
- “তোর সাথে কফি খেতে খুব ইচ্ছে করছে।”
মোবাইলে অর্পণার মেসেজ দেখে যতটা না খুশী, তার থেকে অনেক বেশি অবাক হলো জয়ীতা।
গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পুরোপুরি যোগাযোগ বিহীন থেকে, সবচেয়ে কাছের বান্ধবী যখন কল না করে এমন একটা মেসেজ পাঠায়, তখন কি উত্তর দিবে, ভেবে পায় না সে।
মোবাইলটা হাতে নিয়েই ভাবতে থাকে, কি লিখবে ? মেসেজ না পাঠিয়ে, একটা কলও তো দিতে পারত।
বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবনার পরে, জয়ীতা লিখলো, “ওকে”।
কারণ কফি তার অসম্ভব প্রিয়; কেউ কফির অফার দিয়েছে, আর সে প্রত্যাখ্যান করেছে – এমনটি আজ পর্যন্ত হয়নি।
এবার প্রতিক্ষার পালা, কি করবে এবার অর্পণা? মেসেজ পাঠাবে নাকি এবার কল করবে?
মিনিট পাঁচেক পার হয়ে যায়, জয়ীতার অপেক্ষার পালা দীর্ঘতর হতে থাকে। শেষমেশ না পেরে, অর্পণাকে কল করে।
মনে হল রিং টোন বাজার আগেই, কল রিসিভ করেছে; অনেকটা কলের জন্যে প্রতীক্ষায় থাকার সময় কল আসলে যেমন হয়।
কিন্তু, কি আশ্চর্য! ও পাশ থেকে কোন আওয়াজ নেই।
কিছুটা অভিমান নিয়েই কল করা সত্ত্বেও জয়ীতা কিছু বলছে না।
আবার, কোন এক অজ্ঞাত কারণে, কল রিসিভ করেও অর্পণা কিছু বলছে না।
যেন, চুপ থাকার প্রতিযোগিতা চলছে, যিনি পরে কথা বলবেন, তিনিই বিজয়ী বলে বিবেচিত হবেন।
মুহূর্ত দীর্ঘায়ীত হতে হতে সেকেন্ড ছাড়িয়ে মিনিটে পৌঁছে যায়। কিন্তু ফোনের দুপ্রান্তের দুজনের কেউই কথা বলছে না।
জয়ীতা লাইন কেটে দিল। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ভেবেছিল, প্রিয় বান্ধবীর সাথে কথা বললে তার মনটা ভালো হয়ে যাবে, তাই কলও দিয়েছিল। কিন্তু, যার সাথে দিনে অসংখ্য বার কথা হতো, তার সাথে কয়েকদিন ধরে পুরোপুরি যোগাযোগ বিহীন থাকার পরেও কোন কল না করে মোবাইলে মেসেজ পাঠানো; আর এরপর তার কল ধরেও কোন কথা না বলাতে, জয়ীতা আর অপেক্ষা করে না। লাইন কেটে দিয়েই, ফোনটা টেবিলে ফেলে রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
আসলে, আজকের দিনটাই যেন কেমন।
আজ সকাল থেকেই তার মন খারাপ – ভীষণ রকমের মন খারাপ।
অথচ, এত মন খারাপ করার মত বড় কিছু ঘটেনি। অন্য আর দশটা সাধারন দিনের মতোই ছিল আজকের দিনটা।
তবে এক্কেবারে, একই রকম না; কিছুটা ভিন্নতা আছে। সকালটাই শুরু হয়েছে, বুয়া না আসার দুঃসংবাদ দিয়ে – যা ছিলো মন খারাপ করার দেশলাইয়ের কাঠির আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো। যেখান থেকে একে একে নাস্তা তৈরির ভোগান্তি, এরপর দুপুরে দীপনের সাথে খুবই তুচ্ছ একটা ব্যাপারে ঝগড়া এবং সবশেষে বেশ ঝাঁঝালো তর্কাতর্কি।
কিছুক্ষন ধরে নিজেই নিজের আচরণ সমালোচনার দৃস্টিতে দেখার চেষ্টা করছে, সে এখন।
কোথায় সে ভুল করেছে, কেন আজকের দিনটি এমন বাজে ভাবে কাটাতে হচ্ছে?
অথচ, সপ্তাহে এই একটা ছুটির দিনের অপেক্ষায়ই সে থাকে; অন্যদিনগুলি কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই দুজন দু’দিকে ছুটে বের হয়ে যায়। এই যাওয়া ঠিক জীবিকার সন্ধানে বলা যাবে না, একজনের আয়েই তাদের বেশ চলতে পারার কথা। তবু, দুজনই জব করে – কিছুটা ইগো এর মধ্যে জড়িয়ে আছে, সেটা নিশ্চিত। আর বাকিটা কি সচ্ছলতা নাকি বিলাসিতার প্রয়োজনে, সেটা এখনো জয়ীতার কাছে অতটা পরিষ্কার নয়।
অনেক দিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে আর চাকরিটা করবে না; কিন্তু তার বাবার কথা ভেবে ছাড়তে পারেনি। এই চাকরিটা ছাড়লে দীপন যতটা না খুশি হবে, তার থেকে অনেক অনেক গুন বেশি কস্ট পাবে তার বাবা। বাবাকে সে কষ্ট দিতে চায় না বলেই এখনো চাকরিতে ঝুলে আছে, ছাড়তে পারছে না।
অবশ্য ঝুলে আছে বলাটা অন্যায় হবে, একজন মহিলা হিসেবে সে যথেষ্ট সুনামের সাথেই কাজ দায়িত্ব সামলে যাচ্ছে। বাস্তব চিত্রটা এমনই যে, অনেক পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় সে দ্রুত প্রমোশন পেয়েছে, তার নিজের কর্মদক্ষতায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই কিছু কিছু প্রতিকুলতা জয় করেই।
এভাবেই দিন যাচ্ছে দু’জনের। সকালের পরে সারাদিনে দেখা নেই- শুধু মোবাইলে প্রয়োজনে কিছু কথা হয়। দিনের শেষে বাসায় ফিরে যখন দেখা হয় তখন আবার দুই রকমের ব্যস্ততা – একজন টিভি নিয়ে বসে আর জয়ীতাকে ঢুকতে হয় রান্না ঘরে। অবশ্য রান্নাঘরে সে স্বেচ্ছায়ই যায়, অনেকটা দীপনের প্রতি ভালবাসার টানে। দীপনের জন্যে রান্না করতে তার ভাল লাগে, বিশেষ করে তাজা মাছের ভাজা দীপনের খুব পছন্দ। জয়ীতা তার শাশুড়ির কাছ থেকে এই রান্নাটা শিখে নিয়েছে। এখন, সে চেষ্টা করে অন্তত সপ্তাহে একদিন দীপনকে মাছ ভেজে খাওয়ানোর। তাই, ছুটির দ্দিনগুলোর জন্যে সে রীতিমতো অপেক্ষা করে। কখন একটা ছুটির দিন আসবে, আর তারা দুজনে কিছুটা সময় নিজেদের মত করে কাটাবে।
অথচ, একটা ছুটির দিন পেয়েও আজ সে একা, মন খারাপ করে বসে আছে।
মাথায় রাজ্যের চিন্তা; আর, দীপন রাগ করে কোথায় যেন গিয়েছে, এখনো ফিরেনি।
ডিপ ফ্রিজ থেকে সেই কোন সকালে মাছ বের করে ভিজিয়ে রেখেছে, অথচ হাত দেয়া হয়নি।
আজ বোধহয় আর মাছগুলো ভাজা হবে না, আবার ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু জয়ীতার একটুও ইচ্ছে করছে না উঠে বাল্বগুলো জ্বালিয়ে দিতে।
থাকুক না অন্ধকার, এত আলো দিয়ে কি হবে?
নিজের এই বিষণ্ণ চেহারা দেখা ছাড়া একা একা আর কিই বা করবে সে আলো দিয়ে?
ভিতর থেকে মোবাইলের রিং টোনের আওয়াজ ভেসে আসছে।
এই রিং টোন তার পছন্দের, তাই দীপন সেট করে দিয়েছিল, কেনার পর পরই।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার নেমে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগছে জয়ীতার।
ফোন ধরতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না।
যতক্ষণ খুশী বাজুক, ফোন ধরবে না, এখন। কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
বেজেই চলছে, মোবাইল। একজনের কত ধৈর্য থাকলে এতক্ষন ধরে একটানা কল করে যাবে!
এখন তার এই প্রিয় রিং টোনের আওয়াজও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে।
কার এমন ধৈর্য, সেটা ভাবতে ভাবতে চরম বিরক্তি নিয়ে, ঘরে ঢুকে মোবাইলের স্কৃনে অর্পণার নাম দেখে অবাক হয়ে যায়।
অর্পণা কল করেছে তাকে! আশ্চর্য ! বিকেলে কফির অফার দিয়ে মেসেজ পাঠিয়ে, কল রিসিভ করেও কোন কথা বলল না। এথচ এখন, কল রিসিভ না করা পর্যন্ত রিং করেই যাচ্ছিল !!
বিন্দুমাত্র দেরি না করে, জয়ীতা মোবাইল হাতে তুলে নেয়।
- “কিরে বান্দর, তুই এখন ক্যান কথা বলার জন্যে পাগল হয়ে গেলি?”
এক নিঃশ্বাসে বলেই, জয়ীতা বড় করে একটা দম নেয়ার চেষ্টা করে।
- “জয়ি, তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসো, আমরা গাড়িতে অপেক্ষা করছি তোমার জন্যে। কফি খেতে যাবো”,
দীপনের কণ্ঠস্বরে জয়ীতা বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠে যায়।
বিস্ময়ের ঘোরেই বলে ফেলে, “আসছি, তোমরা একটু অপেক্ষা কর।”
বলেই, দীপন অর্পণাকে কোথায় পেল? বা অর্পণা দীপনকে কোথায় পেল ভাবতে ভাবতে সে প্রস্তুত হতে থাকে বাইরে যাওয়ার জন্যে। ড্রেসটা চেঞ্জ করতে যতটা কম সময় নেয়া সম্ভব, নিয়ে শুধুমাত্র হালকা একটু লিপস্টিক লাগিয়েই সে নিচে নেমে আসে, অসম্ভব দ্রুতগতিতে।
বিস্মিত জয়ীতার জিজ্ঞাসু নেত্রের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে অর্পণা।
কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে প্রায় ফিস ফিস করে বলে,
- "কোন কথা বলবি না, কফি খেতে খেতে শুধু শুনে যাবি। অনেক কথা আছে, তোর সাথে শেয়ার করার।"
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





