somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোরবানি: তাকওয়া না লৌকিকতা?— একটি ব্যক্তিগত অনুভুতি

২৫ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো, আমি কোনো ইসলামিক স্কলার নই। ধর্মতত্ত্ব বা শরিয়তের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো গভীর জ্ঞান বা পাণ্ডিত্য কোনোটিই আমার নেই। আমি এ সমাজের একজন অতি সাধারণ মানুষ। চারপাশে প্রতিনিয়ত যা দেখি, যা অনুভব করি—আজ কেবল নিজের ভেতরের সেই অবরুদ্ধ মনের কথাগুলোই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে বসেছি।

মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। তখন কোরবানির ঈদ মানেই ছিল অন্যরকম এক নির্মল আনন্দ। ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই পাড়ার বিভিন্ন বাসার সামনে গরু-খাসি বাঁধা হতো। আমরা ছোটরা দল বেঁধে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় ঘুরে ঘুরে সেই পশুগুলো দেখতাম। সেই আনন্দের মাঝে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল না কোনো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। বড় হওয়ার পর ঈদের দিন সকাল থেকেই অন্যরকম ব্যস্ততা শুরু হতো—পাড়া-প্রতিবেশী সবাই মিলে একসাথে পশু কোরবানি দেওয়া, মাংস কাটা। সবার মাঝে যে একাত্মতা ছিল, তা মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিত।

কিন্তু আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে, চারপাশের পরিবেশটা যখন দেখি, তখন মনের সেই পুরনো আনন্দগুলো কেমন যেন উবে যায়। এখন কোরবানির সেই পুরোনো উৎসবমুখরতা আর আমাকে টানে না, বরং এক ধরনের গভীর বিষাদ এসে মনকে আঁকড়ে ধরে।

কারণ, আমাদের উৎসবের পরিচ্ছন্ন আনন্দকে আজ গিলে খেয়েছে ‘শো-অফ’ বা লৌকিকতার এক সর্বগ্রাসী সামাজিক ব্যাধি। এখন কোরবানি মানেই যেন একটা প্রতিযোগিতা। কে কত লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনল, কার গরুর সাইজ কত বড়, বাজারে কারটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় পশু—এসব নিয়ে চলছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ঈদের দিন সকাল হতেই শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পশুর দাম আর ছবি পোস্ট করে সস্তা বাহবা বা জাহির করার লড়াই। অথচ যে ইবাদতটির মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল বিনয় এবং আত্মত্যাগ, তা আজ পরিণত হয়েছে সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের এক বার্ষিক উৎসবে!

আমরা যেন ভুলেই গেছি কোরবানির আসল ইতিহাস এবং এর মূল স্পিরিট। কোরবানি কোনো মাংস খাওয়ার উৎসব নয়, কোনো অর্থনৈতিক আভিজাত্য প্রদর্শনের মঞ্চও নয়। এর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের মনের আত্মশুদ্ধি, ভেতরের সমস্ত কলুষতা আর পশুবৃত্তিকে চিরতরে দূর করা। নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করার যে মহান শিক্ষা হযরত ইব্রাহিম (আ.) দিয়ে গেছেন, আমরা কি তার ছিটেফোঁটাও আজ ধারণ করতে পারছি?

পবিত্র কোরআন শরিফে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কোরবানি কবুল হওয়ার শর্ত বলে দিয়েছেন। সূরা আল-হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (পরহেজগারি/আত্মশুদ্ধি)।"

স্রষ্টার এই বাণী কত স্পষ্ট, কত সুগভীর! স্রষ্টার আমাদের দেওয়া পশুর মাংসের প্রয়োজন নেই, পশুর পেছনে ঢালা লাখ লাখ টাকার হিসাবের কমতিও তাঁর দরবারে নেই। তিনি যা দেখেন, তা হলো আমাদের নিয়ত। আমাদের অন্তরের কতটা পরিশুদ্ধি ঘটল, পশুর গলায় ছুরি চালানোর সাথে সাথে আমরা আমাদের ভেতরের কতটুকু অহংকার, লোভ আর লৌকিকতাকে বিসর্জন দিতে পারলাম—তা-ই কেবল আল্লাহর কাছে পৌঁছায়।

দুর্ভাগ্যবশত, আজ আমরা আল্লাহর সেই সন্তুষ্টির পথকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছি। আমরা মজে আছি লৌকিক আচার-আচরণে। এর একটি বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ঈদের দিন দুপুরের পর আমাদের চারপাশের রাস্তায়। লাখ লাখ টাকা খরচ করে যে পশুটি আমরা কিনলাম, জবাইয়ের পর তার রক্ত ও বর্জ্য নির্দ্বিধায় ফেলে রাখছি প্রকাশ্য রাস্তায়। দুর্গন্ধে প্রতিবেশীর টেকা দায় হচ্ছে, অথচ আমরা ড্রয়িংরুমে বসে মাংসের সুস্বাদু পদের হিসাব করছি। আবার যে দরিদ্র মানুষটি সারা বছর মাংসের মুখ দেখে না, আমাদের লোকদেখানোর প্রতিযোগিতায় তার প্রাপ্য অংশটুকুও দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। এই যদি হয় আমাদের তাকওয়ার অবস্থা, তবে সেই কোরবানি কতটুকু সার্থক?

আমরা আজ বাহ্যিক আড়ম্বরে এতটাই মেতে উঠেছি যে, আল্লাহর নির্দেশিত মূল পথ থেকে দিন দিন অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। পশুর রক্ত ঝরছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মনের কালিমা দূর হচ্ছে না। যদি কোরবানি দেওয়ার পর আমাদের মনের অহংকার না কমে, যদি আমরা অন্যকে ছোট করে দেখার মানসিকতা থেকে বের হতে না পারি, তবে তা স্রেফ একটি পশুপালনের বাণিজ্যে বা মাংসের উৎসবে রূপ নেয়—তা আর ইবাদত থাকে না।

এখনই সময় আমাদের একটু থমকে দাঁড়ানোর। আমাদের নিজেদের ভেতরের এই মেকি খোলসটা ভেঙে ফেলা দরকার। আসুন, লৌকিকতার এই উৎসব থেকে বেরিয়ে এসে যদি আমরা কোরবানির সেই হারিয়ে যাওয়া মূল স্পিরিট বা তাকওয়াকে ফিরিয়ে আনি।

কোরবানি শুধু পশুর নয়, অহংকারেরও হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে লৌকিকতামুক্ত, খাঁটি নিয়তে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৭
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাননীয় "যদি-কিন্তু" সাহেবের বিদায়ী ভাষণ একটি কাল্পনিক রম্য রচনা

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯

মাননীয় "যদি-কিন্তু" সাহেবের বিদায়ী ভাষণ
একটি কাল্পনিক রম্য রচনা

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

একদিন সকালবেলা, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জাতি খবরের কাগজ খুলে দেখল, দেশের সবচেয়ে বড় পদটির জন্য মনোনীত... ...বাকিটুকু পড়ুন

"ধর্ষক ও চরিত্রহীনদের বাঁচাতেই কি ওয়াজের মঞ্চ? সাধারণ মানুষকে আর কত অন্ধ বানিয়ে রাখবেন!"

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:১২


ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্ষক ও ব্যভিচারীদের পাপ ঢাকা এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে রাখার এই ভণ্ডামি আর কতকাল সহ্য করবেন?
পবিত্র ইসলাম আর সাহাবিদের ত্যাগকে কতখানি নামালে এই ভণ্ড মোল্লা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিঃশব্দ প্রহর

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯



খাস খাতার পাতায় কলম চালাচ্ছিলেন ফরিদা বেগম (৪৫)। রাত তখন সাড়ে সাতটা। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে পাশে বসা ছোট ছেলে সিয়ামকে (৯) বললেন, "হাতের লেখা এত দ্রুত শেষ করলে হবে?... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশিরা কেন বিজেপির পতন চায়?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে মনে হয় ভারতের ভাগ্য নির্ধারণের গুরুদায়িত্ব বুঝি এদেশের মানুষের ওপর এসে পড়েছে। ভারতে কোথাও একটু আন্দোলন বা উত্তাপ ছড়ালেই এপারে যেন উৎসবের ধুম পড়ে যায়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রিয়েলিটি আপনারা মাইনে নেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩০



নরেন্দ্র মোদীকে আপনি যতই অপছন্দ করেন না কেন, তার একটা একটা প্রশংসনীয় গুণ আছে। সে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ নিতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের অপছন্দের কাজটা করতেও পিছপা হয় না।
সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×