somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিস্মিত মুহূর্ত

২৪ শে এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



- “তোর সাথে কফি খেতে খুব ইচ্ছে করছে।”
মোবাইলে অর্পণার মেসেজ দেখে যতটা না খুশী, তার থেকে অনেক বেশি অবাক হলো জয়ীতা।
গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পুরোপুরি যোগাযোগ বিহীন থেকে, সবচেয়ে কাছের বান্ধবী যখন কল না করে এমন একটা মেসেজ পাঠায়, তখন কি উত্তর দিবে, ভেবে পায় না সে।

মোবাইলটা হাতে নিয়েই ভাবতে থাকে, কি লিখবে ? মেসেজ না পাঠিয়ে, একটা কলও তো দিতে পারত।
বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবনার পরে, জয়ীতা লিখলো, “ওকে”।
কারণ কফি তার অসম্ভব প্রিয়; কেউ কফির অফার দিয়েছে, আর সে প্রত্যাখ্যান করেছে – এমনটি আজ পর্যন্ত হয়নি।
এবার প্রতিক্ষার পালা, কি করবে এবার অর্পণা? মেসেজ পাঠাবে নাকি এবার কল করবে?

মিনিট পাঁচেক পার হয়ে যায়, জয়ীতার অপেক্ষার পালা দীর্ঘতর হতে থাকে। শেষমেশ না পেরে, অর্পণাকে কল করে।
মনে হল রিং টোন বাজার আগেই, কল রিসিভ করেছে; অনেকটা কলের জন্যে প্রতীক্ষায় থাকার সময় কল আসলে যেমন হয়।

কিন্তু, কি আশ্চর্য! ও পাশ থেকে কোন আওয়াজ নেই।
কিছুটা অভিমান নিয়েই কল করা সত্ত্বেও জয়ীতা কিছু বলছে না।
আবার, কোন এক অজ্ঞাত কারণে, কল রিসিভ করেও অর্পণা কিছু বলছে না।
যেন, চুপ থাকার প্রতিযোগিতা চলছে, যিনি পরে কথা বলবেন, তিনিই বিজয়ী বলে বিবেচিত হবেন।

মুহূর্ত দীর্ঘায়ীত হতে হতে সেকেন্ড ছাড়িয়ে মিনিটে পৌঁছে যায়। কিন্তু ফোনের দুপ্রান্তের দুজনের কেউই কথা বলছে না।
জয়ীতা লাইন কেটে দিল। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ভেবেছিল, প্রিয় বান্ধবীর সাথে কথা বললে তার মনটা ভালো হয়ে যাবে, তাই কলও দিয়েছিল। কিন্তু, যার সাথে দিনে অসংখ্য বার কথা হতো, তার সাথে কয়েকদিন ধরে পুরোপুরি যোগাযোগ বিহীন থাকার পরেও কোন কল না করে মোবাইলে মেসেজ পাঠানো; আর এরপর তার কল ধরেও কোন কথা না বলাতে, জয়ীতা আর অপেক্ষা করে না। লাইন কেটে দিয়েই, ফোনটা টেবিলে ফেলে রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

আসলে, আজকের দিনটাই যেন কেমন।
আজ সকাল থেকেই তার মন খারাপ – ভীষণ রকমের মন খারাপ।
অথচ, এত মন খারাপ করার মত বড় কিছু ঘটেনি। অন্য আর দশটা সাধারন দিনের মতোই ছিল আজকের দিনটা।
তবে এক্কেবারে, একই রকম না; কিছুটা ভিন্নতা আছে। সকালটাই শুরু হয়েছে, বুয়া না আসার দুঃসংবাদ দিয়ে – যা ছিলো মন খারাপ করার দেশলাইয়ের কাঠির আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো। যেখান থেকে একে একে নাস্তা তৈরির ভোগান্তি, এরপর দুপুরে দীপনের সাথে খুবই তুচ্ছ একটা ব্যাপারে ঝগড়া এবং সবশেষে বেশ ঝাঁঝালো তর্কাতর্কি।

কিছুক্ষন ধরে নিজেই নিজের আচরণ সমালোচনার দৃস্টিতে দেখার চেষ্টা করছে, সে এখন।
কোথায় সে ভুল করেছে, কেন আজকের দিনটি এমন বাজে ভাবে কাটাতে হচ্ছে?
অথচ, সপ্তাহে এই একটা ছুটির দিনের অপেক্ষায়ই সে থাকে; অন্যদিনগুলি কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই দুজন দু’দিকে ছুটে বের হয়ে যায়। এই যাওয়া ঠিক জীবিকার সন্ধানে বলা যাবে না, একজনের আয়েই তাদের বেশ চলতে পারার কথা। তবু, দুজনই জব করে – কিছুটা ইগো এর মধ্যে জড়িয়ে আছে, সেটা নিশ্চিত। আর বাকিটা কি সচ্ছলতা নাকি বিলাসিতার প্রয়োজনে, সেটা এখনো জয়ীতার কাছে অতটা পরিষ্কার নয়।

অনেক দিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে আর চাকরিটা করবে না; কিন্তু তার বাবার কথা ভেবে ছাড়তে পারেনি। এই চাকরিটা ছাড়লে দীপন যতটা না খুশি হবে, তার থেকে অনেক অনেক গুন বেশি কস্ট পাবে তার বাবা। বাবাকে সে কষ্ট দিতে চায় না বলেই এখনো চাকরিতে ঝুলে আছে, ছাড়তে পারছে না।
অবশ্য ঝুলে আছে বলাটা অন্যায় হবে, একজন মহিলা হিসেবে সে যথেষ্ট সুনামের সাথেই কাজ দায়িত্ব সামলে যাচ্ছে। বাস্তব চিত্রটা এমনই যে, অনেক পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় সে দ্রুত প্রমোশন পেয়েছে, তার নিজের কর্মদক্ষতায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই কিছু কিছু প্রতিকুলতা জয় করেই।

এভাবেই দিন যাচ্ছে দু’জনের। সকালের পরে সারাদিনে দেখা নেই- শুধু মোবাইলে প্রয়োজনে কিছু কথা হয়। দিনের শেষে বাসায় ফিরে যখন দেখা হয় তখন আবার দুই রকমের ব্যস্ততা – একজন টিভি নিয়ে বসে আর জয়ীতাকে ঢুকতে হয় রান্না ঘরে। অবশ্য রান্নাঘরে সে স্বেচ্ছায়ই যায়, অনেকটা দীপনের প্রতি ভালবাসার টানে। দীপনের জন্যে রান্না করতে তার ভাল লাগে, বিশেষ করে তাজা মাছের ভাজা দীপনের খুব পছন্দ। জয়ীতা তার শাশুড়ির কাছ থেকে এই রান্নাটা শিখে নিয়েছে। এখন, সে চেষ্টা করে অন্তত সপ্তাহে একদিন দীপনকে মাছ ভেজে খাওয়ানোর। তাই, ছুটির দ্দিনগুলোর জন্যে সে রীতিমতো অপেক্ষা করে। কখন একটা ছুটির দিন আসবে, আর তারা দুজনে কিছুটা সময় নিজেদের মত করে কাটাবে।

অথচ, একটা ছুটির দিন পেয়েও আজ সে একা, মন খারাপ করে বসে আছে।
মাথায় রাজ্যের চিন্তা; আর, দীপন রাগ করে কোথায় যেন গিয়েছে, এখনো ফিরেনি।
ডিপ ফ্রিজ থেকে সেই কোন সকালে মাছ বের করে ভিজিয়ে রেখেছে, অথচ হাত দেয়া হয়নি।
আজ বোধহয় আর মাছগুলো ভাজা হবে না, আবার ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু জয়ীতার একটুও ইচ্ছে করছে না উঠে বাল্বগুলো জ্বালিয়ে দিতে।
থাকুক না অন্ধকার, এত আলো দিয়ে কি হবে?
নিজের এই বিষণ্ণ চেহারা দেখা ছাড়া একা একা আর কিই বা করবে সে আলো দিয়ে?

ভিতর থেকে মোবাইলের রিং টোনের আওয়াজ ভেসে আসছে।
এই রিং টোন তার পছন্দের, তাই দীপন সেট করে দিয়েছিল, কেনার পর পরই।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার নেমে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগছে জয়ীতার।
ফোন ধরতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না।
যতক্ষণ খুশী বাজুক, ফোন ধরবে না, এখন। কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

বেজেই চলছে, মোবাইল। একজনের কত ধৈর্য থাকলে এতক্ষন ধরে একটানা কল করে যাবে!
এখন তার এই প্রিয় রিং টোনের আওয়াজও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে।
কার এমন ধৈর্য, সেটা ভাবতে ভাবতে চরম বিরক্তি নিয়ে, ঘরে ঢুকে মোবাইলের স্কৃনে অর্পণার নাম দেখে অবাক হয়ে যায়।
অর্পণা কল করেছে তাকে! আশ্চর্য ! বিকেলে কফির অফার দিয়ে মেসেজ পাঠিয়ে, কল রিসিভ করেও কোন কথা বলল না। এথচ এখন, কল রিসিভ না করা পর্যন্ত রিং করেই যাচ্ছিল !!

বিন্দুমাত্র দেরি না করে, জয়ীতা মোবাইল হাতে তুলে নেয়।
- “কিরে বান্দর, তুই এখন ক্যান কথা বলার জন্যে পাগল হয়ে গেলি?”
এক নিঃশ্বাসে বলেই, জয়ীতা বড় করে একটা দম নেয়ার চেষ্টা করে।

- “জয়ি, তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসো, আমরা গাড়িতে অপেক্ষা করছি তোমার জন্যে। কফি খেতে যাবো”,
দীপনের কণ্ঠস্বরে জয়ীতা বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠে যায়।

বিস্ময়ের ঘোরেই বলে ফেলে, “আসছি, তোমরা একটু অপেক্ষা কর।”
বলেই, দীপন অর্পণাকে কোথায় পেল? বা অর্পণা দীপনকে কোথায় পেল ভাবতে ভাবতে সে প্রস্তুত হতে থাকে বাইরে যাওয়ার জন্যে। ড্রেসটা চেঞ্জ করতে যতটা কম সময় নেয়া সম্ভব, নিয়ে শুধুমাত্র হালকা একটু লিপস্টিক লাগিয়েই সে নিচে নেমে আসে, অসম্ভব দ্রুতগতিতে।

বিস্মিত জয়ীতার জিজ্ঞাসু নেত্রের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে অর্পণা।
কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে প্রায় ফিস ফিস করে বলে,
- "কোন কথা বলবি না, কফি খেতে খেতে শুধু শুনে যাবি। অনেক কথা আছে, তোর সাথে শেয়ার করার।"
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১১:০৯
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি, যার অর্থ খারাপ বা অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া এবং ভালো বা সৎ মানুষকে রক্ষা করা। এটি মূলত সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো নামে মিথ্যা অপবাদ কাম্য নয় তবে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৯


ঘটনাটি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং তার সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক বন্ধুকে ঘিরে। পরিবাগ ওভারব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×