somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেমোরি লুপ (Memory Loop)

৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মেমোরি লুপ (Memory Loop)

​গভীর রাত। ল্যাবের নিস্তব্ধতা চিরে শুধু ভেসে আসছে মনিটরের নীলচে আলোর মৃদু কম্পন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছেন ডা. আরিয়ান। স্ক্রিনে ভাসছে তার বহু বছরের সাধনার ফসল 'প্রজেক্ট নিও-মেমোরি'-র শেষ ট্রায়াল রিপোর্ট। মানবমস্তিষ্ক থেকে বিষাদময় বা ভয়াবহ স্মৃতি চিরতরে মুছে ফেলার এক অনবদ্য প্রযুক্তি। এই গবেষণার মূল কারিগর তিনি নিজেই, আর তার প্রথম টেস্ট সাবজেক্ট ছিলেন তার নিজের স্ত্রী, মেঘা।

​গত বছর এক বিভীষিকাময় সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের একমাত্র সন্তান তূর্ণা মারা যায়। সেই মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে মেঘা যখন প্রায় উন্মাদ, তখন আরিয়ান নিজের তৈরি প্রোটোটাইপ মেশিনের ওপর ভরসা করে মেঘার স্মৃতি থেকে তূর্ণার মৃত্যুর দৃশ্যটুকু মুছে দিয়েছিলেন।
​কিন্তু আজ স্ক্রিনের নীল গ্রাফ দেখে আরিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ডাটা স্পষ্ট বলছে—স্মৃতি মোছার প্রক্রিয়াটি সফল হয়নি! বরং নিউরনগুলোর ভেতরে তৈরি হয়েছে এক অসীম ঘূর্ণাবর্ত... এক 'ইনফিনিট লুপ'। মেঘার মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট একটি মুহূর্তের স্মৃতি বারবার রি-প্লে করে চলেছে।
​ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা চিরে বেজে উঠল ল্যাবের ল্যান্ডফোনটা। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ৩টা ১৫ মিনিট।

​ক্লান্ত হাতে রিসিভারটা তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল মেঘার ব্যাকুল কণ্ঠ—
​"আরিয়ান! তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি ঘরে এসো না! আমাদের মেয়েটা যে বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে... অত রাতে ওর ঠান্ডা লেগে যাবে তো!"
​আরিয়ানের শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমের স্রোত নেমে গেল। অবিকল এই কথাটি, ঠিক এই ৩টা ১৫ মিনিটেই ও গত কয়েকদিন ধরে শুনে আসছে! আরিয়ানের দৃষ্টি গেল দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে—নষ্ট হয়ে যাওয়া কাঁটাটা অচল পাথরের মতো ৩টা ১৫ মিনিটেই আটকে আছে।

​দরজায় ভারী টোকা পড়ল।
​ল্যাবের শব্দহীন স্টিলের ভারী দরজাটা খুব ধীরে খুলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মেঘা। তার পরনে সেই এক বছর আগের দুর্ঘটনার রাতের রক্তমাখা শাড়িটা। মেঘার চোখে চরম আতঙ্ক, কিন্তু তার চেয়েও অপার্থিব দৃশ্য হলো—মেঘার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মৃত মেয়ে তূর্ণা!
​তূর্ণা বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসছে, হাত নাড়ছে।
​"তুমি আসছ না কেন, বাবা?" —তূর্ণার নিষ্পাপ কণ্ঠধ্বনি যেন বাতাস ভেদ করে ভেসে এল।

​আরিয়ান স্তম্ভিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বুকের ভিতরটা খালি হয়ে আসছে। তিনি চমকে উঠে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকালেন—কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, অথচ আঙুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাজা লাল রক্ত!
​ঠিক সেই মুহূর্তে স্মৃতির সব কুয়াশা কেটে বেরিয়ে এল নির্মম আসল সত্য।

​মেঘা কখনো টেস্ট সাবজেক্ট ছিলই না!

​এক বছর আগের সেই রাত ৩টা ১৫ মিনিটে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল এই ল্যাবেই। 'নিও-মেমোরি'র অতিরিক্ত রেডিয়েশনে ঘটেছিল এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সেদিন তূর্ণা মারা যায়নি... মারা গিয়েছিল মেঘা!

​নিজের চোখের সামনে স্ত্রীর সেই বীভৎস মৃত্যু আর অপরাধবোধ সহ্য করতে না পেরে আরিয়ান নিজেই নিজের মস্তিষ্কে চালিয়েছিলেন নিও-মেমোরির প্রোটোটাইপ। তিনি মেঘার মৃত্যু আর অপরাধবোধ মুছে ফেলতে গিয়ে নিজের স্মৃতিতেই তৈরি করেছিলেন এক কৃত্রিম মায়াজাল—যেখানে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন মেঘা বেঁচে আছে, আর তূর্ণা মারা গেছে!
​"আরিয়ান..."
​মেঘার বরফের মতো ঠান্ডা হাত দুটো স্পর্শ করল আরিয়ানের কাঁধ। ফিসফিস করে মেঘা বলল,
​"তুমি আর কতবার এই মেশিনটা রিসেট করবে বলতো? প্রতিবারই তো তুমি ভুলে যাও... আমরা কেউ আর বেঁচে নেই।"
​হঠাৎ দেওয়ালের অচল ঘড়িটা কড়কড় শব্দে সচল হয়ে উঠল। কাঁটাটা সরে গিয়ে বাজল ৩টা ১৬ মিনিট।

​ল্যাবের দেওয়ালগুলো মোমের মতো গলতে শুরু করল, আর বাতাসে ভেসে এল সেই এক বছর আগের বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। আরিয়ান বুঝতে পারলেন, এই মায়াজাল থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথ নেই। তিনি নিজেই নিজের তৈরি করা এক অনন্ত স্মৃতির চক্রে চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে গেছেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যাটারিচালিত রিকশা , তিন-চাকার যানবাহন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষা এবং সিসা-দূষণরোধ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮


বাংলাদেশের নগর ও শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি-বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন-চাকার যান ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচের পরিবহন, বিপুলসংখ্যক চালক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×