
আজকাল পরিবারের মধ্যে নানা টানাপোড়েন, মা-বাবা সন্তানের সম্পর্কের নানাদিক দেখতে দেখতে বারবার আমার দেখা দুটো সিনেমার কথা মনে পড়ছে। প্রথম সিনেমাটার নাম মাসুম, আশির দশকে মুক্তি পাওয়া হিন্দি ছবি, যার মূল কাহিনী এরিক সেগালের Man, woman, and child নামের গল্প থেকে নেয়া হয়েছে। সিনেমাটির কাহিনী এরকম:
ছবির নায়ক ডিকে (নাসিরুদ্দিন শাহ) একজন স্থপতি। স্ত্রী ইন্দু, (শাবানা আজমি) এবং এবং দুই কন্যা নিয়ে তার সুখী স্বাচ্ছন্দ্যময় সংসার। এই সুখের সংসার প্রায় ভাঙ্গনের মুখে পড়ে যখন ডিকে ইন্দুকে জানায় যে, তার একটি ছেলে আছে। নয় বছর বয়স্ক এই ছেলের কথা ডিকে নিজেই জানতো না একেবারে, জানতে পেরেছে তখনই যখন ছেলেটির মা মারা গেছে। ছেলেটির জন্ম ডিকের একটি সংক্ষিপ্ত এ্যাফেয়ারের ফলে। ইন্দু যখন তাদের প্রথম সন্তান জন্ম দিতে বাবার বাড়িতে গেছিল, সেইসময় ডিকে নৈনিতালে তার পুরনো শিক্ষায়তনে অল্প কয়েক দিনের জন্য যায়। সেখানে তার শিক্ষকের মেয়ে ভাবনার সাথে এক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সম্পর্ক হয় ঠিকই, কিন্তু দুজনেই জানত, এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যত নেই, কারন ডিকে বিবাহিত। দুঃখ পেলেও, তারা দুজনেই এটা মেনে নেয় আর সংক্ষিপ্ত সম্পর্ক স্থাপন শেষে ডিকে ফিরে আসে তার পরিবারের কাছে। ভাবনা হয়তো ডিকের ক্ষণিকের মোহ ছিল, তাই নৈনিতাল থেকে ফিরে ভাবনার সাথে সে আর কখনোই যোগাযোগ করেনি, বরং ইন্দুর সাথে সুখের সংসার গড়ে তোলে, সেই সংসারে যোগ হয় আরেকটি কন্যা। এদিকে ভাবনা আর কখনোই ডিকের সাথে যোগাযোগ করেনি, কারণ ডিকের সুখের সংসারে ভাঙন ধরুক এটা সে চায়নি। তাই ডিকে কখনো জানতে পারল না যে, ভাবনার সাথে এই সংক্ষিপ্ত সম্পর্কের ফলে সে এক ছেলের পিতা হয়েছে, ছেলের নাম রাহুল। নয় বছর বয়সের রাহুলকে একা করে দিয়ে যখন তার মা মারা যায় তখন ভাবনার বাবা, ডিকের বৃদ্ধ মাস্টারজী, অনন্যপায় হয়ে রাহুলের কথা ডিকে কে জানান। মাথার উপরে আকাশ ভেঙ্গে পড়া ডিকে, রাহুলের কথা জানায় ইন্দুকে। বিশ্বাস ভঙ্গের বেদনাক্লিষ্ট ইন্দু- কষ্ট সত্বেও রাজি হয় রাহুলকে বাসায় আশ্রয় দিতে, ততদিন পর্যন্ত যতদিন না ডিকে রাহুলের থাকার কোন ব্যবস্থা করতে পারে। রাহুলের অপাপবিদ্ধ (মাসুম) চেহারা মাঝে মাঝে ইন্দুর মাতৃহৃদয়কে উদ্বেলিত করে তুললেও সেই আবেগকে সে দমন করেই রাখত; কারণ রাহুল ছিল ডিকের পরকিয়ার স্মারকচিহ্ন।
এরপর সিনেমা চলতে থাকে। ঘটনার উপর হাত না থাকা ডিকের অসহায়ত্ব, পিতৃস্নেহ প্রকাশ করতে না পারা, আবার ইন্দুর মনোবেদনা, টানাপোড়েন। সবকিছুর সুখের সমাপ্তি ঘটে ইন্দু যখন রাহুলকে ডিকের সন্তান হিসেবে তাদের পরিবারের একজন বলে মেনে নেয়।

দ্বিতীয় সিনেমার নাম ক্রেমার ভার্সেস ক্রেমার। এই ছবিটাও সন্তান নিয়ে পুরুষ ও রমণীর টানাপোড়েন বিষয়ক। টেড একজন কোম্পানি এক্সিকিউটিভ, এবং ওয়ার্কাহোলিক। এমন নয় যে সে স্ত্রী জোয়ানার উপর কোনরকম অত্যাচার করে, তবু জোয়ানা সিদ্ধান্ত নেয় সে টেডকে ছেড়ে যাবে- কারণ টেডের উদাসীনতা জোয়ানার মনে অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছিল। কোন ঝগড়া ঝাটি, কোনো আগাম আভাস ছাড়াই জোয়ানা একদিন টেড আর তাদের পাঁচ বছরের সন্তান বিলিকে ছেড়ে চলে যায়। নতুন জীবনের খাপ খাওয়াতে টেড আর বিলির কিছুটা কষ্ট হয়, তবু কিছু গ্রহণ আর কিছু বর্জনের মধ্যে দিয়ে এক সময় তারা দুজন জোয়ানা বিহীন নতুন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। গ্রহণ, অর্থাৎ সংসারের নানা কাজে কর্ম দক্ষতা অর্জন আর বর্জন- সংসারের কাজ করতে গিয়ে অফিসে টেডের পদাবনতি।
বাড়ি ছেড়ে যাবার পনের মাস পরে জোয়ানা টেডের কাছ থেকে বিলির কাস্টডি দাবি করে। টেডও বিলিকে রাখতে চায়, তাই কাস্টডির জন্য কোর্টে মামলা হল। কোর্টের হুকুম- বিলির জোয়ানার কাছেই থাকা উচিত, কারণ জোয়ানা তার মা। টেড এই রায়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারত, কিন্তু করল না যখন তার উকিল বল্লেন- এমনক্ষেত্রে বিলিকেই কোর্ট বলবে মা-বাবার মধ্যে একজনকে বেছে নিতে । এটা বিলের উপর চাপ সৃষ্টি করবে, এ কথা ভেবে টেড বিলিকে জোয়ানার কাছেই দিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।
ছবির শেষ অংশে এসে আসন্ন বিচ্ছেদে পিতা-পুত্রের গভীর বেদনাময় অভিব্যক্তি দেখা যায়। বিলিকে নিতে জোয়ানার আসার সময় হলে দুজনেই প্রস্তুত হয়- একজন বিদায় দিতে আরেকজন বিদায় নিতে। কিন্তু বিলিকে নিতে এসেও জোয়ানা বিলিকে নেয় না, বরং টেডকে জানায় যে, সে মনে করে বিলি তার নিজের বাসাতেই ভালো থাকবে। এখানেই সিনেমার সমাপ্তি হয়।
এই সিনেমা দুটোর আগে পরে আমি আরও অনেক পরিবারভিত্তিক সিনেমা দেখেছি- তবু এই সিনেমা দুটোর কথা বিশেষভাবে মনে থাকার কারণ সম্ভবত সিনেমা দুটির মধ্যে তিনটি মিল আছে। প্রথমত অসাধারণ সুন্দর নিষ্পাপ দুটি শিশুর মুখ, দ্বিতীয়তঃ দুটি সিনেমাতেই আছে মাতৃ হৃদয়ের টানাপোড়েনের পর সন্তানের কল্যাণে মায়ের আত্মত্যাগ, এবং তৃতীয়তঃ পারিবারিক বন্ধন। দুটি ছবিই আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে সন্তানের প্রতি মায়ের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা নিয়ে। মাসুম-এ ইন্দু স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতায় প্রচন্ড আঘাত পায়, আত্ম মর্যাদা রক্ষার জন্য স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়াটাই তার জন্য স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কেন সে গেল না, এ প্রশ্ন দীর্ঘসময় ধরে আমার মনে ছিল। ইন্দুর মনে বসত করে কয়জনা তা জানিনা- কিন্তু মনে হয় সব কয়জনার ওপরে প্রবল ছিল ইন্দুর মাতৃস্নেহ। ইন্দু ডিকের ঘর ছেড়ে গেলে তার আত্ম মর্যাদা রক্ষা হত ঠিকই, কিন্তু ব্রোকেন ফ্যামিলিতে তার মেয়েদের জীবন আগের মতো আনন্দময় থাকত না। ইন্দুর অপত্য স্নেহ এমন যে স্বামীর পরকীয়ার প্রমাণ রাহুলের উপরও তা বিস্তৃত হয়, সিনেমার অনেক দৃশ্যে ইন্দুর অপত্য স্নেহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শেষ অবধি ইন্দু রাহুলকে সন্তানস্নেহে মেনে নেয়।
ইন্দু কি হারল, নাকি জিতলো?
ক্রেমার ভার্সেস ক্রেমার-এ অবশ্য মা সন্তানকে ছেড়ে যায়। পরে জোয়ানা নিজের পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুঁজে পাবার পর ফিরে এসেছিল সন্তানের দাবি নিয়ে। জোয়ানার সাথে ইবসেনের নোরার মিল আছে, আত্ম মর্যাদার প্রশ্নে নোরাও তার সংসার ছেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু জোয়ানার সাথে নোরার পার্থক্যও ছিল- জোয়ানা ছিল একজন মা, কিন্তু নোরা তা ছিল না। তাই আমি নোরার গৃহত্যাগ সমর্থন করলেও জোয়ানার গৃহত্যাগ সমর্থন করি না। সিনেমাতে যতবার বিলির মন মড়া, সুন্দর মুখটা দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে এভাবে এত ছোট সন্তানকে ফেলে যাওয়া মায়ের ভীষণ অনুচিত কাজ। টেড জোয়ানাকে সময় দিত না, কিন্তু কোন অমর্যাদা তো করেনি! অবশ্য এমনও সংসার আছে যেখানে মাকে মর্যাদা দেয়া হয়না, অত্যাচার করা হয়- তেমন সংসারে সন্তানরা কখনো ভালোভাবে বড় হয়ে উঠতে পারে না, অতএব সেই সংসার ছেড়ে যাওয়াই মায়ের জন্য ভালো, মর্যাদাকর- কিন্তু সন্তানদের সাথে নিয়ে যেতে হবে।
এই দুই সিনেমার দুই মায়ের মধ্যে ইন্দুকেই আমার পছন্দ, তাতে কেউ আমাকে নারী স্বাধীনতার বিরোধী বলে ভাবলেও ভাবুন।
আমার মনে হয় নয় মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করার পর যখন মা সন্তানকে জন্ম দান করেন তখনই মায়ের আসল দায়িত্ব শুরু হয়- সন্তানের একটি সুন্দর শৈশব গড়ে তুলে তার জীবনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার মাধ্যমে। কেন মা এ দায়িত্ব পালন করবেন? কারণ সন্তান তার নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি। অতএব নিজের সুখের জন্য সন্তানকে অসুখী করে তোলার অধিকার কোন মায়ের নেই, যেমন অধিকার নেই কোন বাবার। সন্তান নেবার আগে তাই সবদিক ভেবে সন্তান নেয়া দরকার।
ইদানিং একটা জিনিস ভেবে আমার খুব অবাক লাগে, মায়েরা কিভাবে নিজের পরকীয়ার জন্য সন্তানকে অবলীলায় হত্যা করে- বিষ খাইয়ে গলাটিপে, এমনকি পুড়িয়ে!! এরা মা নামের কলঙ্ক। এমন মায়ের জন্ম যেন আর না হয়, যাদের জন্ম হয়েছে তারাও যেন বেচে না থাকে।
পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুক, সব সন্তানেরা ভালোবাসুক তাদের মাকে- মা দিবসে এইই প্রার্থনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

