somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ট্রাম্প-পুতিনের দানবীয় খেলায় কি তবে ৩য় বিশ্বযুদ্ধই ভবিতব্য?

০৭ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসটি ক্রমেই এমন এক অশুভ কালপঞ্জিতে পরিণত হচ্ছে, যা ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলোর সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠছে। ১৯১৪ সালের সারায়েভো হত্যাকাণ্ড বা ১৯৩৯ সালের পোল্যান্ড আক্রমণের মতো ঘটনাগুলো যেমন বিশ্বকে এক অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তেমনি চলতি জানুয়ারির ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে—আমরা হয়তো আবারও এক ভয়াবহ যুগসন্ধির মুখোমুখি।

৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন অভিযানে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া এবং ৭ জানুয়ারি উত্তর আটলান্টিকে রাশিয়ার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ জব্দ—এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম নয়। এগুলো একটি ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উপসর্গ, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আর কূটনীতির মুখোশ রাখারও প্রয়োজন বোধ করছে না।

১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের সময় পৃথিবী পারমাণবিক ধ্বংসের কিনারা থেকে ফিরে এসেছিল, কারণ তখনও পরাশক্তিদের মধ্যে অন্তত ন্যূনতম সংলাপ ও পারস্পরিক সীমারেখা ছিল। আজ সেই সংলাপ প্রায় বিলুপ্ত। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং পুতিনের কর্তৃত্ববাদী শক্তিরাজনীতি—উভয়েই আন্তর্জাতিক আইনকে প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য, প্রয়োজনে উপেক্ষাযোগ্য একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। এর ফলাফল হলো—আইনের শাসনের বদলে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতির প্রত্যাবর্তন।

আর্কটিক অঞ্চল এখন আর নিছক বরফ ও নীরবতার রাজ্য নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলতে থাকায় অঞ্চলটি দ্রুত পরিণত হচ্ছে পরাশক্তিদের নতুন প্রতিযোগিতার ময়দানে। নতুন শিপিং রুট, বিশেষ করে রাশিয়ার ‘নর্দার্ন সি রুট’, বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সমুদ্রতলের নিচে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আর্কটিককে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম কৌশলগত অঞ্চলে রূপান্তর করেছে।

রাশিয়া জাতিসংঘের নির্ধারিত আইনি কাঠামোর মধ্যেই দাবি জানাচ্ছে যে লোমোনোসভ রিজসহ কিছু সাবমেরিন রিজ তাদের মহাদেশীয় শেলফের প্রাকৃতিক সম্প্রসারণ। এই দাবি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত নয় এবং কানাডা ও ডেনমার্ক (গ্রিনল্যান্ডের মাধ্যমে) একই অঞ্চলে পাল্টা দাবি তুলেছে। অর্থাৎ, এখানে এখনো সরাসরি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি—কিন্তু সংঘর্ষের বীজ বপন হয়ে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ নিছক উদ্ভট কৌতুক নয়। এটি মূলত আর্কটিকের উপর প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো সামরিক অভিযান বাস্তবে ঘটেনি, কিন্তু মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক আগ্রহ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—ওয়াশিংটন আর্কটিককে রাশিয়ার একচেটিয়া প্রভাব বলয়ে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। এখানে সংঘর্ষ এখনো আইনি ও কূটনৈতিক স্তরে থাকলেও ভবিষ্যতে তা সামরিক রূপ নেবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আমরা এক ধরনের নির্লজ্জ রিয়েলপলিটিকের উত্থান দেখছি। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের ক্লান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিক্রিয়া এবং একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আগ্রাসী পদক্ষেপ—এই দুইয়ের মধ্যে এক অঘোষিত ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ রাজনীতি কাজ করছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক আঘাত, যা গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের কথা বলত।

চীন যখন তাইওয়ান প্রণালিতে শক্তি প্রদর্শন করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যখন ন্যাটো মিত্রদের পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালত কার্যত দর্শক মাত্র। ইতিহাস আমাদের শেখায়—যখন পরাশক্তিরাই আইন ভঙ্গকারীতে পরিণত হয়, তখন বড় সংঘর্ষ এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। আজকের নেতা আটক বা জাহাজ জব্দ—এসব হয়তো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, কিন্তু বড় বিস্ফোরণের পূর্বাভাস।

এই বৈশ্বিকঝড়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো। ভেনেজুয়েলার ঘটনা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা: পরাশক্তির স্বার্থের পথে কোনো সরকার বা সার্বভৌম সম্পদ বাধা হয়ে দাঁড়ালে, আন্তর্জাতিক আইন সেখানে খুব দুর্বল ঢাল মাত্র। নিরপেক্ষতা এখন আর নৈতিক অবস্থান নয়—বরং এক ধরনের বিলাসিতা।

আমরা এমন এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে। এই শতাব্দীতে বাংলাদেশের মতো দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে: শক্তির এই উন্মত্ত সংঘর্ষের ভেতর নিজেদের অস্তিত্ব ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা

মুল লেখা : https://www.jugantor.com/united-states/1049965
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩১
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জ্বলে উঠার আগেই তারেক ম্যাজিকের সমাপ্তি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪০



খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা জিয়া থেকে এসেছে। প্রিয়জনের পরিবারের সদস্যদেরকে ভালোবাসতে গিয়ে জনগণ এখন ক্লান্ত। জনগণ এখন ভালোবাসার প্রতিদান চায়। যার থেকে তারা ভালোবাসার প্রতিদান চায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে কি ব্লগারদের কৃপনতা জেকে বসেছে ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৫১


ব্লগ একটি লেখা প্রকাশ ও পাঠক মন্তব্য চালাচালির স্থান।একজন লেখক তাঁর লেখার উপর পাঠক প্রতিক্রিয়া/ফিডব্যক দেখতে চান, যেন তিনি পাঠক প্রতিক্রিয়ার আলোকে নীজের লেখার মান উন্নত... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূলের (সা.) সুন্নাতের পর আখারিনের মাযহাবের কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০৭



সূরা: ৯ তাওবা, ১২২ নং আয়াতের অনুবাদ-
১২২। আর মু’মিনদের এটাও উচিৎ নয় যে (জিহাদের জন্য) সবাই একত্রে বের হয়ে পড়বে। সুতরাং এমন কেন করা হয় না যে, তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ইমাম এত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেবেন কেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৬


১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির গেটে শুরু হয় অস্বাভাবিক গোলমাল। মিনিটের মধ্যে সেখানে জড়ো হয় দেড়শো মানুষের উত্তেজিত ভিড়। তাদের টার্গেট... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসল সত্য তাহলে কোনটা?

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৩৬

আসল সত্য তাহলে কোনটা?

জাপানের ফুজি মাউন্টেন, ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ওরা এখনো বলে, শাপলা চত্বরে হেফাজতের জমায়েতে
কাউকেই নাকি হত্যা করা হয়নি।
গায়ে রং মেখে কিছু লোক ৫ মে ২০১৩... ...বাকিটুকু পড়ুন

×