
সম্প্রতি কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) যখন বাংলাদেশী পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয়, তখন ভারতের ‘অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশন’-এর সভাপতি ইমাম উমর আহমেদ ইলিয়াসি হঠাৎ করেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তিনি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ইস্যু তুলে ধরেন এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের ধুয়া তুলে দাবি করেন: শাহরুখ খানকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। প্রশ্ন জাগে, আইপিএল-এর মতো একটি বাণিজ্যিক টুর্নামেন্টে যেখানে হাজার কোটি টাকার জুয়া, মদের স্পনসরশিপ আর চিয়ারলিডারদের উপস্থিতি থাকে, সেখানে একজন ইমামের হঠাৎ ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের খোঁজ পেলেন কেন? আসলে এই উদ্বেগের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক রাজনৈতিক মাস্টারপ্ল্যান।
২০১৫ সাল থেকে ইমাম ইলিয়াসি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি-আরএসএস (BJP-RSS)-এর সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। ৩০ জন মুসলিম নেতার প্রতিনিধি দল নিয়ে মোদির সাথে সাক্ষাৎ করা কিংবা ২০২৪ সালে সংসদে গিয়ে তাকে অভিনন্দন জানানো—তার রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ দেয়। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয় ২০২২ সালে, যখন তিনি RSS প্রধান মোহন ভাগবতকে ‘রাষ্ট্র পিতা’ বলে অভিহিত করেন। একজন মুসলিম ইমাম হয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রধানকে এই উপাধি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা হাস্যকর ও আপত্তিকর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন সরকারের দেওয়া ‘Y+’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা।
ইলিয়াসি সর্বদা ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। গোহত্যা নিষিদ্ধ করা, গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করা কিংবা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ‘অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করার নির্দেশকে সমর্থন করা—তার প্রতিটি পদক্ষেপই মুসলিমদের টার্গেট করে তৈরি। তিনি রাম মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়ে সমালোচকদের পাকিস্তানে যাওয়ার পরামর্শ দেন, যা মূলত বিজেপিরই রাজনৈতিক রণকৌশল।
ইমাম ইলিয়াসি বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে সোচ্চার এবং জাতীয়তাবাদের নামে মোস্তাফিজকে বাদ দিতে বলছেন। কিন্তু ভারতে মুসলিমদের ওপর চলমান ভয়াবহ সহিংসতায় তিনি সম্পূর্ণ নির্বাক। সাম্বালে চার মুসলিম যুবককে পুলিশ এনকাউন্টারে হত্যা, রাজস্থান-হরিয়ানায় ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে মুসলিমদের লিঞ্চিং, কিংবা উত্তরাখণ্ড ও ওডিশায় ধর্মান্তরণের অভিযোগে হত্যাকাণ্ড—কোনো কিছুতেই তার কণ্ঠ শোনা যায় না। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গো-রক্ষকদের হাতে ৪৪ জন নিহত হয়েছেন যার ৩৬ জনই মুসলিম, অথচ এই ‘পাপেট’ মৌলানা নিশ্চুপ । বিপরীতে, মেহবুবা মুফতির মতো নেত্রীরা নৈতিক সততার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের নিন্দা করার পাশাপাশি ভারতে মুসলিমদের লিঞ্চিং নিয়েও সমান সোচ্চার। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, অপরাধী যে দেশেই হোক না কেন, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার সবসময়ই নিন্দনীয়।
সীমান্তের ওপারে ভারতের ইলিয়াসি থাকলে, এপারের চিত্রও ভিন্ন নয়। বাংলাদেশেও একদল তথাকথিত আলেম সরকারের তোষামোদি করতে গিয়ে ইসলামের মূল আকিদা লঙ্ঘন করছেন। রফিকুল্লাহ আফসারীর মতো বক্তারা দোয়া করছেন যেন ড. ইউনূসের জীবদ্দশায় বাংলাদেশে আর নির্বাচন না হয়। ভোটাধিকার যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার, সেখানে এটি বন্ধ রাখার দোয়া করা স্পষ্টত অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গাওয়া। তিনি ইউনূসকে এমনভাবে ‘নেয়ামত’ বলছেন যেন তিনি কোনো অলৌকিক সত্তা। মুফতি কাজী ইব্রাহিম ড. ইউনূসের ক্ষমতা গ্রহণকে ‘নবুওয়াতি পদ্ধতি’র সাথে তুলনা করছেন এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ‘হারাম’ বলে ফতোয়া দিচ্ছেন। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া কেবল চাটুকারিতা নয়, বরং তা শিরক ও ব্যক্তিপূজার পর্যায়ভুক্ত।
২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে গার্মেন্টস কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে ব্লাসফেমির মিথ্যা অভিযোগে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে গাছে ঝুলিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। অথচ র্যাবের তদন্তে কোনো ধর্মীয় অপমানের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। । এই চরম নৃশংসতায় আমাদের এই সব বক্তারা নিশ্চুপ। যারা নির্বাচন বন্ধের জন্য দোয়া করতে পারেন, তারা মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে মিম্বর থেকে কোনো কঠোর ফতোয়া দেন না। মব লিঞ্চিং যে কবিরা গুনাহ এবং ইসলামে হারাম: এই সত্যটি জনগণের সামনে তুলে ধরার সাহস বা সদিচ্ছা তাদের নেই। হেফাজতে ইসলাম নামমাত্র বিবৃতি দিলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি ।
ইমাম ইলিয়াসি হোন কিংবা রফিকুল্লাহ আফসারী ও কাজী ইব্রাহিম: এরা সবাই মূলত রাজনৈতিক ‘পাপেট’ বা হাতের পুতুল। এদের কাজ হলো ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডাকে বৈধতা দেওয়া। একজন প্রকৃত আলেম কখনো ক্ষমতার তোষামোদি করেন না; তিনি মজলুমের পক্ষে কথা বলেন, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য নিয়ে সোচ্চার হন এবং মব লিঞ্চিংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে মিম্বর থেকে রুখে দাঁড়ান। এই পাপেট মোল্লারা দেশ ও জাতির জন্য বিপজ্জনক। এরা ধর্মের দোহাই দিয়ে আসলে নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা ও রাজনৈতিক মাস্টারদের স্বার্থ হাসিল করছেন। সাধারণ মানুষের উচিত এসব ‘পেইড’ বক্তাদের চিনে রাখা এবং অন্ধ আনুগত্য পরিহার করা।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


