
তেহরানের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এখন এক অদ্ভুত সমীকরণ মেলাচ্ছে ইরানিরা। যে অভিযানে আয়াতুল্লাহ খামেনি থেকে শুরু করে দাপুটে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এবং সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর ৪৮ জন শীর্ষ নেতাকে নিমেষেই নির্মূল করা হলো, সেই একই আগুনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অক্ষত থাকাটা কেবলই কাকতালীয় হতে পারে কি ? গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা একটি ডেকাপিটেসন স্ট্রাইক বা শীর্ষ নেতৃত্ব ছেঁটে ফেলার অপারেশন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই হামলার সাফল্য নিয়ে চরম দম্ভোক্তি করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সম্ভাব্য প্রায় সব উত্তরসূরিই এখন মৃত। ট্রাম্পের ভাষায়, "আমরা যাদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছিলাম, তারা কেউই আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না; কারণ তারা সবাই মৃত। এমনকি দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতারাও নিহত হয়েছেন।" খামেনিকে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আরও বলেন, "তিনি মারার আগেই আমি তাকে শেষ করেছি।" ট্রাম্পের এই সরাসরি স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, এই নিধনযজ্ঞ ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের টার্গেট।
ট্রাম্পের এই কৌশলের পেছনে কাজ করছে তার প্রিয় ভেনেজুয়েলা মডেল। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন যে, তিনি ইরানেও এমন এক ক্ষমতা হস্তান্তর চান যেখানে প্রশাসনিক কাঠামো টিকে থাকবে কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব বদলে যাবে। পেজেশকিয়ান ও আরাগচি—দুজনেই সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং পশ্চিমাদের সাথে দরকষাকষিতে অভ্যস্ত। ট্রাম্প সম্ভবত তাদের প্রয়োজনীয় মিত্র হিসেবে দেখছেন। তাদের জীবিত রাখা হয়েছে যাতে যুদ্ধের চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞের পর তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো বৈধ কর্তৃপক্ষ নতুন কোনো চুক্তিতে সই করতে পারে এবং একটি নমনীয় নতুন প্রশাসন গড়ে তুলতে পারে।
যারা নিহত হয়েছেন, তাদের প্রোফাইল ছিল আপসহীন এবং ইসরাইলের অস্তিত্বের প্রতি চরম হুমকি। আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর বা পুলিশ গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল রেজায়িয়ানদের বেঁচে থাকা মানেই ছিল গেরিলা যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা। অন্যদিকে, আহমাদিনেজাদ ছিলেন জনগণের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক ফায়ারব্র্যান্ড নেতা। ট্রাম্পের ভাষায়, তার কাছে খুব ভালো তিনটি বিকল্প রয়েছে যারা আগামীতে ইরান পরিচালনা করবেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পেজেশকিয়ান ও আরাগচি হয়তো সেই তালিকারই অংশ যারা পুরোনো কট্টরপন্থীদের সরিয়ে মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবেন।
সবচেয়ে বড় বিতর্কটা দানা বেঁধেছে আরাগচির সন্দেহজনক গতিবিধি নিয়ে। হামলার ঠিক আগমুহূর্তে আরাগচির ওমান সফর এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের কাছে তার ব্যক্তিগত বার্তা পাঠানো নির্দেশ করে যে, পর্দার আড়ালে কোনো সেফ প্যাসেজ ডিল হয়ে থাকতে পারে। খামেনি বা আহমাদিনেজাদের মতো নেতাদের নিখুঁত লোকেশন হয়তো কোনো গোপন চুক্তির বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে। ট্রাম্পের তৈরি করা এই ‘মডেল সরকারে’র পুতুল হিসেবে তারা কাজ করবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এই মৃত্যুমিছিলের মাঝে যদি তারা টিকে যান এবং নতুন কাঠামোর অংশ হন তবে রাজনৈতিক আপসের এক চরম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



