
একদিন খুব করে কোষে-কোষে মাজায় গামছা বেঁধে তাকে নিয়ে ভালোবাসার কবিতা লিখলাম।ওতে তার নাকি মন ভরেনি।তাকে নিয়ে প্রতিদিন বৈকালিক আড্ডা দিতে হবে জাদুর শহরের পাশে।এটা তার আদেশ বা অনুরোধ।তার দেওয়া হলুদ পাঞ্জাবিটা পড়ে এক বৈকালিক সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে খুব করে আইসক্রিম খেয়ে জিব্বার পাতায় রং আঁকলাম।একজন আরেকজনকে জিহ্বা বের করে দেখাতাম কার কতখানি রং বেশি হয়েছে।রাস্তার পাশের পথচারীরা আমাদের পাগলামো ভালোবাসা দেখে একটু দাঁড়িয়ে আবার হাটা শুরু করতো।
দুজনের সাপ্তাহিক এক আয়োজন ছিল। টিএসসির চত্বরে বসে আমার হাত পায়ের নখ কেটে দিতো। নখের সাথে চামড়া তুলে আনতো।সে এক বিভীষিকাময় স্মৃতি!টিএসসি চত্বরে লোক জমে যেত আমার চামড়া হারানোর আর্তচিৎকার শুনে।ও ভয়ে কাঁপা ঠোঁটে চুমু দিত ক্ষণে ক্ষণে আমাকে শান্ত করার আশায়।যতটা না ব্যথা পেতাম তার চেয়ে ভান ধরতাম বেশি।তার চুমু পাবার আশায়। নিজেকে খুব সুখী মনে হতো তখন। জীবনটাকে সুন্দর মনে হতো।
এক বিকেলে আমার একটুখানি পায়ে ব্যথা পাওয়ায় তার কি যে চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। কোমরে ভালোবাসার দড়ি বেঁধে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে ।ফের সাত দিন তো আমার কত যত্ন।ঠিকমতো গোসল, ঘুম,খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ ইত্যাদি ইত্যাদি ।তার যেন টেনশনের শেষ নেই। সহজ-সরল মেয়েটা খুব ভালোবাসতো আমাকে।
শীতের দিনে এক চাদরে বসে বসে বাদাম খেতাম দুজন সংসদ ভবনের সামনে। তাকে তীব্র শীতে বাসায় পৌঁছে দিতাম প্রতিদিন।নিজের বাসায় তখন টুক টুক করে হেটে ফিরতাম অনেকটা পথ।ক্লান্তি লাগতোনা। সত্যিকারের ভালোবাসা ভোরের মতো।সকালবেলার সূর্যের আলোর মতো।বাতাসের মতো।রবীন্দ্রনাথের গানের মতো।হাটার মাঝে ওর কথা ভাবতাম।আমাদের সারাদিনের লাল,নীল ও হলদেটে ভালবাসাবাসির কথা ভাবতাম ।এর মাঝে ওর সরল আদরে দু-একটা মুঠোফোনে বার্তা।আমার হাটতে কষ্ট হচ্ছে নাকী??এই হিম বাতাসে মাঝে খানিকটা আরাম করে রিকশায় ফিরলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত!
আমার ওপর রাগ করলে আমার বুকেই মাথা রেখে কান্না করতো । আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে একশো একবার সরি না বললে কান্না থামাতো না। অনেক সময় দুজনেই খুব নিশ্চুপ থাকতাম। ওর অনামিকা আঙ্গুল দিয়ে আমার হাটুর একটু উপরে খোঁচা দিত তামিল নায়িকাদের মত করে।চিমটি কাটতে ভালবাসতো।
অনেক কষ্ট পেয়ে আমার বুকে এসে মাথা রেখেছিলো মেয়েটা। ভালবাসার প্রথম দিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তাকে কাঁদাবো না কোনদিন।বড় কষ্ট দিয়ে তাকে কাদায় নি কখনো।
আমি কবিতা লিখতাম। ভালবাসার প্রথম দিন থেকেই তাকে একটা করে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে হতো সাথে একটা করে ছোট গল্প।হাজার খানেক গল্প লিখে রেখেছিলাম তার জন্য।প্রতিদিন একটা করে গল্প নিয়ে যেত ভ্যানিটি ব্যাগে করে বাসায়।গল্প ভালো লাগলে পরদিন এসে একটা আদুরে চুমু দিতো কপালের মাঝবরাবর। কাগজে লিখে নিয়মিত চিঠি দিতাম।সে যত্ন করে তার ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে আমার হাত ধরে ঘুরতো পুরোটা শহর।
আজও সে ঘোরে। একা একা কল্পনায় ।কি সব যেন ভেবে হাসে!জাদুর শহর তার কষ্টটুকু বুঝলে থমকে দিত নাগরিক কোলাহল কিছুদিনের জন্য।আমিও ঘুরি।আমার কষ্টটা অন্যরকম ।অনুভূতি শূন্য এক মানুষ। বুকে চাপা চাপা কষ্ট।দেখা যায় না ছোঁয়া যায় না ভেতরে অনবরত রক্তক্ষরণ।আশীর্বাদপ্রাপ্ত সুখী দুটো মানব-মানবীকে এভাবে বোহেমিয়ান মত ঘুরতে দেখে আজকাল জাদুর শহর ঢাকা অনেক সহজ বিষয়ের হিসেব মিলাতে পারে না।গম্ভীরমুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



