somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেশ বড় না জাতি ?

১৪ ই মে, ২০১৮ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




কোন দেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই যদি ঐ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধীদের সহায়তা করে এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরেই যদি আবার তারাই তাদের নির্দিষ্ট ভুখন্ডের জন্যে নিজস্ব আইন পরিষদসহ স্বায়ত্তশাসন দাবী করে বসে – তাহলে ঐ জনগোষ্ঠীর প্রতি নব্য স্বাধীন রাস্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

প্রশ্ন জটিল না সহজ সেই ঘোরপ্যাঁচে না জড়িয়ে বিষয়টি আরেকটু সহজ করে দিতে পারি। এই প্রশ্নের প্রেক্ষাপট কিন্তু আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এবং সময়কাল ১৯৭১ – ৭২ সাল।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটা ক্ষুদ্র অংশ যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করেছিল, তখন তাদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানী বাহিনীকে সক্রিয় সহায়তা করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। “উপজাতীয় যুবকদের কিছু সংখ্যক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও অধিকাংশই পাকিস্তান সেনাবাহিনী কতৃক গঠিত ‘সিভিল আর্মড ফোর্স’ বা ‘সিএএফ’(রাজাকার বাহিনী হিসেবে পরিচিত) এ যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় অংশ নেয়।” (ইব্রাহিম, ২০১১, p. ৭৭)

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পার্বত্য অঞ্চলে তিনজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলন; এরা হলেন, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা, অং শৈ প্রু চৌধুরী এবং ত্রিদিব রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এম এন লারমা কোন পক্ষাবলম্বন করেন নি। কিন্তু অং শৈ প্রু চৌধুরী এবং ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে হানাদার বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। অপরদিকে, তৎকালীন তিন সার্কেল চীফ বা প্রথাগত রাজাদের মধ্যে একমাত্র মং সার্কেলের রাজা মংপ্রু সাইন তাঁর সবকিছু বিলিয়ে দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখেন। বোমাং রাজা এবং চাকমা রাজা দুজনই পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন।

বস্তুত, তৎকালীন রাজাকার বাহিনীতে তুলনামুলকভাবে চাকমাদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এর মূল কারণ, চাকমাদের রাজার পাকিস্তানপন্থী সক্রিয় ভুমিকা। তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার সার্কেলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্যে প্রচারনার পাশাপাশি গ্রামের হেডম্যান ও কারবারীদের নির্দেশ প্রদান করেন লোকদেরকে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করানোর জন্যে। অবশ্য বেতন ও অস্ত্রের লোভেও অনেকে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। পাহাড়ি যুবকেরা বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত পাকিস্তানী ট্রেনিং ক্যাম্পে অস্ত্র চালনা, ওয়্যারলেস সেট চালনা ইত্যাদির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পাহাড়ি রাজাকারের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের কি পরিমাণ ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা আরেকদিনের জন্যে তুলে রাখা হলো।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর, ২৯ জানুয়ারিতে রাঙ্গামাটির আওয়ামী লীগ নেতা চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল যখন উপজাতিদের জন্যে পৃথক সাংবিধানিক রক্ষাকবচের দাবী জানান, তখন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আশ্বাস দিয়েছিলেন যে,

- সরকারী চাকরীতে উপজাতীয়দের ন্যায্য অংশ প্রধান করা হবে।
- উপজাতীয়দের ঐতিহ্য ও কৃস্টি পুরোপুরিভাবে সংরক্ষন করা হবে।
- উপজাতীয়রা তাদের ভূমির অধিকার পূর্বের মতই ভোগ করতে থাকবেন। (ইব্রাহিম, ২০১১)

এর কিছুদিন পরেই, ১৫ ফেব্রুয়ারিতে মংপ্রু সাইন এর নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল চার দফা দাবী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যান। অন্যান্যদের মধ্যে এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন, এম এন লারমা এবং ত্রিদিব রায়ের মাতা বিনীতা রায়। ‘বাংলাদেশের ভাবি সংবিধানে উপজাতীয়দের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষনের জন্যে’ এই প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করে, যে স্মারকলিপির শেষান্তে উল্লেখ করা হয়ঃ
১। পার্বত্য অঞ্চল একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
২। উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষনের জন্য ‘১৯০০ সালের পার্বত্য চট্রগ্রাম শাসনবিধি’র ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা (Sanctuary Provision) শাসনতন্ত্রে থাকবে।
৩। উপজাতীয় রাজাদের দফত্র সংরক্ষণ করা হবে।
৪। পার্বত্য চট্রগ্রামের জনগণের মতামত যাচাই ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয় নিয়ে কোনো শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয়, এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। (খীসা, ১৯৯৬)

নব্য স্বাধীনতালব্ধ একটি দেশে কত ধরনের সমস্যা থাকতে পারে, তা জানতে আমাদের বেশী দূর যেতে হবে না। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের তৎকালীন সময়ের দিকে খেয়াল করলেই বরং বুঝতে সহজ হবে।

এই রকম একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সমস্যা-সঙ্কুল দেশের প্রেক্ষাপটে, প্রারম্ভের প্রশ্নটি নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন।
কি করা উচিত ছিলো?
কি করা হয়েছিল?
এখনো কি কি করা হচ্ছে ?

একই সাথে, সেটা ও ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো, এই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পরবর্তীতে কীভাবে এই দেশের প্রতি তার প্রতিদান দিয়েছিল?

শুধু উত্তরের ক্লু হিসেবে, নিচের তথ্যগুলো খেয়াল করতে পারেনঃ

১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তি বাহিনী গঠিত হলেও, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকেই (মোর্তোজা, ২০০০ ) । ১৯৭৩ – ১৯৭৪ সালে শান্তিবাহিনীর রিক্রুটিং এর সময় হাজার হাজার উপজাতীয় যুবক শান্তি বাহিনীতে যোগ দেয়। ১৯৭৬ সালে শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে।



অনন্যোপায় হয়ে, বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে দেশের অন্য স্থান হতে সেনাবিহিনী আনতে শুরু করে। (ইব্রাহিম, ২০১১, p. 165)

যারা বাঙ্গালীদের কে পাহাড়ের সমস্যার মূল কারণ বলে মনে করেন, তাদের হয়তো জানা নেই যে, সরকারী ভাবে বাঙ্গালীদের পুনর্বাসন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে (ইব্রাহিম, ২০১১, p. 148)। স্মরণযোগ্য, শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার তিন বছর পরে।

শুরুর প্রশ্নের সাথে শেষের তথ্যগুলোর কার্যকারণ খুঁজতে গেলে, প্রশ্ন এসে যায় – দেশ বড় না জাতি? প্রকৃতপক্ষে, পাহাড়ের কিছু নেতৃবৃন্দের ভুমিকাই এমন প্রশ্ন উত্থাপনের মূল কারণ। ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায় যে, দেশের পরিবর্তে জাতির স্বার্থ দেখতে গিয়ে এই নেতারা তাদের জাতির সাধারণ মানুষের জন্যে বয়ে এনেছেন দুর্ভোগ। যদিও তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে খারাপ কিছু ছিল না, কিন্তু তাদের অদূরদর্শীতা সমগ্র জাতির জন্যে বঞ্চনা আর দুর্দশা নিশ্চিত করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি এই যে, এখনকার নেতৃবৃন্দগণও কেন জানি তাদের পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বদ্ধ পরিকর – যেখানে আবার আমাদের দেশেরই কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী যোগ দিয়েছেন।

তথ্যসূত্রঃ
ইব্রাহিম, ম. জ. (২০১১). পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন. ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স।
খীসা, প. (১৯৯৬). পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা. ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ।
মোর্তোজা, গ. (২০০০ ). শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন. ঢাকা: সময় প্রকাশন।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১৮ রাত ১২:২৯
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭১-এ মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বা রাজাকার হত্যার বিচার করতে হবে! :(

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৮

চতুর্দিকে রক্ষীবাহিনী তথা ফজলু কমান্ডারদের দুর্দান্ত প্রতাপ। ভয়ংকর সত্যটি হলো—যিনি ১০০ মাইল দূর থেকে পাকিস্তানি মিলিটারির আওয়াজ শুনতেন—সেই তিনি লুইচ্যা হামিদের সংগে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ভোল পাল্টিয়ে বিএনপিতে যোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ই-পাসপোর্ট নিয়ে কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

আমার সর্বশেষ পাসপোর্টটি করেছিলাম ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। ততদিনে বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ই-পাসপোর্টের অন্যতম একটি বাড়তি সুবিধে ছিল এই যে চাইলে সেটা একসাথে দশ বছরের জন্য ইস্যু... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে"-.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪০




"বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে"- বাংলা সাহিত্যের এই বহুল পরিচিত পঙ্‌ক্তির মর্মার্থ আমরা সবাই জানি। তবে মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, বিশেষ করে শিশুদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত স্নেহ ও আন্তরিকতারও... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিথ্যে বলতে পারি না

লিখেছেন স্প্যানকড, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


ছবি নেট


মিথ্যে বলতে পারি না,
আজও আমি স্পষ্ট দেখি
ঘরের মেঝেতে এক টুকরো রোদ
জানি না কী করে যেতে হয় ভুলে
পুরনো সব রোগ
সেই ভালো হতো যদি মিশে যেতাম স্রোতে।

মিথ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন নিজে নিজে এআই দিয়ে, নেট ঘেটে ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির স্যারের সব সত্যতা পাচ্ছে...!

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬

বারডেম সহ সকল ডাক্তারদের উচিত নন কমিউনিকেবল ডিজিজ গুলো বেশি বেশি ঔষধ দিয়ে, ছয় বেলার জায়গায় দরকার হলে আরো কয়য়েক বেলা মুড়ি, বিস্কুট, খই এর সাথে আরো কিছু যোগ করে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×