somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইরানের ভবিষ্যৎ কি ট্রাম্প নির্ধারণ করবেন?

০৭ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রমজানের শান্ত বিকেলে যখন দস্তরখান সাজিয়ে ইফতারের প্রতীক্ষায় বসেছিল ইরানের কোনো এক সাধারণ পরিবার, তখন হয়তো তাদের ভাবনায় ছিল না যে এই পবিত্র মাসটি ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদময় হয়ে উঠবে। আজানের সুর ভেসে আসার আগেই আকাশ বিদীর্ণ করে বিস্ফোরণের শব্দ ধেয়ে এল। মুহূর্তেই উৎসবের আমেজ রূপ নিল আতঙ্কে। দস্তরখানের উপর থেকে চুরমার হয়ে পড়ল ছাদের টুকরো। খেজুর আর শরবতের পাশে ছড়িয়ে পড়ল ধুলো আর রক্ত। আমেরিকা আর ইসরায়েলের যৌথ বোমাবর্ষণে একে একে তছনছ হয়ে যাচ্ছিল সেই সাজানো শহরগুলো, যেগুলো গড়তে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ঘাম ঝরিয়েছিল।

সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা তেরোশোর কাছাকাছি বলা হচ্ছে, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো যারা চাপা পড়ে আছেন, তাদের কথা কেউ গুনছে না। লাখো মানুষ রাতারাতি ঘরহারা হয়ে তেহরানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, মাথার উপর ছাদ নেই, হাতে কোনো টাকা নেই। যুদ্ধের আগুন কেবল সামরিক ঘাঁটি পোড়ায় না, সে পোড়ায় একটা শিশুর ঘুমের চাদর, একটা বৃদ্ধার সযত্নে তোলা বিয়ের ছবি, একটা তরুণের স্বপ্নের খাতা।

ইসরায়েল ভাবছে ইরানও সিরিয়ার মতো ভেঙে পড়বে; কিন্তু সিরিয়ার গল্পটা আলাদা ছিল। সেখানে শাসকশ্রেণি ছিল সংখ্যালঘু শিয়া, আর দেশের বেশিরভাগ মানুষ ছিলেন সুন্নি। সেই ভেতরের ফাটলেই বাইরের ধাক্কা কাজ করেছিল। ইরানে সেই ফাটলটা নেই। এখানে শাসক আর শাসিত একই সম্প্রদায়ের মানুষ। ঘরে আগুন লাগলে মানুষ আগে বাইরের শত্রুর দিকে মুখ ঘোরায়, নিজের দেশের বুকে ছুরি বসায় না।

ট্রাম্প হুমকি দিয়ে রেখেছেন, ইরান যদি তাকে না জানিয়ে সর্বোচ্চ নেতা বেছে নেয়, তাহলে বোমা থামবে না। তিনি বলছেন আইআরজিসি সহ সবাইকে সরিয়ে ইরানকে মুক্ত করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটা দেশের ভবিষ্যৎ নেতা কে হবেন, সেটা ওয়াশিংটন থেকে ঠিক হওয়ার অধিকার কে দিল? ইরানের মানুষ কেন সেটা মানবেন? জার্মানির নতুন রক্ষণশীল সরকারও পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ইরানে রেজিম চেঞ্জ তাদের সমর্থন পাবে না। কারণ তারা জানে, বাইরে থেকে গায়ের জোরে কোনো দেশ বদলানো যায় না, শুধু সেই দেশটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া যায়।

ট্রাম্প একদিন বলছেন স্থলযুদ্ধ হতে পারে, কুর্দিদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। পরদিন বলছেন স্থলযুদ্ধ সময়ের অপচয়। অনেকে এই দোদুল্যমানতাকে দুর্বলতা ভাবেন, কিন্তু এটা আসলে পুরনো একটা কৌশল, সবাইকে অনিশ্চয়তায় রাখো, কেউ যেন পরিষ্কার পরিকল্পনা করতে না পারে। তবে পেন্টাগনের ভেতরে দুশ্চিন্তা আছে। কুর্দিদের দিয়ে ইরানে হামলা করানোর হিসেবটা মানচিত্রে যতটা সহজ দেখায়, মাঠে ততটা নয়। ইরাক সীমান্তের কুর্দিরা যদি ইরানে ঢোকে, তাহলে ইরাকের শিয়া জোটের সরকার আর ইরান-ঘেঁষা পিএমএফ মিলিশিয়া হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ইরাকের কুর্দিস্তান তখন পাল্টা আঘাতের মুখে পড়বে। সিরিয়ায় কুর্দি এসডিএফকে দিয়ে যে প্রক্সি মডেল কাজ করেছিল, ইরানের ভূগোল আর রাজনীতিতে সেই ছক খাটবে না।

এই যুদ্ধের ধোঁয়া কেবল তেহরানের আলবোর্জ পর্বতের গায়ে আটকে নেই। সেই ধোঁয়া এসে ঢুকেছে ঢাকার গলিতেও। জ্বালানি সংকটে ভোগা বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বিশ্বের এই উত্তাল সময়ে ছোট একটা দেশ একা কতটুকু সামলাতে পারে ?

মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালুতে ঘাম ঝরানো বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছে এই যুদ্ধ কোনো ভূরাজনৈতিক চালচলন নয়। এটা তাদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। তারা পেন্টাগনের কৌশল বোঝেন না, তেল আবিবের হিসাব বোঝেন না। তারা কেবল বোঝেন মাস শেষে বাড়িতে পাঠানো টাকাটা, যা দিয়ে বৃদ্ধ বাবার ওষুধ কেনা হয়, মেয়ের স্কুলের বেতন দেওয়া হয়, সংসারের চাকা ঘোরানো হয়। সেই আশ্রয়েই এখন বোমার আঘাত এসে লেগেছে। দুজনের নিথর শরীর ইতিমধ্যে কফিনে দেশে ফিরছে; সাতজন হাসপাতালের বিছানায় লড়ছেন। তারা কারো শত্রু ছিলেন না, কারো মিত্র ছিলেন না। শুধু একমুঠো ভাতের আশায় ভিনদেশে গিয়েছিলেন, আর অন্যের ক্ষমতার লড়াইয়ে তাদের জীবন শেষ হয়ে গেল।

ইসরায়েল এখন কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাতে হামলার দায় ইরানের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে, পুরনো ফলস ফ্ল্যাগের খেলায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই খেলা চিনে ফেলেছে, তাই তারা চুপ করে আছে। ভারতের বিদেশমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিজের সমস্যা। সেই একই যুক্তিতে বলা যায়, ইসরায়েল-আমেরিকা যে যুদ্ধ করছে সেটা কেবল তাদের নিজেদের যুদ্ধ। কিন্তু তার দাম দিচ্ছে সবাই, ঢাকার রিকশাওয়ালা থেকে দুবাইয়ের নির্মাণশ্রমিক পর্যন্ত।

যে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনে নেওয়া হয়, তার আগুনে পুড়ে যায় তেহরানের ইফতারের দস্তরখান, গাজায় কোনো মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশু, কিংবা ঢাকার কোনো শ্রমিকের রান্নাঘরের চুলা। অথচ সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে কেবল একটি দেশের ভোটারদের হাতে। যে সিদ্ধান্তের মূল্য পুরো পৃথিবী দেয়, সেই সিদ্ধান্তে পৃথিবীর মানুষের কোনো কণ্ঠস্বর নেই—এটাই আজকের বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈষম্য। হয়তো একদিন পৃথিবীকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে: যে শক্তি পুরো পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করে, তাকে কি কেবল একটি দেশের নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ন্যায়সঙ্গত?

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৪২
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যুদ্ধে কেউ হারে না

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩০


বেশ কয়েক বছর দেশে যাই না, এবার ভাবছিলাম দেশে গিয়ে ঘুরে আসব! সামারে আমাদের ছুটি থাকে লম্বা তিন মাস, কোন ক্লাস নেই। আমেরিকায় একাডেমিক লাইনে এটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যরাতের যাত্রী

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১৪


আজ সুমনার কাজ একটু দেরী করেই শেষ হয়েছে। নার্সিং হোমের এই কাজে আছে প্রায় এক দশক ধরে। কাজ শেষ করতে প্রতিদিনই বেশ রাত হয়ে যায়। বৃদ্ধ রোগীদের দেখাশোনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা অলমোস্ট ধ্বংসের পথে | It's time for a new middle east B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:৪৬



আপনারা সবাই জানেন যে ইরানের পোষা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বছরের পর বছর ধরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে; মধ্যপ্রাচ্যের এমন কোন দেশ নেই যারা কোন না কোন ভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান যুদ্ধ ও আমেরিকার ডলার সংকট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:২৩



মধ্যপ্রাচ্যেতে থাকা প্রচুর বাংলাদেশী আছেন যারা আট দশ বছরেও দেশে আসতে পারছেন না। করোনার কারণে অর্থনৈতিক ভাবে হাত পা ভেঙ্গে গিয়েছে। এরা স্ত্রী সন্তান রেখে বছরের পর বছর যুগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রমজান ২০২৬ এর সাত দিন ও আমার ইফতার প্লাটারস..... :) :) :)

লিখেছেন শায়মা, ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৫১

সেই যবে থেকে আমি এই ব্লগে পদার্পন করেছিলাম তবে থেকেই আমি রোজা রমজানে আর কিছু না হোক আমার ক্রিয়েটিভিটির নানা রকম ইফতার ও তার রেসিপি দিয়ে আসছিলাম। কালের বিবর্তনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×