somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৃহন্নলা-কথন

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে আমাদের প্রধানত দুইটি জাতি হিসেবে পাঠিয়েছেন- নর ও নারী। কিন্তু রহস্যময় তিনিই আরো এক গোষ্ঠীকে আমাদের সাথেই এই ধরণীতে পাঠিয়েছেন, যাকে আমরা চিনি সাধারণত তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে, শুদ্ধ বাংলায় যাদেরকে বলা হয় ‘বৃহন্নলা’। এই সুন্দর পৃথিবীতে আগমনের প্রক্রিয়া- নারী, পুরুষ কিংবা এই বৃহন্নলা গোষ্ঠীর- সম্পূর্ণ একই। সেই একই মাতৃজঠর। আমাদের নারী ও পুরুষ- প্রত্যেকের যেমন বাবা-মা রয়েছেন, তেমন এই বৃহন্নলা গোষ্ঠীও কিন্তু দুটি মানুষের মাধ্যমেই এসেছেন, যারাও বাবা এবং মা।

কিন্তু অদ্ভুত লাগে! একই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি আমরা। সবাই মানুষ। কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রা কতটাই না ভিন্ন। প্রত্যেকটি নারী ও পুরুষ সমাজে বেড়ে উঠছে, পড়াশোনা শিখছে, চাকরি-বাকরি করছে....এরপর ঘর-সংসার, সন্তান......সবই চক্রাকারে একইভাবে যুগের পর যুগ ধরে হয়ে আসছে। কিন্তু আমাদেরই মানবগোষ্ঠীর আরেকটা অংশ- বৃহন্নলাগোষ্ঠী? তারা একটা আলাদা সমাজের বাসিন্দা। তারা একটা আলাদা জীবনের স্বত্ত্বাধিকারী।

ছোট থেকেই চলতে ফিরতে এদের দেখা পাই। একটা সময় ছিল.....এদের দেখলে আমার কেমন বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করত। কখন কোথায় কিভাবে পালিয়ে বাঁচব এই ভাবতে ভাবতে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত প্রায়। আবার এরা সামনে পরলে সামনে বা পেছনে ছুটে দৌড় দেওয়ারও সাহস পেতাম না। যদি উল্টোপাল্টা বলে? যদি মারে? এক প্রকার বাঘের মতো ভয় পেতাম!

এখন বড় হয়েছি। বুঝতে শিখেছি, এরা বাঘ বা বাঘের ন্যায় কিছু না। এরা আমাদের মতোই মানুষ। এদেরও আমাদের মতো একটা মন আছে। এরা যেহেতু মানুষ, তাই নিশ্চয়ই এদের মাঝেও মানবতা বোধ আছে। এদেরও আছে আমাদের মতোই সুখ-দুঃখবোধ, ভালোলাগা-কষ্ট পাওয়ার অনুভুতি, একটু স্নেহ পাওয়ার আকাঙ্খা।

পাশের ঘরে নতুন ভাগ্নে এসেছে এক মাসের কিছু বেশি সময় হল। এই বৃহন্নলাগোষ্ঠী যেহেতু নতুন কোনো মানব শিশুর আগমনের সংবাদ শুনলেই চলে আসে সেই বাড়িতে, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা গতকাল সকালে আমাদের বাসায় এসে হাজির হল। কোথায়, কিভাবে খোঁজ পেল সেটি অজানা। আমি বুঝতে পারলাম, মানুষগুলোকে আমি আর এখন বোকার মতো ভয় পাই না। নাস্তা করে বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম তাদের নাচ দেখতে। আমার ছোট ভাইয়ের জন্মের পরে তাদের নাচ দেখিয়েছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে (ভয়ে)। মনে পড়ে তখন তাদের বেশ আড়ম্বর ছিল। একটা অন্যরকম আমেজ ছিল। সে আমেজ দেখতে পেলাম এখন অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। একটা গানে নাচল কি নাচল না....... বড় কথা সেই দিনগুলো আর খুঁজে পেলাম না কাল সকালে।

তাদের দেখতে পেয়েই আপু তার ছেলেকে নিয়ে প্রথমে ভয়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। তখন শুনতে পেয়েছিলাম তারা বেশকয়েকবারই বলছেন, ‘আমাগো দেইখা ভয় পাইলি? দুয়ার দিলি? এইডা একটা কাম করলি ছেমড়ি? হ্যাঁ? আমরা কি তোগো্ মতন মার প্যাটের তন আহি নাই? আল্লায় আমাগো মা হওয়ার ক্ষমতা দেয় নাই, হের লিগা কি আমাগো কেউ জন্ম দেয় নাই?’

একবার না, তারা বেশ কয়েকবারই এই কথাগুলো বলেছিল। আমার কানে এসে বারবার জানান দিচ্ছিল আর কেমন যেন বুকের মধ্যে বিধছিল। চরম সত্য কথা। এরা আমাদের মতোই মানুষ। আমরা এই পৃথিবীতে যেভাবে এসেছি, তারাও ঠিক সেভাবেই এসেছে। তাহলে কেন তাদের জীবনধারা আর আমাদের জীবনধারা আলাদা ? কেন তাদের বাবা মাও আমাদের মতো করেই তাদেরও বুকের মধ্যে আগলে রাখেন না? লেখাপড়া শেখান না? কেন তাদের আলাদা জীবন যাপনে পাঠিয়ে দেন?

একবার শুনেছিলাম, এখন না কি অনেক বৃহন্নলাই লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। এই চিত্রটা কি একজন, দুইজন বা কয়েকজন বৃহন্নলার জীবনের চিত্র না হয়ে সকল বৃহন্নলার জীবনের চিত্র হতে পারে না? তারা কি আমাদের মতোই তাদের বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারে না? তাদের বাবা-মায়েরা কি পারে না, তাদেরকেও নিজেদের বুকে আগলে রাখতে? মানব জাতির তিনটি ভাগ- নর, নারী, বৃহন্নলা...........এই ভাবে কি ভাবা যায় না? আমরা কি পারি না তাদেরকে আমাদের মতোই স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে???.........
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০২৪ ভোর ৪:৩৯
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হ, আপনি জিতছেন, আপনারাই জিতছেন। :#(

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ২৪ শে জুলাই, ২০২৪ বিকাল ৫:৩৯



হ, আপনি জিতছেন, আপনারাই জিতছেন। সারাবিশ্ব থেকে ০৬ দিন সংযোগ বিচ্ছিন রেখে আপনারাই জিতছেন। অপরদিকে আলুপোড়া খেতে আসা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি (নাকি অপশক্তি) আপনারাও জিতছেন। দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেমন ছিলাম আমরা?

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৪ শে জুলাই, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:৫৫


কি দুঃসহ কয়েকটা দিন কাটালাম আমরা- কয়দিন কাটালাম মাঝেমধ্যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে! অনলাইন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেন আশির দশকে ফিরে গিয়েছিলাম আমরা। পার্থক্য; বিটিভির পরিবর্তে অনেকগুলো নতুন রঙ্গিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আন্দোলনের মুখে এই সরকারের পতন না হোক।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে জুলাই, ২০২৪ রাত ৮:২৯


গত ১৫ বছর এই সরকার যেভাবে দেশ চালিয়েছে, বিরোধীদেরকে যেভাবে কন্ট্রোলে রেখেছে এবার সেভাবে পারেনি। শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্যে দেখা গিয়েছে উনি খুবই চিন্তিত ছিল এই আন্দোলন নিয়ে। একটি সাদামাটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশের এত বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে ছেলেখেলা আর কতদিন?

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২৪ শে জুলাই, ২০২৪ রাত ১০:৫১

আচ্ছা, ডাটা সেন্টারে আগুন লাগলে সমস্ত দেশের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়? কোন মদনা এই কথা বিশ্বাস করতে বলে? পলক ভাইজান? তা ভাইজানের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি? পলিটিক্যাল সায়েন্স। আর? এলএলবি। উনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আর ক'টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি: বাংলাদেশ কখনও এই নির্মমতা ভুলে যাবে না!

লিখেছেন মিথমেকার, ২৫ শে জুলাই, ২০২৪ দুপুর ১:৪৮


ইতিহাসে "৭১" এর পর এত স্বল্প সময়ে এত প্রাণহানি হয়নি। সম্ভবত আধুনিক বিশ্ব এত প্রাণহানি, এত বর্বরতা, স্বজাতির মধ্যে এর আগে দেখেনি। সমগ্র বিশ্বে বর্বরতার দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশ!
... ...বাকিটুকু পড়ুন

×