
যারা একদিন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আজ তারাই নিজেদের মধ্যে বিভেদ, দোষারোপ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। আন্দোলন আর বঞ্চনার নামে শুরু হওয়া যে প্ল্যাটফর্মগুলো একসময় জনতার আশা ছিল, আজ সেগুলোই হয়ে উঠেছে দুর্নীতির আঁতুড়ঘর।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখ উমামা ফাতেমা সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এসে তার নিজের প্ল্যাটফর্মকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন: "জুলাই কেন মানি-মেকিং মেশিন হয়ে উঠল?" উমামার অভিযোগ স্পষ্ট: যাঁরা আগে ‘সমন্বয়ক পরিচয়’ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন, আজ তারাই নিজেদের নামে সেই পরিচয় কুক্ষিগত করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি আর দলীয় নিয়ন্ত্রণে মেতে উঠেছেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অপকর্ম চলছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় - নেতা নয়, নেতাদের ছায়া-সঙ্গীদের হাতেই চলছে টাকার খেলা। যদিও তিনি সরাসরি কারো নাম নেননি, তবে ইঙ্গিত ছিল পরিষ্কার: 'ছাত্র উপদেষ্টা'দের দিকেই আঙুল।
উমামার অভিযোগের সুরেই যেন আরও বিস্ফোরক তথ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। প্রফেসর ইউনুসের ঘনিষ্ঠ ও জুলাই আন্দোলনের মূল মস্তিষ্ক হিসেবে পরিচিত এই নেতা সম্প্রতি ফেসবুকে এমন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন, যা পরে সম্পাদনা করে কিছুটা নরম করার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত মাহফুজ আলমের সেই স্ট্যাটাসে সরাসরি দুর্নীতি, তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আঙুল তোলা হয়েছে এমনভাবে যে রাষ্ট্র চাইলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে পারে।
ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে যেন পুরো দেশ কাঁপিয়ে দিলেন। তাঁর বক্তব্য: "আজকাল অনেকের লেজ কাটা যাচ্ছে বলে আমার বিরুদ্ধে লেগেছে। নতুন একটি দলের একাধিক মহারথী এর সঙ্গে যুক্ত। সবই প্রকাশ পাবে। একটি সার্কেলের প্রায় সবাই করাপ্টেড, কিন্তু একজন কোনো টাকা নেয়নি এটা কার সহ্য হবে?" পরে তিনি 'নতুন দল' শব্দের স্থলে বিভিন্ন দলের নাম উল্লেখ করে স্ট্যাটাসটি সম্পাদনা করেন, যা এক রকমের বালখিল্যতা বলেই ধরা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, যিনি নিজের বক্তব্যকে নিজেই ধারণ করতে পারছেন না, তিনি কিভাবে একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ?
স্ট্যাটাসটি পরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এডিট করলেও, আগুন তখন ছড়িয়ে পড়েছে। নাম না বললেও ‘নতুন দল’ কারা, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, একজন উপদেষ্টা হয়ে মাহফুজ নিজেই স্বীকার করছেন যে, তিনি জানেন কে বা কোন দল কত টাকা নিচ্ছেন, কে দুর্নীতিতে জড়িত। তাহলে তিনি কী করছেন? রাষ্ট্র বা প্রশাসনই বা তার ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
এদিকে, গতকাল মাহফুজ আলমের সিডনিতে থাকা ভাইকে নিয়ে একটি অর্থ লেনদেন সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস হয়। অভিযোগ ওঠে, মাহফুজ আলম নিজেই ভাইকে টাকা পাঠিয়েছেন, যদিও তিনি পরে তা অস্বীকার করেন। তিনি নিজেই তা খণ্ডন করেছেন, কিন্তু আগুনের ধোঁয়া আর অস্বীকারের চাদর দিয়ে পুরোটা ঢাকা যায় না। সবার আগে দরকার স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত। তাঁর জানা তথ্য যদি সত্যি হয়, তাহলে দুদকের উচিত অবিলম্বে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা । মাহফুজ আলম যদি সত্যিই দুর্নীতির চিত্র জানেন, তাহলে দুদক কেন এখনো চুপ ? নাকি দুদক এখনো সেই পুরনো কাঠামোয় মুখে তালা দিয়ে বসে আছে?
নতুন দলটি হয়তো সরাসরি কিছু বলবে না, কারণ তাদের নাম সরাসরি টানা হয়নি। প্রফেসর ইউনুসের জন্য এখনো সময় আছে, কোনো বড় বিপর্যয় আসার আগেই একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা। নচেত, ইতিহাস মাফ করবে না।
জনমত দিন দিন নেতিবাচক হচ্ছে। আজকে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল দিয়ে নতুন দলটির মিছিল ও সমাবেশ করা জনগণের চোখে ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। আজ টাঙ্গাইলে নতুন দলটি যে সমাবেশ করছে, সেখানে ৯০০ পুলিশ সদস্য তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। সারাদেশের এমন অবস্থায় এভাবে পুলিশের ব্যবহার একটি খারাপ নজির তৈরি করছে। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলের ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের স্কুল থেকে ডেকে এনে সেই সমাবেশে যোগদান করানো হয়েছে। এটা কি রাজনীতি, না শিশু অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন ? এইসব ঘটনায় জনগণ ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি তাতে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও জনরোষের মুখে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়িত হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভবিষ্যৎ কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




