somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অর্ধগলিত মাথার রহস্য

১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুগদা থানার সামনে তখনো ভোরের কুয়াশা ঝুলে আছে। পিবিআই-এর ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান পুলিশের জিপ থেকে নামতেই বাতাসে একটা চেনা গন্ধ ভেসে এল—ভেজা মাটি আর পুরোনো ড্রেনের গন্ধ

রাস্তায় ওপাশে ওয়াপদা কোয়ার্টারের ম্রিয়মাণ ভবনগুলো আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। বহুবছর আগে আরিয়ান এখানে নিয়মিত আসতেন তাঁর খালার বাসায়। তখন এই রাস্তাগুলো কত বড় লাগত! বিকেলে বন্ধু সজীবের সাথে মান্ডার গলিতে ক্রিকেট খেলতেন তিনি। আজ সেই সজীব কানাডায়, আর আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছেন একই গলির মুখে—হাতে একটা ক্রাইম সিন ফাইল নিয়ে।

জীবন মানুষকে কত অদ্ভুত দূরত্বে এনে দাঁড় করায়।

স্যার, লোকেশন সিল করা হয়েছে,” এসআই তানভীরের ডাকে আরিয়ান বর্তমানে ফিরলেন। “মাথাটা মানিকনগরের এই গলি থেকে উদ্ধার হয়েছে। আর গতকাল মান্ডার বেজমেন্ট থেকে পাওয়া সাত টুকরো মরদেহ সম্ভবত একই ব্যক্তির।

আরিয়ান ধীরে চশমাটা চোখে পরলেন। নস্টালজিয়া ঝেড়ে ফেলে তাঁর চোখ দুটো আবার পাথরের মতো ঠাণ্ডা হয়ে উঠল। তিনি মানিকনগরের সরু গলির ভেতরে ঢুকলেন। একটা কালো পলিথিনের পাশে শুকনো রক্তের দাগ।

আরিয়ান হাঁটু গেড়ে বসলেন। পলিথিনের ভেতরে থাকা মাথাটা পচনধরা, বিকৃত মুখমণ্ডল চেনার উপায় নেই। কিন্তু তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে মাথার দুপাশের গভীর কাটার দাগগুলো দেখলেন।

তানভীর, খুনি মানুষ কাটতে অভ্যস্ত নয়,” আরিয়ান শান্ত গলায় বললেন। “দাগগুলো অসমান। অন্তত তিন থেকে চারবার আঘাত করা হয়েছে। এটা কোনো পেশাদার কিলারের কাজ নয়। এটা রাগ, আতঙ্ক আর তাড়াহুড়োর মিশ্রণ। খুনি এই গলিটা চেনে, সে জানত রাত দুইটার পর এখানে কেউ থাকে না।”

দুপুরের দিকে তাঁরা যখন মান্ডার শাহনাজ ভিলার বেজমেন্টে পৌঁছালেন, তখনো গলতে থাকা দেহাংশের কটু গন্ধ বাতাস ভারী করে রেখেছিল। বেজমেন্টের এক কোণে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল। তার ওপর শুকনো সাদা গুঁড়ো। আরিয়ান আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে গন্ধ নিলেন, “ব্লিচিং পাউডারকিন্তু এত অল্প ব্লিচিং পাউডার দুর্গন্ধ ঢাকার জন্য যথেষ্ট নয়, তানভীর। এটা ব্যবহার করা হয়েছে রক্ত পরিষ্কার করতে। এখানে কোনো রক্তের স্প্ল্যাটার (Splatter) নেই। খুনটা এখানে হয়নি। অন্য কোথাও কেটে লাশ এখানে এনে রাখা হয়েছে।

তানভীর একটু ইতস্তত করে বলল, “স্যার, লোকাল সোর্সদের দাবি—মান্ডার স্থানীয় দুটো গ্যাংয়ের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে ঝামেলা চলছিল। ড্রাগ ডিলিংয়ের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে এটা কোনো গ্যাং ওয়ারের ফল হতে পারে না?

না, তানভীর,” আরিয়ান মাথা নাড়লেন। “গ্যাং কিলাররা ভয় দেখানোর জন্য লাশ প্রকাশ্যে ফেলে রাখে, পরিচয় লুকায় না। এখানে মাথা আর শরীর আলাদা আলাদা দুর্গম জায়গায় লুকিয়ে ফেলার মরিয়া চেষ্টা করা হয়েছে। এটা গ্যাং কিলিংয়ের ‘ফলস লিড’। আসল অপরাধী স্রেফ পুলিশের চোখকে বিভ্রান্ত করতে এই গ্যাং ওয়ারের আবহটা তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটা চরম ব্যক্তিগত কোনো আতঙ্ক থেকে করা খুন। খুনি কাছাকাছি কোথাও লাশের টুকরোগুলো কেটে কোনো হ্যান্ড ট্রলিতে করে এখানে এনেছে।

বিকেলে মুগদা থানার একটি কক্ষে বসে আরিয়ান যখন ম্যাপ দেখছিলেন, তখন কনস্টেবল এসে জানাল, মান্ডা এলাকার এক ভাড়াটিয়া গত চারদিন ধরে নিখোঁজ—নাম সোহেল রানা, পেশায় ফ্রিজ ও এয়ারকন্ডিশন মেকানিক।

ফ্রিজ মেকানিক...

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখের পলক পড়ল না, যেন ঘরের বাইরের চেনা কোয়ার্টারের মাঠটা তাঁর অবচেতন মন থেকে পুরোপুরি মুছে গেল। তারপর তিনি ধীরে মাথা তুললেন।

তানভীর, আমরা খুনির খুব কাছে চলে এসেছি।

এক ঘণ্টা পর তাঁরা পৌঁছালেন সোহেলের সেই বন্ধ ভাড়া বাসায়। ঘরটি তল্লাশি করার সময় আরিয়ানের চোখ থামল রান্নাঘরের পাশে রাখা একটা বড় ডিপ ফ্রিজে। ফ্রিজটা প্লাগ-হীন, কিন্তু ভেতরে হালকা রক্তের দাগ।

আরিয়ান নিচু হয়ে ফ্রিজের নিচে হাত বাড়ালেন। একটা ছোট্ট ধাতব ট্যাগ পড়ে আছে সেখানে, তাতে লেখা: R.R. Engineering Workshop। কিন্তু আরিয়ানের চোখ তখন ভিকটিমের রেখে যাওয়া টুলবক্সের দিকে। তিনি সোহেলের একটা পুরোনো ছবি হাতে নিলেন। ছবিতে সোহেলের ডান হাতের তর্জনীতে একটা শক্ত কড়া দাগ স্পষ্ট।

তানভীর,” আরিয়ান ফিসফিস করে বললেন, “মানুষ ভাবে শরীর টুকরো করলে পরিচয় মুছে যায়। আসলে মানুষের পেশা আর অভ্যাসই তাকে চিনিয়ে দেয়। ফ্রিজ মেকানিকরা স্ক্রু-ড্রাইভার চেপে ধরতে ধরতে ওই কড়া তৈরি করে। আর বডি পার্টস কাটার জন্য যে বড় মেশিন লেগেছে, তা এই ওয়ার্কশপেই আছে।

সন্ধ্যায় আরআর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক রুবেলকে যখন পিবিআই অফিসে আনা হলো, সে তখন টেবিলে দুহাত রেখে স্বাভাবিক ভাবে বসার চেষ্টা করছিল।

আরিয়ান ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকে কোনো কথা না বলে রুবেলের মুখোমুখি বসলেন। রুবেল প্রথমে একটা শুষ্ক হাসির চেষ্টা করল, কিন্তু টেবিলের ওপর রাখা তার ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মৃদু কাঁপুনি আরিয়ানের চোখ এড়ালো না।

আরিয়ান শান্তভাবে টেবিলের ওপর সেই ধাতব ট্যাগ আর সিসিটিভি ফুটেজের স্ক্রিনশটটা রাখলেন, যেখানে রাত দুইটায় একটা হ্যান্ড ট্রলি ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে একজনকে।

সোহেল তোমার বন্ধু ছিল, রুবেল,” আরিয়ান শান্ত কিন্তু ভারী গলায় বললেন। “তোমরা একসাথে কাজ করতে। তিন লাখ টাকা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় তুমি ওকে শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিলে, তাই না? কিন্তু রাগের মাথায় ভারী রেঞ্চের আঘাতটা বেশি জোরে হয়ে যায়।

রুবেল ঢোক গিলে বলল, “আমি এসবের কিছু জানি না স্যার। ও তো চারদিন আগে ঢাকা ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে।

ও ঢাকা ছাড়েনি রুবেল, ওর শরীরটা খণ্ড খণ্ড করে ঢাকার দুটো গলিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে,” আরিয়ান আরও একটু ঝুঁকে এলেন। “মাথার আঘাতের পর তুমি প্যানিক করো। লাশ লুকানোর জন্য নিজের ওয়ার্কশপের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাটার মেশিনটা ব্যবহার করো। কাজটা করার সময় তোমার হাত কাঁপছিল রুবেল, তাই কাটার ব্লেডের দাগগুলো এত অসমান হয়েছে। আমাদের টিম আজ বিকেলে তোমার ওয়ার্কশপ সিল করেছে। কাটার মেশিনটার ভেতরের ব্লেডে তখনো শুকনো বাদামি রঙের রক্তের দাগ লেগে ছিল।

রুবেলের মুখের শেষ রক্তবিন্দু যেন শুষে নিল কেউ। তার কপালের চামড়া কুঁচকে গেল, চোখের মণি কাঁপতে লাগল তীব্র আতঙ্কে। সে মুখ খোলার আগেই আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম নিচু স্বরে শেষ মনস্তাত্ত্বিক আঘাতটি করলেন:

তুমি লাশ কেটেছ রুবেল, কিন্তু ভয়টা কাটতে পারোনি। তাই মাথাটা আলাদা জায়গায় ফেলেও রাতে ঘুমাতে পারছিলে না। চোখ বন্ধ করলেই সোহেলকে দেখতে পাচ্ছ, তাই না?

রুবেল আর সেই সর্বগ্রাসী মনস্তাত্ত্বিক চাপ নিতে পারল না। তার সমস্ত প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল সে, “আমি ওকে সত্যি মারতে চাইনি স্যার... ও টাকা নিয়ে আমাকে জেলে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছিল... আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম স্যার...

তানভীর ডায়েরির পাতা বন্ধ করে আরিয়ানের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে গভীর শ্রদ্ধা। “স্যার, কনফেশন রেকর্ড করা হয়েছে। সব উত্তর পাওয়া গেছে।

থানার বাইরে তখন গভীর রাত। মুগদার ভেজা পিচঢালা রাস্তায় স্ট্রিট লাইটের আলো এসে পড়েছে। দূরে ওয়াপদা কোয়ার্টারের পুরোনো ভবনগুলো অন্ধকারের মাঝে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে।

তানভীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, এত বছর পর নিজের ছেলেবেলার এলাকায় এসে তদন্ত করতে কেমন লাগল?

আরিয়ান চশমাটা পকেটে রাখতে রাখতে বহুদূরের অন্ধকার মাঠটার দিকে তাকালেন। তারপর ধীর স্বরে বললেন, “ছোটবেলায় মনে হতো এই চেনা শহরটা কত নিরাপদ, মানুষজন কত সরল। এখন বুঝি, শহর আসলে বদলায় না তানভীর... বদলায় মানুষের ভেতরের অন্ধকারের পরিমাপটা।”

আরিয়ান কোটের কলারটা তুলে দিয়ে ভেজা রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। বাইরে তখনো হালকা কুয়াশা জমছিল; শৈশবের পরিচিত গলিগুলো আজ আরিয়ানকে আর স্মৃতি নয়, শুধু মানুষের ভেতরের জঘন্য অন্ধকারটাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:০৩
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জীবনের গল্প- ১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০



১। একজন মা (কোহিনূর) সারারাত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকেন।
কারণ কেউ একজন এসে তাকে বস্তা ভরতি টাকা দিয়ে যাবে। গতকাল রাতের কথা। আমার বাসায় ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪০



নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলেছি।
ঊর্ধ্বলোক আর নিম্নের অতল অন্ধকার কোন জায়গায়,
সে নিয়ে আর চিন্তা কি!

প্রিয়ার আহবানে আমরা কতো কিছুই না করি!
এবারে প্রিয়ার আহবানে দিক-শূন্যই নাহয় হলাম!... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিকারকে নিরপেক্ষ হতেই হবে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৭

স্পিকারকে নিরপেক্ষ হতেই হবে....

দুইদিন আগে সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চের একজন সদস্যের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের তীব্র আপত্তি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এমন অবস্থায় ডেপুটি স্পিকার অত্যন্ত দৃঢ়তা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×