ্রহভরে বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন । কেউ কেউ অতীত ভূলতে পারছেন না,
তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই যোদ্ধাদের হয়রানি বন্ধ হোক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:১৩


এই দেশে বিপ্লব করা খুবই কঠিন । কিন্তু বিপ্লব করার পর শান্তিতে থাকা আরোও কঠিন। কারণ রাষ্ট্র বিপ্লবীদের কদর বোঝে না। তাই আমরা আজকে দাবি জানাতে এসেছি :... ...বাকিটুকু পড়ুন

×