somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দি ভলান্টিয়ার্স অব রাঙামাটি (পার্ট-২)

১৩ ই জুলাই, ২০১৯ বিকাল ৫:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুই
-------

এনি মারমা থাকে চট্টগ্রামের রহমান নগর আবাসিক এলাকায়।
বাবা-মা ছেড়ে লেখাপড়ার জন্যেই এখানে থাকতে হচ্ছে।
অন্যান্য দিনের মতোই অভ্যাসবশত ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে ১৩ জুন সন্ধ্যা বা রাতের দিকে ল্যান্ড স্লাইডের সংবাদ নজরে আসে। স্বাভাবিক উৎকণ্ঠা নিয়ে রাঙামাটিতে মায়ের কাছে ফোন করে। কিন্তু একের পর এক ব্যর্থ হতে হচ্ছে। প্রতিটি চেষ্টার ফলাফল একই -  যান্ত্রিক স্বরে ‘কাংখিত নাম্বারটি এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না’। কিংবা ‘কিছুক্ষণ পরে আবার চেষ্টা করুন’।  শুরুতে যে শব্দগুলো ছিল বিরক্তিকর, কিছুক্ষনের মধ্যেই সেগুলো যন্ত্রনাদায়ক হয়ে দাঁড়ালো।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে, উৎকণ্ঠার পারদ ক্রমান্বয়ে উপরে উঠছে।
এদিকে একের পরে এক চেষ্টা চলছে কারো না কারো সাথে যোগাযোগ করার।
ক্রমাগত চেষ্টার এক পর্যায়ে, তার পরিচিত এক বড় ভাই - ইকবাল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগে সক্ষম হয়। রাঙ্গামাটির একটি সংগঠন ‘ইয়ুথ’ এর সাথে জড়িত ইকবাল ভাইয়ের কাছ থেকে রাঙ্গামাটির খোঁজ খবর নিতে পারে। তবে নিজ পরিবারের ব্যাপারে তখনো কিছু জানতে পারেনি। তাই, উৎকণ্ঠা কমে না, বরং বাড়ে।  

একসময়  ফেসবুকে তার নজরে আসে যে, রাঙামাটিতে কিছু ভলান্টিয়ার্স ভূমিধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছে। তার ফেসবুক আইডিতে, এমনি একটা ইভেন্টের ইনভাইটেশনও পেয়ে যায়। শাফিনদের টিমের কোন একজনের কাছ থেকে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানতে পারে যে, রাঙ্গামাটির যে সকল শিক্ষার্থী চট্টগ্রামে আছে, তাঁরা নিজেরা ল্যান্ড স্লাইড ভিক্টিমদের জন্যে স্বেচ্ছায় কাজ করতে নেমে পড়তে যাচ্ছে। রোজায় মানুষ কেনাকাটা করতে যাবে। মূলত সেটা মাথায় রেখে, বিভিন্ন শপিং মলে বক্স নিয়ে কালেকশনে দাড়িয়ে যাবে।

আসলে, রাঙ্গামাটির শিক্ষার্থীরাই একদল বসে রাঙামাটিতে, আরেকদল চট্টগ্রামে। পরিকল্পনাটা মোটামুটি এরকম যে, চট্টগ্রাম থেকে কিছু সাহায্য কালেকশন করবে। তারপরে সেগুলো নিয়ে রাঙামাটিতে যাবে। নিজেরা একটা ফেসবুক গ্রুপ খুলে, ফেসবুকেই ইভেন্ট প্ল্যান করে ফেলে। পুরো বিষয়টা সমন্বয় করা হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। কিন্তু কাজ হচ্ছিল চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন সিনিয়ার ভাই এবং তাদের ফ্রেন্ডদের তত্ত্বাবধানে। সব কাজ একই সময়ে, এক সাথে, পাশাপাশি চলছিল, বিভিন্ন জায়গায়।

ইতোমধ্যে, একাধিকবার মায়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এনি কোনোমতেই কিছু করতে পারেনি। সারাদিনেও বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে উৎকণ্ঠা নিয়ে ফেসবুক নিয়েই পরে থাকতে হয়, আপডেট পাওয়ার আশায়। প্রতিটা মুহূর্তে ফেসবুকে ভুমিধ্বসের  ধ্বংসলীলার নতুন নতুন খবর আসছে, মৃতদেহের সংখ্যা বাড়ছে।  আর সেই সাথে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। অব্যক্ত উৎকণ্ঠা ততক্ষণে চাঁপা কান্নায় রূপ নিয়েছে। বুকের ভিতরে কাঁদতে না পারার অস্বস্তি ধীরে ধীরে বাড়ছে। প্রায় দেড়দিন পরে, মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়। রিং হওয়ার শব্দ শুনে, কান্না উঠে আসে গলায়।

“হ্যালো এনি। ... এনি? ....এনি ?” মায়ের উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ কানে আসে।
মোবাইলের অপর পাশে মায়ের গলা শুনে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে। নিঃশব্দ কান্নার দমকে এনি কতক্ষন কোনো কথাই বলতে পারে না। গলার স্বর যতটুকু সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। দম নিয়ে নিয়ে, বিরতি দিয়ে, কোনোমতে জিজ্ঞেস করে,

“কোথায় তুমি মা? কি অবস্থা?
“চিন্তা করো না। সব ঠিক আছ। আমরা বাসাতেই আছি।“
অতি প্রিয় কণ্ঠ শুনেই মায়ের আনন্দিত মুখের ছবি মানসপটে আঁকতে দেরী হয়না। শংকা কেটে যাওয়ার আনন্দ প্রতি শব্দের উচ্চারনে স্পষ্ট। তবে, এনির নিজের গলা এখনো পুরো স্বাভাবিক হয়নি। 

“কতবার চেষ্টা করছি। ফোনে পাই-ই না। আর, আমার টেনশন বাড়ে!“
“টেনশন করো না। কারেন্ট নেই। নেটওয়ার্ক নেই। তাই কল সংযোগ হয় নি।“ মায়ের কণ্ঠে নিখাদ ভালোবাসা ঝরে পড়ে। হাতে গোনা কয়েকটি শব্দের আড়ালে আশ্বাস এবং নির্ভরতার দেয়াল যেনো আরো  শক্ত হয়ে উঠে।
“বাসার কি অবস্থা সব ঠিক আছে তো?”
“আমাদের কিছু হয়নি। তুমি এর মধ্যে আসার চেষ্টা করো না। রাস্তা সব বন্ধ।“
“রাস্তা কালকের মধ্যে চালু হলেই, আমি চলে আসবো। শুনেছি অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে। এসে, আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করবো।”
বলতে বলতেই লাইন কেটে যায়। অথচ, আরো অনেক কিছু বলার ছিল। এর পরে আরেকবার কথা বলা সম্ভব হয়। তবে মাত্র ১-২ মিনিটের জন্য।

যে কোন উপায়ে এনিকে এখন রাঙামাটিতে ফিরতে হবে। কিন্তু রাস্তা বন্ধ। যাওয়ার উপায় নেই।  কয়েকজনের সাথে পরামর্শ করল। সবাই জানালো যে, কাপ্তাই হয়ে নৌকায় যাওয়াটাই একমাত্র উপায়।  কিন্তু সাতার জানে না বলে, সে কোনোমতেই নৌকায় চড়তে রাজী নয়। তার উপরে আবহাওয়া তখনো ভালো হয়নি, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত চলছিল।

১৬ তারিখে মায়ের সাথে কথা বলে, পরের দিন সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়ে পড়ে।
ভেঙ্গে ভেঙ্গে, প্রায় ৭ – ৮ বার সিএনজি পালটে ঘাগরা পর্যন্ত যেতে পারে। তারপরে আর কোন ধরনের যানবাহন চলাচলের উপায় নেই। কারণ, ঘাগরা বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে শালবাগান এলাকায় রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ। অন্যদের দেখাদেখি সেও হাটতে শুরু করে সামনের দিকে।

শালবাগান এসে বিস্ময়ে থ মেরে যায়।
দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, যেন কোনো এক অতিকায় দানব তার দানবীয়  হাতের থাবায় প্রায় শ’দুয়েক মিটার রাস্তা মাটি-গাছপালাসহ খাবলে তুলে ফেলেছে। সেই খাবলে নেয়া ভাঙ্গা রাস্তার নিচ দিয়েই মানুষ হেটে পার হচ্ছে। ছোট-বড়,  নারীপুরুষ, পাহাড়ী-বাঙ্গালি সব একাকার হয়ে গেছে। কেউ রাস্তা ছেড়ে কিছুটা পাহাড়ের উপরে, কেউ বা ভেঙে পরা মাটির পাশে, আবার কেউ কেউ ঢালের নিচে। সবাই একজন আরেকজনের পিছনে লাইন ধরে এগোচ্ছে।  

আর কোন উপায় না দেখে, এনি নিজেও রাস্তা ছেড়ে নিচে নামতে শুরু করলো।
এখন হাতের ব্যাগগুলো সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছিল, শুধু একটা ব্যাগ নিয়ে আসলেই চলতো! এখন এগুলো নিয়ে এই বিপদজনক রাস্তা কিভাবে পার হবে?  

দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন এক সহযাত্রী।
কাটা পাহাড়টুকু হেটে আসার সময়, তিনি নিজেই তার কাছ থেকে ব্যাগ দু’টো নিয়ে তাকে পিচ্ছল পাহাড়টুকু উঠতে-নামতে সাহায্য করলেন।
চলতে চলতেই তিনি জানতে চান - কিসে পড়ছে? কোথায় থাকে?এক পর্যায়ে বলেই ফেললেন যে, এমন পরিস্থিতিতে একা না আসলেও চলতো। কিন্তু এনির মুখে যখন শুনলো যে, তার মা-বাবা রাঙামাটিতে একা থাকে এবং সে আশ্রয়কেন্দ্রে ভলান্টিয়ার্স হিসাবে কাজ করবে, তখন খুব খুশি হলেন।

অন্য আরো অনেকের মতোই এনি তখন সেই পুরো পাহাড় পায়ে হেটে পার হয়। পায়ের নিচে কাঁদা, গাছের ডালপালা।  কয়েকবার পিছলে পড়তে পড়তে কোনোমতে বেঁচে যায়। তারপরে আরো অনেকটা পথ সামনে হেটে এসে, আবার সিএনজি নিয়ে রাঙামাটি পৌঁছে। তবে বাসায় যাওয়ার পথে সাথের ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে সরাসরি  হাজির হয় আশ্রয়কেন্দ্রে। যেখানে তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সরকারী কলেজের আশ্রয় কেন্দ্রে।

পথের মধ্যে পড়েছে যখন, একবার দেখে না গেলে কেমন হয়?

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০১৯ বিকাল ৫:৪৯
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পুলিশও মানুষ, তাদেরকে সাহায্যের জন্য আমাদেরও এগিয়ে আসা জরুরী

লিখেছেন মাহমুদুল হাসান কায়রো, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ১:৪৩

রাত বারোটা বেজে ১০ মিনিট। কাকরাইল চৌরাস্তায় একটা “বিআরটিসি এসি বাস” রঙ রুটে ঢুকে টান দিচ্ছিলো। কর্তব্যরত ট্রাফিক অফিসার দৌড় গিয়ে বাসের সামনে দাড়ালেন। বাস থেমে গেল। অফিসার হাতের লেজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবশেষে দৈত্যের পতন

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ২:৩১



ট্রাম্প দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরকারী সংস্হাকে কাজ শুরু করার অর্ডার দিয়েছে; আজ সকাল থেকে সংস্হাটি ( জেনারেল সার্ভিস এজনসীর ) কাজ শুরু করেছে, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের লোকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটার তো বাহাদুরি মমিনরা নিল, বাকি ভ্যাকসিন গুলোর বাহাদুরি তাহারা নেয় না কেন?

লিখেছেন এ আর ১৫, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৮:৫২



বাহাদুরির বিষয় হলে যারা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেন, তারা জবাব দিবেন কি?
কার্দিয়ানিরা মুসলমান নহে কিন্তু যেহেতু বাহাদুরির বিষয় তাই ডঃ সালাম হয়ে গেলেন মুসলমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

নভোনীল পর্ব-১৪ (রিম সাবরিনা জাহান সরকারের অসম্পূর্ণ গল্পের ধারাবাহিকতায়)

লিখেছেন ফয়সাল রকি, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৫১



- ময়ী, ময়ী! আর কত ঘুমাবি? এবার ওঠ।
দিদার ডাকতে ডাকতে মৃনের রুমে ঢুকলো। মৃন তখনো বিছানা ছাড়েনি। সারারাত ঘুমাতে পারেনি। ঘুমাবে কী করে? রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা ভর করেছিল ওর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৌষের চাদর – মাঘের ওভারকোট

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৬




চাদর ম্যানেজ করতে পারতাম না বলে কায়দা করে প্যাচ দিয়ে একটা গিটঠু মেরে দিলে আমি দৌড়ানোর উপযুক্ত হতাম । লম্বা বারান্দা দিয়ে ছুটতাম । অবাক চোখে পৌষের কুয়াশা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×