
রাড্ডা হাসপাতালে লুটপাট
ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে রাড্ডা ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে গেছে! গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে ১৫০-২০০ জন দুর্বৃত্ত রাড্ডা ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়েছে-সংখ্যাটা মনে রাখার চেষ্টা করুন। রাড্ডা ক্লিনিকের যাবতীয় মালামাল ট্রাকে ভরে লুট করে নিয়ে গেছে। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, তারা শিশুদের টিকাদানের খাতা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি করার জন্য নিয়ে গেছে !
আমার মা যখন এই নিউজ দেখলেন, তখন পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেলেন এবং সাথে সাথে আমাকে ফোন করে বললেন, "দেখেছিস রাড্ডার কী অবস্থা করেছে?" মা ভেবেছিলেন এটা মিরপুর ১০-এর রাড্ডা শাখা। পরে আমি বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম। মা তখন বললেন, "যাই হোক, যারা এই লুটপাট করতে গিয়েছিল, তারা গাবুর ছাড়া আর কিছুই না ! এরা কোনো দিন হাসপাতালে যায়নি, এসব গাবুরের কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয় না; বাচ্চা হলেও কোনো দিন ক্লিনিকে টিকা দিতে যায় না, নিজেরাও কোনো দিন টিকা নেয়নি। তাই এমন প্রতিবন্ধী হয়েছে !"
মায়ের এমন আক্রোশের কারণ আমি জানি। জোর করে কারো জমি দখল করা হলে সেটার বেদনা কেমন, তা আমার পরিবার ভালোভাবেই বোঝে। আর এটা তো একটা ক্লিনিকের জমি দখলের ঘটনা, যা আরও বেশি গুরুতর। কয়েকটি টিভি চ্যানেলে নিউজ দেখে বুঝতে পারলাম, বর্তমান সরকারের এক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যের ঘটনার সাথে সংযোগ রয়েছে।
পুরো বাংলাদেশে যেন একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দেখলাম সরকারের টনক কিছুটা নড়েছে; ডিএনসিসির উত্তর প্রশাসক, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ আরও অনেকে পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছেন। তবে যতটুকু বুঝলাম, এই জমির কাগজপত্রে ঝামেলা আছে। সবাই নিশ্চিত থাকতে পারেন, আজ অথবা কাল এই জায়গায় আর রাড্ডা ক্লিনিক থাকবে না। ছলে-বলে-কৌশলে এই জমি দখল করে নেওয়া হবে। মামলা চলবে বছরের পর বছর, তারপর একদিন রায় চলে যাবে প্রভাবশালীদের পক্ষেই।
মোহাম্মদপুরে জমি দখলের চেষ্টা
রাড্ডার ঘটনার রেশ না কাটতে কাটতে মোহাম্মদপুর, আদাবর থেকে একই প্যাটার্নের ঘটনার খবর এল। সেখানেও ১৫০-২০০ জনের একটা দল ট্রাক ভাড়া করে জমি দখল করতে গিয়েছিল। সেই জমির কাগজপত্রেও ঝামেলা রয়েছে, যেখানে এখন শপিংমল তৈরি হচ্ছে।
লক্ষ্য করলে দেখা যায় , সেখানেও লোকসংখ্যা এবং জমি দখলের পদ্ধতির সাথে রাড্ডার ঘটনার মিল রয়েছে। তবে এই ঘটনার সাথে রাড্ডার মূল পার্থক্য হলো-এখানে কোনো সরকারদলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির জড়িত থাকার কথা শোনা যায়নি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে একই রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সবাই সন্দেহ করছে, এসব ঘটনার নেপথ্যে সরকারি দলের 'সোনার ছেলেরা'ই জড়িত।
সালমান দ্য ব্রাউনফিশের স্টুডিও ভাঙচুর
বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশনের পথকৃৎ সালমান মুক্তাদির ওরফে ব্রাউনফিশের ইসিবি চত্বরের স্টুডিওতে গতকাল রাতে তাণ্ডব ও লুটপাট চালানো হয়েছে। সালমান মিয়া লাইভ ভিডিওতে প্রথমবার দেওয়া বয়ানে সরকারদলীয় লোকজনের জড়িত থাকার কথা বললেও পরে অবশ্য তার বয়ান পরিবর্তন করে ফেলে। মূলত যে প্রপার্টিতে সালমানের স্টুডিওটি ছিল, সেটি নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং সেটি কোনো এক ভূমিখেকো চক্রের নজরে পড়ে গেছে।
এখানেও একটি কমন ঘটনা হলো- ট্রাকে করে প্রায় ১৫০-২৫০ জনের একটি দল সালমানের স্টুডিওতে এসে তাণ্ডব চালায়। পুলিশ তদন্ত করে জানিয়েছে, এর পেছনে কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা নেই; জমি দখল নিয়েই বিরোধের জেরে এটি ঘটেছে। তবে যা ঘটার তা তো ঘটে গেছে !
সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে যে, এটাও সরকারি দলের লোকজনেরই কাজ। সালমানের মুখের প্রাথমিক বয়ান এই সন্দেহকে আরও জোরালো করে তুলেছে। কারণ, সালমান নিজে ভিক্টিম, সে তো আর মিথ্যে বলবে না! সবাই বলাবলি শুরু করে দিয়েছে-যদি প্রধানমন্ত্রীর আসনে এভাবে তাণ্ডব চালানো যায়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি থেকে জমি দখলের দিকে মোড় নিলেও মানুষের মনের আগের রেশ কাটেনি। এর জন্য দায়ী কে? অবশ্যই সরকারকে এর দায় নিতে হবে। তারা যদি রাড্ডার ঘটনার পরপরই কঠোর ব্যবস্থা নিত, তবে বাকি ঘটনাগুলো ঘটার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যেত। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে বলে Copycat Crime । অপরাধের বিচার না হওয়ায় সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বেড়ে যায়, আর মানুষ তখন বলতে শুরু করে—"যাই কিছু চুরি যাক, দোষ সব কেষ্টা বেটার !"
কপি-ক্যাটের মতো এমন ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত Horn Effect-এর জন্ম দেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, হর্ন ইফেক্ট হলো এমন এক প্রবণতা, যেখানে একজনের কোনো একটি নেতিবাচক ঘটনায় দোষ পাওয়ার পর বাকি সব ঘটনার দায়ভারও তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। রাড্ডার ঘটনার কারণে মানুষ একটা সাধারণ অপরাধী চক্রকে খুঁজছিল, আর সালমান দি ব্রাউনফিশের প্রাথমিক বয়ানে সরকার দলীয় লোকজনের নাম আসায় সবার ধারণার সাথে তা মিলে গেল।
কারো ঘর পোড়ে, কেউ আলু পোড়া খায়
রাড্ডার ঘটনায় কপাল খুলে গেছে এনসিপির আসিফ মাহমুদের ! ভাইটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে রাড্ডায় গিয়ে জমি দখলের উদ্দেশ্যে টাঙানো সাইনবোর্ড খুলে ফেলে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষ কি ভুলে গেছে যে এই ভাইটি ধানমন্ডি ৩২ নিয়ে কী কী কাণ্ড ঘটিয়েছিল ? তার এমন কর্মকাণ্ড তরুণ প্রজন্মের মাথা হেঁট করে দিয়েছে। এর ওপর আবার মাত্র দুই বছরের মাথায় তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে!
এমনই আরেক চরিত্র হলো সালাউদ্দীন আম্মার, যে একজন মবস্টার হিসেবে বেশ সুপরিচিত। সরকারি চাকরিতে নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে সে বেশ জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে। এই মবস্টার এবং অভিযুক্ত আসিফ এখন অতিমাত্রায় প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। সমস্যা হয়েছে কি, এতে তারা তরুণ প্রজন্মের বেশ ভালোই সমর্থন পাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কারণ, দেশের তরুণ সমাজ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে এতটাই হতাশ যে, সামান্য একটু ভালো কাজ দেখলেই তারা অন্ধের মতো সমর্থন দেওয়া শুরু করে দেয়।
ফটোকার্ড ক্রেডিট: আসিফ মাহমুদের ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




