২২শে ডিসেম্বর, বৃহস্পতি বার:
রাত দশটা- মাইক্রোবাস চলে এসেছে। আমরা রওনা হচ্ছি। গন্তব্য বান্দরবন : বিজয়-তাজিংডং। লাইফে আর কিছু তো করতে পারলাম না, দেখি র্সবোচ্চ পাহাড়গুলোর একটা অন্তত জয় করতে পারি কি না।
২৩শে ডিসেম্বর, শুক্রবার:
চিটাগং এ একটা ছোট্ট বিরতি, লবণ মেশানো চা খেয়ে আবার যাত্রা। দুপুরে পৌছলাম মিলনছড়ি। এখানে আমরা উঠেছি একটা রির্সোটে। জায়গাটা বেশ গোছানো, সুন্দর।
বিকাল তিনটা- গোছল খাওয়া সেরে মাইক্রো নিয়ে চিম্বুক গেলাম। মানুষ চিম্বুক দেখে কেনো এতো উল্লাসিত হয় এটা আমার বড় গোল মাথায় আগেও ঢোকে নি, এবারো না। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, ছবি তোলা গেলো না।
চাদের গাড়ি লাগবে কালকে। রির্সোট থেকে ম্যানেজার ম্যানেজ করে দিলো। গাইডও পেলাম এখান থেকেই। খুবই ভালো গাইড, পাড়েং ম্রো, আগে শান্তি বাহিনীতে ছিলেন। কাল খুব ভোড়ে রওনা হতে হবে।
২৮শে ডিসেম্বর, শনিবার:
ভোর ছয়টা- বাপরে বাপ!!! কিযে ঠান্ডা এখানে। খালি পেটে বের হলাম। চাঁদের গাড়ির গড়ণ কিছুটা জীপের মতো। ড্রাইভারের ওস্তাদ মনে হয় তাকে সিটে বসিয়ে বলেছে 'বত্স, তুমি গাড়িতে প্যাসেন্জাররা কোন মতে পশ্চাদদেশ ঠেকাইবা মাত্র র্স্টাট দেবে, এবং চক্ষু বন্ধ করিয়া দেবে টান।' - এই টান যে কোন টান তা গাড়িতে না বসলে বোঝা অসম্ভব। পৃথিবীর সব রকম এ্যামিউজমেন্ট র্পাক ফেইল!!
পাহাড়ের মাঝে মাঝে হঠাত্ হঠাত্ মেঘের লেয়ার দেখা যাচেছ। মুগ্ধ হচ্ছি। ইস্! তখন যদি জানতাম এই মেঘ আমাদের জন্য কতো বড়ো র্দুভাগ্য হয়ে অপেক্ষা করছে... ...
সকাল আটটা- খাইক্কাংছড়ি ঘাট, তারপর নৌকায় করে রুমাবাজার। অসহ্য সুন্দর প্রকৃতি, চোখে পানি চলে আসার মতো সুন্দর। কেন জানিনা, মার কথা খুব মনে পরছে। পারলে একবার মাকে নিয়ে আসব।
সাড়ে দশটার দিকে রুমা বাজার পৌছে ভাত দিয়ে নাস্তা সারলাম। এত শক্ত ভাত আগে কখোনো খাইনি। খেয়াল করলাম যে এখানে তরকারিতে ফোড়ণ দিতে পিয়াজ ব্যবহার করে না। তার বদলে দেয় জাত বিজাতের পোকা-মাকর। মাছি ছাড়া অন্যগুলোকে চিনতে পারলাম না। মজার ব্যাপার হলো যে সবাই গোগ্রাসে খেয়ে ফেললাম। ক্ষুধার রাজ্যে বোধহয় পৃথিবী খুবই গদ্যময় হয়ে গিয়েছিলো।
যাই হোক.... স্থানীয় আর্মি ক্যাম্পে রির্পোটের পর যাত্রা শুরু করলাম। গাইড পাড়েং ম্রো আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজের চেষ্টা করছি, অবশ্যই চল্লিশের নিচে না। এই বয়সে এই রকম শক্ত থাকা বোধহয় শুধু পাহাড়েই সম্ভব। ইডেন হিল, প্রথম পাহাড়। ভয় ধরে গেলো। পারবো তো ?? পাহাড় থেকে নেমেই ঝিরি। পানিতে নামতে হবে, জুতা খুলছি । গাইড হেসে উঠলো,‘ কতোবার জুতা খুলবে দিদি? এরকম আরো একশটা আছে সামনে। ধ্যুত্!! যা থাকে কপালে জুতা মুজা নিয়েই পানিতে নেমে গেলাম।
এরপর বাকি পুরোটা দিন হাটছি তো হাটছি। কখোনো পাহাড়, কখোনো সমতল, কখোনো পানি। মাঝে দু'একটা গ্রাম পরলে চা-বিস্কিট। একসময় বিকেল শেষ হয়ে ঝপ্ করে সন্ধা নামল। আমাদের হিসেব অনুযায়ী এতক্ষণে বগালেক পৌছে যাবার কথা। অথচ কাছে পিছে জন-মানুষের চিহ্ন র্পযন্ত নেই। বন আর পাহাড়। ভয় পাচ্ছি। আমাদের আটজন মানুষের কাছে চারটা মাত্র ছোট ছোট র্টচ। একটা ঝরনা পরল প্রচন্ড খাড়া আর পিচ্ছিল। পিছলালেই শেষ। আআআআআআ... ঠাস্। কাঁচা ডিমের মতো মাথা ফেটে যাবে।
পিছাবার উপায় নেই, সামনে রাস্তা র্দুগম থেকে র্দুগমতর হচ্ছে। এবার একদম খাড়া একটা পাহাড় চার হাত পা দিয়ে গিড়গিটির মতো উঠছি। কান্তির শেষ সীমানাও পার হয়ে গেছি। অথচ থামার উপায় নেই। থামতে গেলে হাত পিছলে যায়। বামে গভীর খাদ। উফ্... আর পারছি না। এই পাহাড় কি একেবারে র্স্বগে গিয়ে ঠেকেছে?? কতটা সময় পাহাড় বেয়েছি জানি না। একসময় চুড়ায় পৌছলাম। এবার নাকি নামতে হবে!!
`না.. আর না।আর কতো দুর যেতে হবে না বললে এক পাও যাব না' - সম্মিলিত দাবীর মুখে গাইড অবশেষে মহা মূল্যবান তথ্যটি জানালেন। আমরা পথ হারিয়েছি!
ওজন বেশী নিলে হাটতে কষ্ট হবে বলে পানি, ওষুধ, চকলেটস্ আর একসেট করে কাপড় ছাড়া কারো কাছে তেমন কিছুই নেই। আমরা আটটা ছেলেমেয়ে প্রায় তেরশ ফুট মাটির ওপরে পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিনের রাত্রে কনকনে ঠান্ডায় অসহায় ভাবে দাড়িয়ে আছি। রাত প্রায় দশটা বাজে। ঢাকা শহরের দশটা না, গহীন বনের রাত দশটা। গাইড শুকনো কাঠ জোগাড় করে ছোট্ট একটা আগুন জালিয়ে দিলেন। আমরা টুকটাক যা ছিলো তা খেয়ে ওটার চারদিকে গুটিসুটি মারলাম।
শীত বাড়ছে। কুয়াশাও ঘন হচ্ছে। এক সময় আবিস্কার করলাম এগুলা কুয়াশা না। ঐযে... দিনের বেলা চাদের গাড়ি থেকে যেই মেঘ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, এইগুলা সেই মেঘ। ঠান্ডাআআআ। আগুনেও তেমন ওম্ নেই। দুই তিন ঘন্টা গেল। গাইড দুই বার নিচে নেমে বসতি খুঁজে এসেছে । নেই। পাহাড়ে পাহাড়ে এস.ও.এস সিগনাল পাঠাচ্ছি। কেউ উত্তর করে না। শেষে যখন সবার একটু ঝিমুনি আসলো তখনি ঘটলো মারত্বক এক অঘটন। বৃষ্টি.......ঝমঝম করে কোথা থেকে যেন বৃষ্টি নেমে গেল। আগুনটা বাঁচালাম অনেক কষ্টে, কিন্তু নিজেরা বাঁচতে পারলাম না।
সিচুয়েশনের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য রিভিউ করছি। প্রচন্ড শীত, কিলবিল করছে ছোট ছোট জোঁক, ক্ষুধায় পেট জ্বলছে, পরনের সমস্ত কাপড় ভিজা। এদিকে বিকেলে গ্রুপের একজন আহত হয়েছিলেন, তার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। আগুনের তেজ আরো কমে আসছে। আগনে দেবার মতো চারপাশে কিছু নেই, বৃষ্টি সব কিছুকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। আগুনটা নিভে গেলে এই ঠান্ডায় আর টিকতে পারবোনা। গামছা, টাওয়েল, টয়লেট পেপার, র্ফাস্ট-এইড বক্রের তুলা ইত্যাদি যা ছিলো একটা একটা করে আগুনে দেয়া শুরু করলাম। অনেকটা `যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পর' টাইপ অবস্থা।
(ক্রমশ... ...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




