somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফেনী জেনারেল হাসপাতাল: যখন অপারেশন থিয়েটার হয় ‘রান্নাঘর’

১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাকিবের বোন প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিল। সামর্থ্য নেই বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার, তাই শেষ ভরসা ছিল সরকারি ফেনী জেনারেল হাসপাতাল। মনে মনে সান্ত্বনা ছিল, "সরকারি হলেও তো আর ভূতের বাড়ি নয়!" কিন্তু হাসপাতালের করিডোরে পা দিতেই রাকিবের ভুল ভাঙলো। শুনলো এক অদ্ভুত খবর—সেখানে নাকি অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়মিত পিঠা বানানো হয়! লোকে বলছে, দুই বছর ধরে ওটি এখন ‘অপারেশন ক্যাটারিং সার্ভিস’ হয়ে গেছে। যেখানে সিজারের চেয়ে নাকি পিঠা আর বিরিয়ানির সুগন্ধই বেশি পাওয়া যায়।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, অপারেশন থিয়েটার হবে শতভাগ জীবাণুমুক্ত। কিন্তু হাসপাতালের নার্সদের নিজস্ব থিওরি আছে: "জীবাণুমুক্ত জায়গায় রান্না করলে তো খাবারও জীবাণুমুক্ত হবে!" নার্সিং সুপারভাইজারদের নেতৃত্বে গ্যাসের চুলায় পিঠা ভাজা হচ্ছে, আর পাশের কক্ষেই একজন মায়ের সিজার চলছে। একদিকে অপারেশন টেবিলে ছুরি চলছে পেটে, অন্যদিকে সিঙ্কে ছুরি চলছে সবজিতে। কী এক অপূর্ব আর রোমহর্ষক সমন্বয় !

চিকিৎসকরা শুধু যে এই অনিয়ম জানতেন তাই নয়, বরং সেই রান্না করা খাবার দিয়ে নিজেদের ‘ব্যক্তিগত আয়োজন’ সারতেন। কল্পনা করা যায়—ডাক্তার সাহেব নার্সকে জিজ্ঞেস করছেন, "আজ ওটিতে কী রান্না?" নার্স উত্তর দিচ্ছে, "বিরিয়ানি স্যার, তবে একটা সিজার বাকি, ওটা শেষ করেই পরিবেশন করছি।" তারা শপথ নিয়েছিলেন "প্রথমে ক্ষতি করো না" (First, do no harm), কিন্তু বাস্তবে যেন শপথটা ছিল— "আগে খেয়ে নাও, তারপর রোগীর চিন্তা !"

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা। দুই বছর ধরে ওটির ধোঁয়া আর সুগন্ধ ওনার নাকে পৌঁছায়নি! হয়তো উনি সকালে সরকারি গাড়ি দিয়ে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছাতে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা দেখার ফুরসত পান না। ওনার ভাষায়, তিনি "অবগত নন"! প্রশাসনের এই গাফিলতি প্রমাণ করে যে, সাধারণ রোগীর চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধাই তাদের কাছে বড়।

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জুনিয়র কনসালটেন্টের অনুরোধ: "সংবাদ প্রকাশ করবেন না, আমাদের কয়েকটা দিন সময় দিন।" এটা যেন চোর ধরা পড়ার পর বলছে, "টাকাটা ফেরত রাখার জন্য একটু সময় দিন !" তদন্ত কমিটির নামেও চলছে প্রহসন। হাসপাতালের লোক দিয়েই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাঁচ দিনের এই সাজানো নাটকে সম্ভবত শেষ দিনে রিপোর্ট আসবে: "সামান্য অনিয়ম পাওয়া গেছে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" তারপর সব আবার আগের মতো!

আইরিন, কানিজ ফাতেমা কিংবা ফাহমিদা তাসনিম: এরা শুধু নাম নয়, এরা একেকজন অসহায় মানুষের প্রতিনিধি। কানিজ ফাতেমা ঠিকই বলেছেন, "যাদের কাছে স্বাস্থ্য সুরক্ষার আশা ছিল, তাদের কাছেই আমরা অনিরাপদ।" ধনীরা বিদেশে যায়, আর গরিব-মধ্যবিত্তরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ‘ক্যাটারিং সেন্টারে’ চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে এক চূড়ান্ত তামাশা।

ফেনী জেনারেল হাসপাতালের এই ঘটনা শুধু একটি জেলা হাসপাতালের চিত্র নয়, এটি আমাদের পুরো ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। যেখানে মানুষের জীবনের চেয়ে পিঠা আর বিরিয়ানির গুরুত্ব বেশি, সেখানে ‘সেবা’ শব্দটি এক বিশাল পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

ভিডিও দেখুন : Click This Link







-
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৫৯
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=হাঁটি, আমি হাঁটি রোজ সকালে-মনের আনন্দে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

রোজ সকালে খুব হাঁটার অভ্যাস আমার, সকালটা আমার জন্য আল্লাহর দেয়া অনন্য নিয়ামত। হাঁটা এমন অভ্যাস হয়েছে যে, না হাঁটলে মনে হয় -কী যেন করি নাই, কী যেন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাহমুদুর রহমান মান্না বুঝেছিলেন, হাসনাত কাইয়ুম বোঝেননি

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০৯



মাহমুদুর রহমান মান্না ভাই বুঝেছিলেন, হাসনাত কাইয়ুম ভাইরা বোঝেননি!

এত ব্যস্ততার মাঝেও বিশদ আকারে পুরনো কাসুন্দি ঘাটতে হচ্ছে...

মান্না ভাই যখন তাঁর নাগরিক ঐক্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেন (সম্ভবত ২০১০-এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

দোষী আওয়ামীলীগারদের দৌড়ের উপর রাখা খারাপ কাজ নয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৩০

@আদিত্য ০১,
আপনি ৩৬ জুলাইয়ের পক্ষের সকল দলের আন্দোলনকারীদের শাউয়া - মাউয়া ছিঁড়ে ফেলবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। ন্যাংটা করে পিটানোর কথা বলেছেন। কারণ, আওয়ামীলীগারদের দৌড়ের উপর রাখা হইছে। তাহলে বুঝে দেখুন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোট ২০২৬ কী এবং কেন?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৪


গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে নিজেরা সরাসরি কোনো প্রস্তাব, আইন বা রাজনৈতিক বিষয়ে ভোট দেয়। গণভোটের ফলাফল আইনত বাধ্যতামূলকও হতে পারে যার ফলে নতুন নীতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ পাখি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪১

এসেছো ?
জমানো সব দুঃখ নিয়ে?
অঝোরে কেঁদে কেঁদে বলবে তো,
তা বেশ বলো আমাকে।
জাগতিক নিয়ম তো আর ভুল হয়না
দুঃখের পরে সুখ, সুখের পরে দুঃখ।
ভুল হয় তখন,
যখন দুঃখ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×