somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোকো'র চলে যাওয়া =

১০ ই অক্টোবর, ২০২০ ভোর ৪:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পোকো'র চলে যাওয়া =

এডমন্টন শহরে আমাদের পাশের বাসার কুকুরটির নাম পোকো। বর্তমান বাসায় আমরা সাতবছর ধরে আছি। তার মানে, পোকোকেও দেখছি সাত বছর। এই সাত বছরে পোকোর তেমন পরিবর্তন দেখিনি।

প্রতিবেশী ভদ্রমহিলার নাম বনি ব্ল্যাসিক। ইউক্রেন হতে অনেক বছর আগে তাঁর বাবা-মা কানাডায় এসেছিলেন। বনির জন্ম এখানেই। এ শহরের সিটি অফিসের একাউন্টস সেকশনের হেড হিসেবে অবসরে গেছেন বছর দুয়েক হলো। সে হিসেবে বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তাঁর স্বামী মারা গেছেন প্রায় বারো বছর। ক্যান্সারে প্রাণ হারিয়েছেন ভদ্রলোক। ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। মারা যাবার বছর চারেক আগে পোকোকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের বেবী হিসেবে তিনি কিনেছিলেন। সে কারণে পোকো'র মাঝে প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিও খুঁজে ফেরেন বনি।
রোজ সকাল আর বিকেলে পোকোকে নিয়ে বনি হাঁটতে বের হন। ঘন্টাখানেক ঘোরাফেরা করে বাসায় ফেরেন। বনির হাতে থাকে কয়েকটি প্লাস্টিক ব্যাগ। মাঝেমাঝে কোমরেও গুঁজিয়ে রাখেন। রাস্তার ধারে কোনো কারণে পোকো বাথরুম সারলে প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে নেন বনি। তারপর কাছাকাছি কোথাও ডাস্টবিন দেখলে তাতে ছুঁড়ে ফেলেন। এটাই এ দেশের নিয়ম।

পোকোর গলায় ছোট একটি বেল্টের সাথে রশি বাঁধা থাকে। রাশির অপরপ্রান্ত থাকে বনির কোমরের বেল্টে গোঁজা। নিত্যদিন এ দৃশ্য দেখে দেখে আমরা বেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বনির এক ছেলে, দু'মেয়ে। তারা সবাই এডাল্ট হয়ে যে যার মতো আলাদা থাকে। কালেভদ্রে মায়ের সাথে দেখা করে আবার চলে যায়। পোকো-ই এখন বনির সবসময়ের সাথী; পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
কাল বিকেলে দেখলাম বনি পোকোকে কাঁধে করে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছেন। ডান হাতে পোকো, আর বাম হাতে টিস্যু পেপারে চোখ মুছছেন। পোকোর চোখ দুটো আধখোলা, ভেজা; নির্দিষ্ট করে কোনো কিছুর দিকে তাকাচ্ছে বলেও মনে হলো না। গ্রামগঞ্জে বাউল সাধকরা যেমন একতারা হাতে গান গাইতে গাইতে লক্ষ্যহীনভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন, অনেকটা সে ভঙ্গিতেই পোকোর চোখজোড়া। পৃথিবীতে যা দেখার সে যেন দেখে ফেলেছে, যা জানার জেনে ফেলেছে।

বনি যাচ্ছিলেন বাসার বাইরে, আর, আমি আমাদের বাসায় ঢুকছিলাম। ড্রাইভওয়েতে চোখাচোখি হতেই জানতে চাইলাম পোকো অসুস্থ কিনা। হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে বনি জানালেন, পোকোর বয়স এখন ষোলো চলছে। এই জাতের কুকুর সচরাচর চৌদ্দ-পনেরো বছর বাঁচে। গতরাতে পোকোর খুব সম্ভবতঃ স্ট্রোক করেছে। সে দাঁড়াতে পারছে না। তাই, ভেটের (পশু চিকিৎসক) কাছে নিয়ে যাচ্ছেন ওকে।

জানতে চাইলাম, ভেট কি পোকোকে সুস্থ করে তুলতে পারবেন?

- না, ওর বয়স হয়ে গেছে, কিছুটা সুস্থ হলেও কষ্ট পেয়ে ধুঁকেধুঁকে মারা যাবে।
তাহলে এখন উপায়?

- উপায় কিছু নেই। ভেটের কাছে রেখে আসবো। তারাই তার শান্তিপূর্ণ মরণ নিশ্চিত করে বডি ডিসপোজ করবে। কথাটা বলতেই তিনি আরেকবার চোখ মুছলেন। তাঁকে নতুন প্রশ্ন করে আর কষ্ট দিলাম না।

পোকোকে আর দেখবো না ভেবে আমার বুকটাও ভারী হয়ে গেলো। এর আগে কোন কুকুরের মৃত্যু নিয়ে এতটা গভীর করে ভেবেছি মনে পড়ে না। দরজার কাছে উদ্ভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে বনির কাঁধে চড়া পোকোর চলে যাওয়া দেখছি।

আমার ঠিক সামনেই আমাদের বাসার যে আপেল গাছ, তার পাতাগুলোর বেশির ভাগই বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়েছে মাটিতে। ঘাসের সবুজ রঙও বিলীন হয়েছে ঝরে পড়া পাতায়। পোকোরা আমার কেউ না; তারপরও, পত্রহীন আপেল গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে যতটা পারি দেখার চেষ্টা করি পোকোর শেষযাত্রা। [email protected]

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০২০ ভোর ৪:৩৯
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেমোরি লুপ (Memory Loop)

লিখেছেন চারাগাছ, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৪




মেমোরি লুপ (Memory Loop)

​গভীর রাত। ল্যাবের নিস্তব্ধতা চিরে শুধু ভেসে আসছে মনিটরের নীলচে আলোর মৃদু কম্পন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছেন ডা. আরিয়ান। স্ক্রিনে ভাসছে তার বহু বছরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মেসি’ নামক মুগ্ধতা

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪২


লিওনেল, রোজারিও থেকে ঢাকা । বার্লিন থেকে নিউইয়র্ক । ২০০৬ থেকে ২০২৬ । উড়ন্ত কৈশোর থেকে পড়ন্ত যৌবন । ফুটবল পায়ে তোমার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে আমরা ছিলাম । আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জন্য ৭-গ্রেডভিত্তিক ন্যায়সংগত সরকারি বেতন ও প্রশাসনিক সংস্কার একটি প্রস্তাবিত নীতিপত্র

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, বেতন বৈষম্য হ্রাস, মেধার মূল্যায়ন এবং দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত প্রস্তাব

বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ২০টি গ্রেডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভেবেছিলাম দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুlie ২৪ আন্দোলন পরবর্তী বৈষম্যহীন বাংলায় (যেহেতু বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই), বেসরকারী ও সরকারী কর্মজীবীর জীবন...

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২১

/বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের মধ্যে সরকারী আর বেসরকারী কত শতাংশ?

/গত ২ বছরে যত শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং তাতে যত সংখ্যক বেসরকারী কর্মজীবী (কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক….) চাকরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×