কন্যা বললো, জ্যামিতি কঠিন লাগে, বাবা। বাদ দেয়া যায় না?
আমি বললাম, তুমি কি তোমার ধীশক্তি ও প্রজ্ঞা প্রসারিত না করে ক্ষুদ্র গণ্ডির ভেতর রেখে দিতে চাও?
জ্যামিতির সঙ্গে ধীশক্তি ও প্রজ্ঞার সম্পর্ক কী?
জ্যামিতি মানুষের বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি করে, তাকে যুক্তিবাদী করে তোলে।
কে বলেছে এই কথা?
এখন বললাম আমি, আগে বলে গেছেন ইবনে খালদুন।
ইবনে খালদুন কে?
মধ্যযুগের বিখ্যাত চিন্তাবিদ—ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, অর্থনীতি, জনসংখ্যাতত্ত্বের অগ্রদূত বলা হয় তাঁকে।
তিনি কী বলেছেন?
বলেছেন: জ্যামিতি শাস্ত্র আলোকিত করে আমাদের ধীশক্তি, মনকে ধাবিত করে সঠিক পথে। এর সকল প্রমাণাদি সুস্পষ্ট ও সুসজ্জিত। জ্যামিতিক যুক্তিতে ভুলের অনুপ্রবেশ প্রায় অসম্ভব, কারণ এটি সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল। ফলে যার চিত্ত সবসময় অনুসরণ করে থাকে জ্যামিতি, তার পক্ষে সম্ভাবনা নেই ভুলে পতিত হওয়ার। সরল এই পন্থায়, যে রাখে জ্যামিতির জ্ঞান, সে অর্জন করে প্রজ্ঞা।
কোথায় বলেছেন তিনি এ কথা?
আল মুকাদ্দিমা নামে তাঁর জগদ্বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থে।
ইতিহাসে জ্যামিতি! অনেক মজার তো।
হ্যাঁ, মজার। এবার একটি কিংবদন্তি শোনো।
বলো, নড়েচড়ে বসে মেয়ে।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রাচীন গ্রিসে সংঘটিত হয়েছিল সুদীর্ঘ ভয়াবহ এক যুদ্ধ যাতে জড়িয়ে পড়েছিল গ্রিসের প্রায় সকল নগররাষ্ট্র। দক্ষিণ গ্রিসের পেলোপনিস উপদ্বীপের নামানুসারে এ যুদ্ধের নাম হয় পেলোপনিসীয় যুদ্ধ। এতে এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিল এথেন্স, অন্য পক্ষে স্পার্টা। তো যুদ্ধের এক পর্যায়ে এথেন্সে শুরু হলো ভয়াবহ এক প্লেগের প্রকোপ। এথেন্সবাসী ভাবল, দেবতা অ্যাপোলোর শাস্তি। তারা দূত পাঠাল অ্যাপোলোর মন্দিরে ওরাকল শুনতে। অ্যাপোলোর সন্ন্যাসিনী বললো, তার মন্দিরের ঘনক আকৃতির বেদী বিশুদ্ধ জ্যামিতিক নিয়মে দ্বিগুণ করতে হবে। কিন্তু এথেন্সের সেরা সব গণিতবিদ মিলেও অ্যাপোলোর বেদী দ্বিগুণ করার হিসেবটি বের করতে পারল না। প্লেগে ধ্বংস হয়ে গেল এথেন্সের এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসী।
কিন্তু, বাবা, এথেন্সবাসীগণ দ্বিগুণ আয়তনের চত্বর নির্মাণ করতে পারল না কেন? ব্যাপারটি তো তেমন কঠিন মনে হচ্ছে না।
সমস্যাটি ছিল বিশুদ্ধ জ্যামিতিক নিয়মে একটি ঘনকের দ্বিগুণ আয়তনের ঘনক নির্মাণ করা। অর্থাৎ ঘনকের কোনো বাহু কিংবা কর্ণের মাপটি বিশুদ্ধ জ্যামিতিতে বের করতে হবে। এ শর্তের কারণে আয়তনটি চট করে দ্বিগুণ করে ফেলার মতো বিষয় ছিল না।
এ আবার কীরকম নিয়ম?
মানে তুমি কেবল দাগহীন মাপকাঠি (straightedge) এবং বৃত্তাঙ্কনশলাকা (compass) ব্যবহার করতে পারবে, অন্য আর কোনো পরিমাপক যন্ত্র নয়।
স্কুলে আমরা যেভাবে জ্যামিতির সম্পাদ্য অঙ্কন করে থাকি, ঠিক সেভাবে আঁকতে বা মাপতে হবে?
ঠিক ধরেছ। এ সমস্যাটি প্রাচীন গ্রিসে যারাই রুলার ও চাঁদার সাহায্যে কিংবা অন্যভাবে সমাধান করার চেষ্টা করত, তাদের কপালে জুটত তিরস্কার। বলা হতো, এরূপ সমাধান যান্ত্রিক, রুলার ও চাঁদা ব্যবহার করবে তো শ্রমিকগণ, পণ্ডিতগণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, প্লেটো, যিনি সমস্যাটি উদ্ভবের প্রায় পরপর এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সক্রেটিসের শিষ্য ও দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, বলতেন যে এ ধরণের সমাধানে জ্যামিতির বিশুদ্ধতা উপেক্ষিত ও নষ্ট হয়, কারণ এতে বিষয়টিকে আমরা চিন্তাচেতনার শাশ্বত ও বিমূর্ত রূপ প্রয়োগের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত ও উন্নত করি না, যেরূপ প্রয়োগ করে থাকেন স্রষ্টা, বরং একে নামিয়ে নিয়ে আসি পার্থিব জগতে।
বুঝেছি, বাবা, মাথা নাড়ে মেয়ে।
আরেকটি বিষয়, মাথায় রাখবে, সূক্ষ্মভাবে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান করার প্রসঙ্গে শ্রমিকগণ এবং তাঁদের ব্যবহৃত চাঁদা ও রুলারের কথা এসেছে এখানে। কিন্তু সূক্ষ্মতা-স্থূলতার এরূপ আলোচনায় শ্রমিকদের প্রতি কখনও যেন অবজ্ঞা প্রকাশ না পায়। মনে রাখবে, একজন পণ্ডিত বা দার্শনিক যত বড় তত্ত্ব, দর্শন দিন না কেন, তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করে শ্রমিক বা সাধারণ মানুষ বাস্তবে তা প্রয়োগ করে কি না। শ্রমিক নির্ভর করে পণ্ডিতের উপর পথের সন্ধানে, পণ্ডিত নির্ভর করে শ্রমিকের উপর বাস্তবে সেই পথের নির্মাণে।
জ্বি, বাবা। আমি শ্রমিকদেরও শ্রদ্ধা করব। পণ্ডিতদের বড় করতে গিয়ে তাঁদের ছোট করব না।
গণিত গল্পগ্রন্থ ভয়ংকর সারাসিন জাদু'র পাতা থেকে। বই লেখা কঠিন, শেষ হতে চায় না, আপাতত কিয়দংশ শেয়ার প্রিয় পাঠকদের সঙ্গে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০১৮ ভোর ৪:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


