somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আমিই সাইফুল
আমি একজন ইউরোপ প্রবাসী, জীবনের ঝড়-ঝাপটায় পাক খেয়ে গড়ে ওঠা আজকের এই আমি। ব্লগে তুলে ধরি মনের গভীরে লুকানো আবেগের রং, যা সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার আলোয় মেলে না। আমি অনুভূতির এক ফেরিওয়ালা, শব্দে বুনে যাই জীবনের অলিখিত গল্প…

আমি একজন সংখ্যালঘু: একাকিত্ব আর অন্তর্গততার গল্প।

২৫ শে অক্টোবর, ২০২৪ ভোর ৬:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সংখ্যালঘু হওয়ার অনুভূতিটা এক ধরনের স্বতন্ত্রতা, যেটা জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়। দেশের মাটিতে, সেই শৈশব থেকেই আমার চিন্তা-ভাবনা আর আদর্শের কারণে আমি নিজেকে এক প্রকার সংখ্যালঘু বলে মনে করতাম। দেশের মানুষের সাথে ভেতরে-বাইরে, আচরণ-চিন্তায় আমি মেলাতে পারিনি। আমার চিন্তা, আমার বিশ্বাস, কোনটাই দেশের মূলধারার সাথে মিশে যেতে পারেনি। এই বিভাজনটা যেন আমার শিকড়ে, মননের গভীরে বাসা বেঁধেছিল।

বিদেশের ভূমিতে এই অনুভূতিটা যেন আরেক ধাপ গাঢ় হয়ে যায়। এখানেও আমি সংখ্যালঘু, তবে এবার জাতিগতভাবেই। দেশের বাইরে এসে স্বদেশীয় কোনো পরিচিত কাঠামো পাইনি, যে কাঠামোতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা যায়। এখানে আমি একজন “অপর”, একটি ভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ, যার শরীরের রঙ, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি—সবকিছুই এই জায়গার মানুষের থেকে আলাদা। আমার মতো আরও অনেকে আছে, যারা একইভাবে নিজেদের ভিনদেশি মনে করে, যারা জানে, স্থানীয় সমাজের মূল স্রোতে মিশে যাওয়া কতটা কঠিন। তাদের সাথে এক ধরনের মনের যোগাযোগ তৈরি হয়, তবে তাও ক্ষণস্থায়ী।

এমন নয় যে আমি কখনো কোন দলের মধ্যে জায়গা পেতে চাইনি। ডানপন্থী, বামপন্থী, পূর্ব বা পশ্চিম—সব দিকেই আমি দৃষ্টি দিয়েছি। কিন্তু কোনো দলই আমাকে তাদের মানুষ বলে গ্রহণ করেনি। সব জায়গায়, একধরনের শূন্যতা যেন আমাকে ঘিরে ছিল। সমাজের কাঠামো, রাজনীতি, আদর্শ—সবকিছুতে আমি এক outsider, এক বহিরাগত।

এটা একটা অভিশাপ, কারণ এই দলহীনতা একজন মানুষকে একাকী করে তোলে। যখন আপনি কোনো গোষ্ঠীর অংশ হতে পারেন না, তখন আপনাকে নিজের লড়াই একা একা করতে হয়। নিজের চিন্তা-ভাবনা, নিজস্বতার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে গিয়ে বন্ধুহীন হতে হয়, আপনাকে কেবল নিজের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই দলহীনতা কিন্তু একধরনের মুক্তিও দেয়, কারণ এর মধ্যে আপনি নিজস্ব সত্তা এবং চিন্তাশক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। এটা আপনাকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, এবং অন্যের কথা শুনতে শেখায়। দলহীন হওয়া মানে নিজের মতো করে পথ খোঁজা, যেখানে অন্যের নির্দেশ বা আদর্শ আপনাকে আবদ্ধ করে না।

এই দলহীন জীবনযাত্রায়, আমি নাজিম হিকমতের আদর্শকে খুঁজে পেয়েছি। নাজিম, যিনি তুরস্কের অন্যতম কবি ও বিপ্লবী, তার জীবন ও চিন্তা থেকে আমি শিখেছি কীভাবে মানুষের পাশে থাকা যায়, কীভাবে তাদের জন্য কথা বলা যায়। তিনি কবিতায় বলেছিলেন, “মানুষকে ভালোবাসো, তাদের মুক্তি ও সুখের জন্য সংগ্রাম করো।” তার কথার অনুপ্রেরণায়, আমিও সেই চেষ্টা করি—আমি তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, যারা সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যাদের কণ্ঠ সবার কানে পৌঁছায় না।

নাজিম হিকমতের মতো, আমিও সেই অগণন মানুষদের জন্য কথা বলতে চাই, যারা মাটির পিঁপড়ের মতো নিষ্ঠুর পরিশ্রম করে, সমুদ্রের মাছের মতো বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে, আকাশের পাখির মতো স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। এই মানুষগুলো কখনো ভীরু, কখনো বীর; কখনো নিরক্ষর, কখনো শিক্ষিত; কখনো শিশুর মতো সরল, আবার কখনো ধ্বংসাত্মক। তাদের জন্য আমার ভালোবাসা অপরিসীম, কারণ তাদের মধ্যেই আমি আমার সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে পাই।

যাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি, তাদের প্রত্যেকের জীবন একেকটি গল্প। এই গল্পগুলো সহজ, সরল, এবং গভীর। একজন শ্রমিক, যে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজের খোঁজে বের হয়, একজন শিক্ষার্থী, যে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য সংগ্রাম করে, একজন মা, যে তার সন্তানের মুখে হাসি দেখার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে—তাদের এই ছোট ছোট গল্পগুলোই আমার কাছে বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ।

তারা কেউ কোনো রাজনীতির অংশ নয়, কোনো আদর্শিক দলে নেই। তাদের জীবন খুব সাধারণ, খুব বাস্তব। তবু তাদের জীবনেই আমি মানুষের প্রকৃত চেহারা দেখি। আমি দেখি কষ্ট, আশা, ভালোবাসা, আর ভাঙাগড়ার চক্র। তারা সৃষ্টিশীলও, ধ্বংসাত্মকও; তাদের মধ্যে আমি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখি। তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমি অনুভব করি জীবন কতটা বৈচিত্র্যময় এবং গভীর হতে পারে।

সংখ্যালঘু হয়ে ওঠার এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। এটা আমাকে কেবল একা করে দেয়নি, বরং আমাকে একধরনের শক্তিও দিয়েছে। আমি শিখেছি, দলহীনতার মধ্যেও নিজের আদর্শের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে হয়। আমি শিখেছি, একা থাকলেও, মানুষের জন্য, তাদের মুক্তির জন্য লড়াই করা যায়।

এই সংখ্যালঘু পরিচয় আমার জীবনের দুঃখ হলেও, এটা আমার গর্বও। আমি জানি, আমি কারো দলে না থেকেও মানুষের পাশে আছি। তাই আমি সংখ্যালঘু হলেও, একক হলেও, আমি একা নই। আমি তাদের সঙ্গে আছি, যারা মাটির, সমুদ্রের, আকাশের—আমি তাদের জীবনের গল্পে বেঁচে থাকি। আর এই গল্পগুলোই আমার জীবনের অর্থ, আমার লড়াইয়ের প্রেরণা।
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গণজাগরণের ১৩ পেরিয়ে আজও অনিশ্চিত বাংলাদেশ ‼️ প্রজন্মের ভুল পথে চলা .....!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৪৫


গণজাগরণ মঞ্চের শুরুটা খুবই অকল্পনীয় ছিল/ ব্লগারদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ হঠাৎ করেই ডাক দিয়েছিলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের বিচার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সংকটের কারণেই ছিলো এই জাগরণ।আমারও সৌভাগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত কি আদতেই বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে?

লিখেছেন এমএলজি, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

স্পষ্টতঃই, আসন্ন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামাত। দুই পক্ষের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে যেমন সক্রিয়, একইভাবে ফেইসবুকেও সরব।

বিএনপি'র কিছু কর্মী বলছে, জামাত যেহেতু ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌কে কীভাবে দেখা যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

যে কোন কিছু দেখতে হলে, তিনটি জিনিসের সমন্বয় লাগে। সেই জিনিসগুলো হচ্ছে - মন, চোখ এবং পরিবেশ। এই তিন জিনিসের কোন একটি অকেজো হয়ে গেলে, আমরা দেখতে পারি না। চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শতরুপা

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২

তুমি কি কোন স্বপ্ন রাজ্যের পরী?
কিভাবে উড়ো নির্মল বাতাসে?
ঢেড়স ফুলের মতো আখি মেলো-
কন্ঠে মিষ্টি ঝড়াও অহরহ,
কি অপরুপ মেঘকালো চুল!
কেন ছুঁয়ে যাও শ্রীহীন আমাকে?
ভেবে যাই, ভেবে যাই, ভেবে যাই।
তুমি কি কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূমি-দেবতা

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৩


জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভাইয়ে ভাইয়ে
মারামারি-কাটাকাটি-খুনোখুনি হয়;
শুধু কি তাই? নিজের বোনকে ঠকিয়ে
পৈতৃক সম্পত্তি নিজ নামে করে লয়।
অন্যদের জমির আইল কেটে নিয়ে
নিজেরটুকু প্রশস্ত সময় সময়;
অন্যদের বাড়ি কব্জা- তাদের হটিয়ে
সেখানে বানায় নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×