somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দোসর

২০ শে মে, ২০২৬ রাত ২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গত কয়েক দিনে ঘটে গেল বিচিত্র সব ঘটনা। কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর এনসিপির স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপানো আমার দৃষ্টিতে বিচিত্র ঘটনাই বটে। তবে আরও বিচিত্র লেগেছে ডেইলি স্টারের হাম বিষয়ক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে কয়েকজন পরিচিত মানুষকে দেখে। উনাদের নিয়েই আসলে শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক । কারা ছিলেন হাম বিষয়ক অনুষ্ঠানে যাদের নিয়ে এত আলোচনা সমালোচনা চলছে ?

তাঁরা হলেন মেহের আফরোজ শাওন, আনিস আলমগীর, হো চি মিন ইসলাম, সাংবাদিক জই মামুন, রাশেদা কে চৌধুরী, মোজাফফর আহমেদ, ছড়াকার আখতারুজ্জামান এবং সাংবাদিক আবু সাঈদ খান। কী, নামগুলো পরিচিত মনে হলো? এদের মধ্যে অনেককেই আমরা পাঁচই আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করতে দেখছি, বিএনপি সরকারের সমালোচনা করতেও দেখা যায়। তবে এদের মধ্যে আখতারুজ্জামান আজাদ, হো চি মিন এবং আবু সাঈদ খানকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। উনাদের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো নয়। এরা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছেন না আওয়ামী লীগের পক্ষে।

কিন্তু আনিস আলমগীর এবং মেহের আফরোজ শাওন চোখে পড়ার মতো কাজ করছেন। শাওনকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভারতে পলাতক নেতাদের সাথে বৈঠক করার ভুয়া সংবাদ প্রচার করে। আর আনিস আলমগীর তো ওসমান গনি হাদি খুন হওয়ার দিন নিহারি খেয়ে সেটার ভিডিও নিজের সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করার ফলে তিন মাস কারাগারে ছিলেন। শাওন তেমন কোনো টকশোতে যান না, কিন্তু আনিস আলমগীর সাহেব যেদিন টকশোতে যান সেদিনই ইউনূস সাহেবের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে আসেন।

লোকটা যেভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান এবং জনসমর্থন তৈরি করছেন সেটা দেখার মতো। আনিস আলমগীর পাঁচই আগস্ট অবশ্য অবস্থা বেগতিক দেখে জুলাই আন্দোলনকারীদের পক্ষে কথা বললেও, পাঁচই আগস্টের পর তিনি ক্রমাগত জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান তৈরি করে অন্তর্বর্তী সরকারের চক্ষুশূল হয়েছেন। তবে মানতেই হবে, আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের চেয়ে তিনি বেশি পরিশ্রম করছেন আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠন করতে।

স্বভাবতই হাম রোগে শিশু মারা যাওয়া নিয়ে আনিস আলমগীর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি ইউনূস সাহেবের বিচার দাবি করে মোল্লাদের সাথে নিয়ে আন্দোলন করলেন, আবার ডেইলি স্টারের আয়োজনেও গেলেন। জুলাই পক্ষ প্রশ্ন তুলছে কোন যোগ্যতয় আনিস আলমগীর হাম শীর্ষক সভাতে গেলেন। তিনি কি বিশেষজ্ঞ ? তিনি তো আওয়ামী লীগের দালালি করেন। এখন ইউনূস সাহেবের বিরুদ্ধে বলার জন্য এবং জুলাই পরবর্তী শাসনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করতে হাম নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় গিয়েছেন।

এদিকে মেহের আফরোজ শাওনকে নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে শাওন আপাও পাল্টা জবাব দিয়ে বসলেন। বললেন যে নূরজাহান বেগম যদি গ্রামীণের কিস্তি তুলে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হতে পারেন তবে তিনি কেন হাম শীর্ষক সভাতে যেতে পারবেন না। এই যে তাঁরা হাম নিয়ে চারপাশ তোলপাড় করছেন, তা কি আসলেই শিশুদের প্রতি ভালোবাসায়, নাকি সুযোগ বুঝে নতুন সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ করে মানুষের মনে একটা সহানুভূতি তৈরির চেষ্টা, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিগত বছরগুলোতে যখন ডেঙ্গুতে শয়ে শয়ে মানুষ মারা গেল, তখন কিন্তু এই গুণীজনদের এমন জোরালো প্রতিবাদ চোখে পড়েনি ।

আসলে এরা কেউ আমাদের সমস্যা নিয়ে পরোয়া করেন না। উনাদের কাজ হলো হামের ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের মধ্যে সহানুভূতির আবহ তৈরি করা এবং জুলাই পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলা। হামে তাদের আত্মীয় স্বজনের কোনো শিশু মারা যাবে না, তারা দুই চারজন মানুষের চিকিৎসার খরচ কোনোদিন বহন করবেন না। আসলে সংকট তাঁদের কাছে নিজেদের আদর্শিক লড়াইয়ের একেকটা চমৎকার হাতিয়ার মাত্র।

একই রকম ঘটনা কিন্তু আমরা জুলাই আন্দোলনের মাঝামাঝিতেও দেখেছিলাম। যখন কোটা বাতিলে লড়াইয়ে আবু সাঈদের বুক লক্ষ্য করে গুলি চলল, তখন এক সাহসী নারী রূপে আবির্ভূত হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোনামী ম্যাডাম। শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে একাই ছাত্রদের আগলে রাখার সেই দৃশ্য দেখে সবাই ভেবেছিল তিনি বুঝি মানবতার মূর্ত প্রতীক। কিন্তু সময় গড়াতেই জানা গেল, ম্যাডামের ছোট ভাই ছাত্র শিবিরের রাজনীতি করেন এবং তিনি নিজেও সেই সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একমাত্র নারী হিসেবে উপস্থিত থেকে গর্ববোধ করেন।

ছাত্রদের বাঁচানোর সেই মহান চেষ্টার আড়ালে আসলে নিজের দলের গোপন উদ্দেশ্য লুকানো ছিল। সরকারের পতনের পর এই মোনামী ম্যাডাম কিছুদিন বেশ সরব থাকলেও এখন একদম চুপচাপ। দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মুখ থেকে একটি শব্দও বের হচ্ছে না।আসলে সময় যখন নিজের দল বা মতের অনুকূলে থাকে তখন আর সমাজের সমস্যা চোখে পড়ে না, তখন আর আসমান কাঁপে না।

ওহ, আসমান কাঁপার কথা বলতেই মনে পড়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়মা ফেরদৌস ম্যামের কথা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ম্যাডামের সেই অবিস্মরণীয় কথা এখনো কানে বাজে। ম্যাডাম বলেছিলেন বড় দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে অভিশাপে আসমান কাঁপে, শেখ হাসিনার মন কি কাঁপে না। এভাবে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে যা দেখে সায়মা ম্যাডামের চোখে জল চলে এসেছিল । দিনশেষে দেখা গেল, তিনি একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার সুযোগ্য কন্যা, যিনি অতীতে বাবার পক্ষে ভোটও চেয়েছেন । অথচ দেশের বর্তমান সংকট নিয়ে সেই প্রতিবাদী শিক্ষকের কোনো জ্বালাময়ী বক্তব্য আর কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ যখন ভাবছিল তিনি বুঝি কোথাও হারিয়ে গেছেন, তখনই তাঁকে আবার দেখা গেল কারিনা কায়সারের জানাজায়, যেখানে তিনি সবাইকে জুলাই আন্দোলনের চেতনার আলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার পরম পরামর্শ দিচ্ছিলেন।

এসব সংবাদ দেখতে দেখতে আমার পানির খুব তৃষ্ণা পেল। তখন মনে পড়ল রুকসানা নিকোল আপুর কথা। যমুনা টেলিভিশনের এই সাংবাদিককে মানুষ মনে রাখবে তাঁর কান্নাভরা কণ্ঠে সেই কথা বলা নিয়ে " পানি লাগবে পানি"। সেদিন আপুর ছল ছল চোখ যে একবার দেখেছিলেন কেয়ামত পর্যন্ত তিনি আপুকে মনে রাখবেন। রুকসানা নিকোল আপুকে বাকিদের তুলনায় একটু আলাদা বলে মনে হয়েছিল কারণ তিনি কোনো এক বিজয় দিবসে বলেছিলেন : "বিজয়ের মাসে শেখ মুজিবকে জামায়াত নেতার অপমানের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।" সেই নিকোল আপুকে এখন হাম নিয়ে টকশো করতে দেখা যাচ্ছে না। তিনি কি দেশে না বিদেশে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। তাহলে হয়তো উনার চোখের জল আবার আমরা দেখার সুযোগ পেতাম।

আসলে যুগের পর যুগ এই একটা জিনিসই দেখে আসছি। যখনই দেশে কোনো ক্রান্তিকাল আসে, তখনই কিছু অতি-মানবিক মানুষ আমাদের উদ্ধার করতে অবতীর্ণ হন। জনগণের সমস্যা নিয়ে তাঁদের সেই বুকফাঁটা আর্তনাদ আর চোখের জল দেখে আমাদের মতো আমজনতাও আবেগে গদগদ হয়ে ভাবে : আহা, দুনিয়ায় এখনো এত ভালো মানুষ বেঁচে আছে ! কিন্তু আসল টুইস্টটা বোঝা যায় ক্ষমতার চাকাটা একটু ঘোরার পর। তখন দেখা যায়, জনগণের পক্ষে গলা ফাটানোর ‘ন্যায্য পারিশ্রমিক’ হিসেবে এঁরা একেকজন বড় বড় পদ, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা আর ক্ষমতার মধুর ভাগ পাচ্ছেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই মৌসুমী পাখিদের চেনার কোনো চশমা সাধারণ জনগণের কাছে নেই।

এঁরা ঠিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অতি-নিরপেক্ষ উপাচার্য নিয়াজ স্যারের মতো রূপ ধরে আমাদের কাছে আসেন। যিনি ডাকসু নির্বাচনে এক জাদুকরী ফলাফল উপহার দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নিলেন, আর এখন ডক্টর ইউনূসের গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত সদস্য পদ আলো করে বসে আছেন। বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম , ইউনূস সাহেবও তো একদা আমাদের শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে উদ্ধার করতে ত্রাণকর্তা হিসাবে এসেছিলেন।






সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০২৬ রাত ৩:৩৫
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অর্ধগলিত মাথার রহস্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:০৩

মুগদা থানার সামনে তখনো ভোরের কুয়াশা ঝুলে আছে। পিবিআই-এর ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান পুলিশের জিপ থেকে নামতেই বাতাসে একটা চেনা গন্ধ ভেসে এল—ভেজা মাটি আর পুরোনো ড্রেনের গন্ধ

রাস্তায় ওপাশে ওয়াপদা কোয়ার্টারের ম্রিয়মাণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাদ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিৎ

লিখেছেন সামিউল ইসলাম বাবু, ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:৩৫

এই সংবাদ কি সরকার দেখেনা?
অথচ ১৩সালের দিকে ইউরোপে বাংলাদেশ চিংড়ি পাঠাতো। সেখানে হালকা শিসা থাকায় আর কোন প্রকার মাছ ওই দেশে আর নেয়না। সমস্ত চুক্তি বাতিল।

অনেক দেশ আছে যেখানে খাদ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দরখাস্তটা দোলে নিমডালে

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:১৭



তোমার বাড়ির দরজা খোলা
অথচ প্রবেশ নিষেধ আমার...
দরখাস্তটা ঝুলে আছে নিম ডালে
বাতাসে ভাসে
আন্নাকে সাথে নিয়ে ঘুমাতে যাও...
নিম ডালে দোলে বিষণ্ণতা, হাহাকার এক বুক—
তোমার বিছানা জুড়ে তলস্তয়, আন্না কারেনিনা।

গল্পের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল.........

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৯ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৫


পুকুরের টলটলে জলে যখন বড় বড় লাল শাপলা ফুটে থাকে, তখন সেটি দেখতে এতোটাই সুন্দর লাগেযে তাতে মন উদাস হয়ে যায়। মন চায় জলে নেমে তুলে নিয়ে আসি কয়েকটি। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

UAE প্রতিষ্ঠানকে বর্জন করা হোক.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৩

চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে UAE এর DP WOARLD এবং KSA এর RSGT এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান MGH GROUP উল্লেখ্য দুইটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের চাইতে বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×