
বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "বাংলাদেশ থেকে জামাতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে কাজ করতে হবে"। "নির্মূল" শব্দটি সম্পূর্ণভাবে দূর করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, কলেরা বা ম্যালেরিয়া নির্মূল করা, কিংবা সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা অথবা, ক্ষতিকর আগাছা নির্মূল করা। সবগুলো উদাহরণের সাথে জামাতের রাজনীতি তুলনীয় বটে!
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছিল, বিএনপি ও জামাত একধরনের আপসের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। কিন্তু ঠিক কী ঘটল যে, ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো মৃদুভাষী রাজনীতিবিদ জামাতের রাজনীতিকে নির্মূল করার মতো কঠোর শব্দ ব্যবহার করলেন?
একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, জামাত তাদের স্বভাবসিদ্ধ রাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে ও শক্তি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিচ্ছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তাদের যোগাযোগ এই প্রচেষ্টার একটি দিক, যা তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ।
তবে এর চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক হলো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের একে পার্টির সাথে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। তুরস্কের ধর্মভিত্তিক পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতি ও উগ্র পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর সাথে জামাতের যে ঘনিষ্ঠতা, সেটিকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক তাদের অস্ত্র ব্যবসার জন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণে তৎপর হয়েছে।
তুরস্কের সাথে জামাতের সম্পর্ক নতুন নয়। তবে তাদের আর্থিক সমঝোতা ও বাণিজ্য সম্পর্কের সূচনা ড. ইউনূসের সময় থেকে হয়েছে। ইসলামপন্থি শক্তি ও আওয়ামী লীগের প্রবল বিরোধী হিসেবে জামাতকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা নির্বাচনের সময় হয়েছিল।
কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা কে যখন আওয়ামী সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ফাঁসি দেওয়া হল, তখন পাকিস্তানের পাশাপাশি আরেকটি দেশ এই ঘটনায় উচ্চকণ্ঠ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। সেটা এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন তুরস্ক সরকার। পাকিস্তানের সংসদে কাদের মোল্লার বিচারকে প্রহসন আখ্যা দিয়ে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছিল, যা মুক্তিযুদ্ধকালীন ঐতিহাসিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বোধগম্য।
কিন্তু তখন কাদের মোল্লার পক্ষে বিবৃতি দেওয়া তুরস্কের অবস্থান বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। আমাদের মনে তখন পর্যন্ত তুরস্ক বলতে একটি ভিন্ন চিত্র ভেসে ওঠতো। সেটা কামাল আতাতুর্কের আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যার নামানুসারে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। যার সাথে আবার রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল এবং পরবর্তী অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য যুক্ত আছে।
অতীতে কাদের মোল্লার মতো জামাতের নেতারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে মুক্তিযুদ্ধে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মত নৃশংসতায় জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের পর পাকিস্তানের ভেতরে বাংলাদেশের প্রতি প্রতিশোধ প্রবণতা রয়ে গেছে। ইসলামপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠী ব্যবহার করে ভারতে হামলার যে অভিযোগ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আছে, তেমনভাবে বাংলাদেশি ইসলামপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠিগুলো দিয়ে ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ তাদের থাকতে পারে।
বাংলাদেশে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত ভারতবিরোধিতা তৈরি হলে উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো এতে উৎসাহিত হতে পারে। তারা চায় বাংলাদেশও অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হোক। তবে বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা পাকিস্তানের নেই। জামাত তাই, পাকিস্তানি সামরিক ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি তুরস্কের প্রভাবশালী উগ্র ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এই গোষ্ঠীগুলো অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং তুরস্কের ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ।
তুরস্কে এরদোয়ানের ধর্মভিত্তিক পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতি বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। পাশাপাশি তুরস্কের জন্য বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে তুরস্কের এসব গোষ্ঠী জামাত ও তার সহযোগী সংগঠন এনসিপি, এবি পার্টি এবং আরও কিছু লোককে তাদের নেটওয়ার্কের সহযোগী হিসেবে যুক্ত করেছে।
জামাত ও তার সহযোগী সংগঠনের লোক বলতে অনেক সময় অমার্জিত ও অপরিশীলিত কিছু মানুষের কথা মনে হয়। কিন্তু জামাতে বা জামাতের দোসর এই নতুন শ্রেণিটি বেশ "শিক্ষিত" এবং "প্রায়-মার্জিত"। এদের অনেকেই বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ দিয়েছে এবং পেশাগত জীবনে কিছু দক্ষতা অর্জন করেছে। জামাতের এটি এক নতুন ধরনের সাংগঠনিক সক্ষমতা, যেখানে তুরস্কের পৃষ্ঠপোশকতায় স্থানীয় কর্মীদের পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাজীবীদের নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে পেরেছে।
তুরস্ক-ভিত্তিক এই গোষ্ঠিটিকে সুবিধা দেবার জন্য তাদের পক্ষে জনমতকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন পরে। যদিও তুরস্ক-ভিত্তিক এই গোষ্ঠিটি একটা অশুভ এবং ইসলামী মূল্যবোধের সম্পূর্ন বিপরীত একটি শক্তি, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্মান্ধদের ইসলামপন্থী প্রচারণা শক্তিশালী হলেই কেবল তাদের সুবিধা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ বিষয়ে কিছু রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সেখানে অস্ত্র প্রবাহে নতুন ট্রানজিট পথ ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এসব অস্ত্রের একটি অংশ তুরস্কে উৎপাদিত বা তুরস্ক-সংযুক্ত প্রতিরক্ষা শিল্পের সরঞ্জাম।
বাংলাদেশকে ব্যবহার করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে, যা আমাদের রাজনীতিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে। সেই সাথে আমরা বড় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে পরতে পারি। ফলস্বরূপ জামাতের ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও হতে পারে।
তুরস্কের এই উগ্র-পুঁজিবাদী ও ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এখন জামাত ও এনসিপির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোশক। বিএনপি এই অশুভ তৎপরতায় উদ্বিগ্ন বলে মনে হয়। "বাংলাদেশ থেকে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে কাজ করতে হবে" ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্য জামাতের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে একটি হুঁশিয়ারি হতে পারে।
তবে বিএনপি শুধু এই সতর্কবার্তা দিয়েই থেমে যাবে, নাকি কার্যকর কোনো প্রতিষেধক প্রয়োগের পরিকল্পনাও করেছে, সেটাই দেখার বিষয়।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



