
দক্ষিন স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চল।
এপ্রিলের ১৫ তারিখে এক সপ্তাহের জন্য এসেছি; গ্রানাডা, কর্ডোবা আর মালাগার রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি। লোকাল কুইজিনের স্বাদ নিচ্ছি। বিশ্বখ্যাত স্থানগুলো ঘুরে দেখছি............পুরাই চিল মুডে। এলাকাগুলোকে লিটারেলি ভাজা ভাজা করে ফেলছি। চিল মুড বললাম এই জন্য যে, আগেই ঠিক করে রেখেছি শুধু ঘুরে বেড়াবো আর চিল করবো, অন্য কোন ধরনের প্যারা নিবো না। ফেইসবুকে আমি এমনিতেই ঢুকি না, ব্লগের প্রতি আকর্ষণও কমে গিয়েছে অনেকটাই। কাজেই কোন নিউজ চ্যানেলে আমি যদি না ঢুকি, তাহলে দিন-দুনিয়ার কোন খবরের পক্ষে আমার চৌহদ্দির ধারে-কাছে আসার সাধ্য নাই, ফলে স্ট্রেস বাড়ার কোন সম্ভাবনাও নাই।
২০ তারিখে ফোনে খবর পেলাম, জার্মানীতে থাকা আমার ভাতিজা একজন কন্যা সন্তানের গর্বিত পিতা হয়েছে। আসলে প্যারাকে যতোই দুরে ঠেলার চেষ্টা করি না কেন, সে কোন না কোন ভাবে ঘাড়ে সওয়ার হবেই। এখন ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর আবার জার্মানীতে যাওয়া লাগবে। কিছু আত্মীয়তার এমনই বাধ্যবাধকতা যে, এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নাই একদমই।
এক ছুটি কাটিয়ে এসে আবার ছুটি নেয়া বিরাট দিগদারী একটা ব্যাপার। সপ্তাহ দুয়েক নাকে-মুখে কাজ করে বসকে ম্যানেজ করে ছুটলাম জার্মানী। পারিবারিক দায়িত্ব পালন করে ফিরে এসে আবার নাকে-মুখে কাজ শুরু করলাম যাতে ইজ্জতের উপর কোন হামলা না হয়। কাজের প্রতি আমার অতি আগ্রহ আর একাগ্রতা দেখে শেষে বস বলেই বসলো, মফিজ.........তুমি কি আসলেই বদলায়ে গেছো, নাকি আমারে দেখাইতেছ? টেনশান নেওয়ার কিছু নাই; ধীরে-সুস্থে কাজকাম করো। তোমার টেনশান দেইখা তো আমারই টেনশান হইতেছে!! এতো কাজ করলে হার্টের উপর চাপ পড়বে। শেষে না আবার দীর্ঘদিনের জন্য তোমারে ছুটি দেয়া লাগে!!!!
বসের কথায় সমস্ত শরীরে আহ্লাদী টাইপের একটা শান্তির সু-বাতাস বয়ে গেল। গত বেশ কিছুদিন যাবৎ দিন-দুনিয়ার ব্যাপারে উদাসীন থেকে উথাল-পাথাল কাজ করার সুফল হাতে-নাতে পাওয়া গেল অবশেষে। ব্যাটা এমনিতে বিরাট ঘড়েল হলেও আপাততঃ চেহারা দেখে মনে হলো হাইলি ইমপ্রেসড!! তৎক্ষনাৎ ক্রিসকে কফি কর্ণারে আসতে বললাম। কফি নিয়ে নীচে, স্মোকিং জোনে গিয়ে বিষয়টা সেলিব্রেইট করা দরকার!!!
কফি সহযোগে বিড়ি টিড়ি টেনে ডেস্কে এসে থিতু হয়েছি মাত্র, আমার এক বন্ধু ফোন করলো।
মফিজ, ঘটনা শুনছো? কারিনা মারা গিয়েছে।
ইন্নালিল্লাহ পড়তে গিয়ে থমকালাম। কারিনা মুসলমান বিয়ে করলেও নিজে মুসলমান হয়েছে, এমনটা আমার নলেজে নাই। এখন তার জন্য কি ইন্নালিল্লাহ পড়া যাবে? সঠিক জানি না। কাজে কাজেই খানিকটা কনফিউজড টোনেই বললাম, ইসরে........খুবই খারাপ লাগছে!!! ''যাব উই মেট'' মুভিটা দেখার পর থেকেই সে আমার খুবই প্রিয় অভিনেত্রী। এই বয়সে মারা গেল? ছোট ছোট দুইটা ছেলে। একটার নাম বোধহয় তৈমুর, আরেকটার নাম যেন কি? একদমে কথাগুলো বলে একটু থামলাম। তারপরে বললাম, কিভাবে মারা গেল?
ওই প্রান্তে দেখি কোন সাড়াশব্দ নাই। একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্ট যাকে বলে। আমার বলা কথাগুলো হজম করলো সম্ভবতঃ। তারপরে অত্যন্ত শীতল কন্ঠ শোনা গেল, তুমি কি আমার সাথে মশকরা করো? আমি কারিনা কাপুর না, কারিনা কায়সারের কথা বলছি।
আসলে কথায় কথায় কয়দিন আগে আমার বউও বলেছিল যে, কারিনা অসুস্থ। আমি ততোটা মনোযাগ দেই নাই। তখনও ভেবেছিলাম কারিনা কাপুরই হবে। ভেবেছি, বড়লোক মানুষ; ছোটখাটো সমস্যা হবে হয়তো। খুব বেশি হলে কি আর হবে..........কিছু টাকা খরচা করেই বিষয়টা সামাল দিয়ে ফেলবে। বেশ কয়েকদিন সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারনে দুনিয়াদারীর ব্যাপারগুলোতে একেবারেই অনাগ্রহী হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বিষয়টা বিস্তারিত জেনে খুব খারাপ লাগা শুরু হলো।
মনে পড়লো, কারিনা কায়সারকে একবারই দেখেছিলাম যখন ওর বয়স বছর দুয়েক হবে হয়তো। নাদুস-নুদুস আদুরে একটা মেয়ে। কায়সার ভাইয়ের সাথে আমাদের বাসায় এসেছিল। উনি ছিলেন মোহামেডান আর জাতীয় ফুটবল দলের তারকা খেলোয়াড়। উনার তৎকালীন সতীর্থ জাতীয় দলের গোলকিপার কানন ভাই ছিল আমার দুলাভাইয়ের বন্ধু। সেই সুবাদে সবাই সবার বন্ধু। উনাদের পারিবারিক আরেকটা লিঙ্ক ছিলো আমার............কায়সার হামিদের মা বিশিষ্ট দাবাড়ু রানী হামিদ। আমরা একসাথে ঢাকা মহানগর দাবা লীগে খেলেছি। অবশ্য এ'সবই অতীতের কথা। বহু বহু বছর যাবৎ কোন যোগাযোগ নাই।
সেই মেয়ে এতো অল্প বয়সে চলে গেল। মনের অজান্তেই বুক চিড়ে একটা দীর্ঘানশ্বাস বেড়িয়ে এলো.............আহারে!!! জীবনটা ঠিকমতো শুরু করার আগেই ঝরে গেল!!! ফুড ভ্লগিং কন্টেন্ট ক্রিয়েশানের সুবাদে নিয়মিত স্ট্রীট ফুড খাওয়া, সেখান থেকে হেপাটাইটিস এ / হেপাটাইটিস ই বাধিয়ে লিভার বিকল। না বুঝে, না জেনে আমরা আমাদের শরীরের কতো ক্ষতিই না করি!!! ক্ষতির মাত্রা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে চলে যাই।
বাংলাদেশে বাসায় তৈরী করা খাবারের বাইরে রাস্তাঘাটে, রেস্টুরেন্টে কিংবা দোকানে যাই খাওয়া হোক না কেন, সবই বিষ। এই বিষ নিয়মিত খেতে থাকলে এর মুল্য একটা না একটা সময়ে চুকাতে হবেই। এই আমার কথাই বলি। দেশের সিঙ্গারা আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা খাবার। এর ব্যাপারে আমি এতোটাই অবসেসড যে, দেশে যাওয়ার সময়ে প্লেনে বসেই এক্সাইটেড থাকি। প্ল্যান করি বাসায় গিয়ে প্রথম সুযোগেই গরম গরম ধোয়া ওঠা প্রমাণ সাইজের সিঙ্গারা খাওয়ার, সাথে শষা-গাজর-টমাটো-কাচা মরিচ-ধন্যাপাতা দিয়ে তৈরী কুচি কুচি সালাদ..............এক বসায় কমপক্ষে পাচটা খাবো.......এমনটা ভাবতে ভাবতে মুখের লালা গড়িয়ে পড়ে। ফ্লাইটের সুস্বাদু খাবারও পানসে মনে হয়। অথচ এই বস্তুটা একটা আপাদমস্তক বিষ।
বেশ আগে এক ফুড ভ্লগারকে বলতে শুনেছিলাম যে, এটা যেহেতু গরম তেলে ভাজা হচ্ছে, কাজেই রোগ-জীবাণু যা আছে সব মরে শেষ হয়ে যায়। কাজেই এটা নিরাপদ। কি ভয়াবহ অজ্ঞতা!!! আমাদের দেশের অনেকেরই প্রতিদিনের রুটিন স্ন্যাক্স হলো চা-সিঙ্গারা। এটা ভাজার পরে এর উপর যে ধুলা-বালি পড়ে, তার কথা বাদই দেই। যেই তেলে এটা ভাজা হয়, সেটা ট্রান্স ফ্যাট; যা হার্ট-লিভারের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। এটাতে ব্যবহৃত ময়দা হলো রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট। এর ভেতরের যে আলু, সেটাও কার্বোহাইড্রেট। পুরাই একটা বিষের প্যাকেজ। এই বস্তু নিয়মিত খেলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীগুলোর লাভ বৃদ্ধি ছাড়া আর কোন লাভ নাই।
বহুল আলোচিত ফুচকার কথাই ধরি না কেন!!! দৈনিক ইত্তেফাকের একটা রিপোর্ট বলছে.........ল্যাব টেস্টে এক প্লেট ফুচকা/চটপটিতে ৭ কোটি পর্যন্ত পায়খানার জীবাণু পাওয়া গিয়েছে। সাধে কি এতো টেস্টি হয়!!!!!
একইভাবে বাইরের প্রতিটা খাবার ব্যবচ্ছেদ করলে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। দেশে অনেকেরই ফিলোসফি এমন যে, একদিন তো মরতেই হবে, কাজেই এইসব মুখরোচক খাবার না খেয়ে মরার চাইতে খেয়ে মরাই ভালো। কিন্তু এটা ভাবে না যে, মরার আগে কি কি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। দেশে কোন পরিবারের একজন সদস্য কায়দামতো একটা অসুখ বাধাতে পারলে তা পুরো পরিবারকে পথে বসানোর জন্য যথেষ্ট। আর মারা যাওয়ার আগে নিজের এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য বোনাস হিসাবে পাওয়া যাবে সীমাহীন নরক যন্ত্রণা।
নামী-দামী রেস্টুরেন্টের খাবারকেও নিরাপদ ভাবার কোন কারন নাই। অভিজাত স্টোরের দামী রুটি-কেক-বিস্কুট, সেটা যদি প্যাকেটজাতও হয়, তবুও সেটা বিষ। সরাসরি বিষ। একটু ভাবেন..........কি কি উপাদান দিয়ে সেইসব খাবার বানানো হয়। আর সেইসব উপাদান আপনার শরীরে ঢুকে কি কি সর্বনাশ করে। নিজের বুদ্ধিতে নিজে মারা খাচ্ছেন, খান; কিন্তু পরিবারসুদ্ধ সবাইকে বিপদে ফেলার কোন অধিকার নিশ্চয়ই আপনার নাই।
অনেক আগের একটা টিভি কমার্শিয়ালের পাঞ্চ লাইন ছিল এমন, ''বুদ্ধিমান হোন, সঠিক কাজটি করুন''। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও দেশে ঘরের বাইরের যে কোনও খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য এই কথা কয়টা খুবই প্রাসঙ্গিক। মনে রাখবেন, প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর!!!! সেই সাথে একটা বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদও স্মরণে রাখবেন............আজ বুঝলি না, বুঝবি কাল; পাছা থাপড়াবি, পারবি গাল।
পরম করুণাময় কারিনা কায়সারকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।।
ফটো ক্রেডিটঃ আমার কমদামী মোবাইল। ফটোটার বিষয়ে কয়েকটা কথা বলা জরুরী। প্রথম দিনে মালাগার টোরেমলিনোস সিটি সেন্টারে স্থাপিত এই সাদা মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যটা দেখে ভাবলাম.........পাইছি!!! এইটা নিশ্চিত বিখ্যাত আন্দালুসিয়ান ষাড়ের ভাস্কর্য। সাথে বোনাস হিসাবে আছে ম্যাটাডোর। পরে দেখি, সবই ভুল। ষাড়টা গ্রীক মিথোলজি অনুযায়ী ষাড়ের ভং ধরা দেবতা জিউস। আর ম্যাটাডোর যারে ভাবছি, সে একজন রাজকুমারী, নাম ইউরোপা!! কি তামশা!!!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


