somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এশিয়ায় পানিযুদ্ধ?

২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ১:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এশিয়াতে পানি নিয়ে ভাবনা বেড়েই চলেছে এবং এটা শুধুমাত্র সমুদ্রসীমা বিরোধের কারণে নয়। যদিও স্থানীয় বিরোধ যেমন দক্ষিণ চীন সাগর, যেটা সবচেয়ে বেশী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে- সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা এবং পরিভ্রমণ স্বাধীনতা যেখানে হুমকিস্বরূপ, যা বহিঃশক্তিকেও প্রভাবিত করেছে- প্রাকৃতিক মিঠাপানির উপর কৌশলগত প্রতিযোগীতা ভীতিকর পর্যায়ে আছে।

অন্য যেকোন মহাদেশের চেয়ে এশিয়ায় মাথাপিছু মিঠাপানির পরিমাণ এমনিতেই কম এবং এই সমস্যা এতই প্রকট যে, ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই সমস্যা চলতেই থাকবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে । ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক অনৈক্যের এই সময়, প্রাকৃতিক মিঠাপানি নিয়ে এই বিরোধ এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে, যেখানে চীন প্রধান আগ্রাসক। প্রকৃতপক্ষে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দখলদারিত্ব বহুজাতিক নদী অববাহিকার সম্পদ আহরণের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। আন্তঃসীমান্ত তীরবর্তী প্রবাহের পুনঃপ্রকৌশল মূলত এশিয়াতে চীনের আরও বেশী নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব জাহির করার কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চীন অবশ্যই এই কৌশল অবলম্বনের পক্ষে যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দেশটি ১১০ টি বহুজাতিক নদী ও হ্রদ যেগুলো তীরবর্তী ১৮ টি নিম্ন অববাহিকার দেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, সেগুলোর উপর অপ্রতিম আধিপত্য ভোগ করে।

চীনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী বাঁধ আছে, যেগুলো ব্যবহার করে সে আন্তঃসীমান্ত নদীপ্রবাহ দমনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। আসলে, চীন তার বাঁধগুলো যেসব আন্তর্জাতিক নদী চীনা ভূখন্ডের বাইরে প্রবাহিত হয়েছে সেগুলোকে লক্ষ্য করেই তৈরি করেছে। চীনের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক পানিসম্পদ তিব্বতীয় মালভূমিতে অবস্থিত, যা ১৯৫০ সালের শুরুর দিকে চীনের সাথে সংযুক্ত হয়। স্বাভাবিকভাবে মালভূমিটি চীনা বাঁধ নির্মাণের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সত্যই, এ বছর ছাড়া চীনের ১৩ তম ৫ বছর মেয়াদী পরিকল্পনায় নতুন ঢেউ সৃষ্টি করেছে। অধিকন্তু, চীন সম্প্রতি তিব্বতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদ, যা বাংলাদেশ ও উত্তর ভারতের লাইফলাইন- প্রবাহ আটকে দিয়েছে। এছাড়া দেশটি ব্রহ্মপুত্রের কয়েকটি উপনদীর উপর নতুন বাঁধ নির্মাণ করছে কৃত্রিম লেকের সারি বানাতে। উপরন্তু, চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বয়ে চলা মেকং নদীর উপর ছয়টি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছে যার প্রভাব নদীটির ভাটি অঞ্চলে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তথাপি, বাঁধ নির্মাণের লাগাম টেনে ধরার বদলে দেশটি মেকং নদীর উপর আরও বাঁধ নির্মাণে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। একইভাবে, চীন ‘ইলি নদী’ থেকে বড় আকারে পানি অপসারণ করায় কাজাখস্তানের ‘বলখাশ লেক’, যা ৪০ বছরের কম সময়ের মধ্যে প্রায় শুঁকিয়ে গেছে, সেভাবেই যথেষ্ট সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে গেছে- আর মধ্য এশিয়ার শুষ্ক অঞ্চলে পানি প্রবাহ ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপরন্তু চীন, কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় পানযোগ্য পানি সরবরাহকারী এবং রাশিয়ার ‘অব নদী’তে পানি প্রবাহী ‘ইরতিস নদী’র গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। মধ্য এশিয়ার জন্য এই ‘আন্তঃসীমানা প্রবাহ’ প্রবল সমস্যার একটি অংশমাত্র ।

চীনের জিনজিয়াং এর বিস্তৃত অঞ্চলে বিদ্যুৎ, শিল্প এবং কৃষিজ কর্মকান্ডের ফলে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ ও সার মিশ্রিত হয়ে দূষিত হচ্ছে, যেমনটা তারা ‘হান মালভূমি’তে বিভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে করেছে। পানি নিয়ে বিরোধে অবশ্যই চীন একাই ইন্ধন জুগাচ্ছে না। যেমন, প্রতীয়মান হয় যে, কাশ্মীর নিয়ে স্থানিক বিরোধ যতটা না জমি নিয়ে তারচেয়ে বেশী পানি নিয়ে। যেমন, পাকিস্তান এই দশকে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের বিরুদ্ধে ১৯৬০ সালের ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে অভিযোগ দায়ের করেছে। আপাতবিরোধী হলেও সত্য যে, পাকিস্তান দুনিয়ার সবচেয়ে উদার পানি ভাগাভাগি চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে দেশটি সিন্ধু নদীর ছয় শাখা নদীর ৮০% পানি সংরক্ষণ করছে- যার কারণে ভারতের সাথে তাদের বিরোধ চলছে। ইতিমধ্যে, উপকূলহীন লাওস- বিদ্যুৎ রপ্তানির উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে চীনে, যে দেশটি আবার লাউসের প্রধান অর্থনৈতিক অবলম্বন- তৃতীয় বিতর্কিত প্রজেক্ট ৯১২ মেগাওয়াট ‘পাক মেং ড্যাম’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা তার প্রতিবেশীদের জন্য সতর্কবাণী ছড়াচ্ছে। দেশটি এর আগে প্রাকৃতিক প্রবাহের দিক পরিবর্তনে আঞ্চলিক উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে ‘জায়াবুরি’ এবং ‘ডন সহং’ বাঁধ প্রজেক্টের কাজ সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে, এখন এর চেয়ে ভিন্ন কোন ফল আশা করার কোন কারণ নেই। পানি নিয়ে এই প্রতিযোগিতা আরও বড় আকার ধারণ করে এশিয়ার বাইরের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে যাবে।

ইতঃপূর্বে এশিয়ার কিছু রাষ্ট্র, যারা নিজেদের খাদ্য উৎপাদন নিয়ে চিন্তিত ছিল, তারা আফ্রিকার সাব-সাহারার মরু প্রান্তরে বিশাল কৃষি জমি ইজারা নিয়েছে, যার ফলে কিছু অঞ্চলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ২০০৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘Daewoo Logistic Corporation' আফ্রিকার মাদাগাস্কারে সেখানকার অর্ধেকের বেশি কৃষিজমি ইজারা নিয়েছিল, যেখানে তারা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারের জন্য ‘সিরিল’ এবং ‘পাম অয়েল’ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছিল, যার জের ধরে ঘটা প্রতিবাদ আর সামরিক হস্তক্ষেপে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের একজন প্রেসিডেন্টের পতন হয়েছিল।

এশিয়ার পানি সম্পদ নিয়ে এই বিরোধ কৃষি আর মৎস্য খাতকে চাপে ফেলেছে, বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করছে, আর বিস্তৃত অঞ্চলে বিপজ্জনক অবিশ্বাস আর কলহ লালন করছে। এটার একটা শেষ খুব দরকার। এশিয়ার দেশগুলোকে এই ক্রমবর্ধমান ‘পানি রাজনীতি’ ঘোলাটে হওয়ার আগেই পরিষ্কার করা দরকার। এক্ষেত্রে একটি কৌশলী বিতর্ক প্রক্রিয়া এবং মতৈক্য মিঠাপানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে ।

এশিয়া একটি সমন্বয়পূর্ণ ও নিয়মভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম বানাতে পারে। কিন্তু, চীনকে এজন্য নেতৃত্ব দিতে হতে পারে। যদিও এই সময় এটা সম্ভব বলে মনে হয় না।

- প্রজেক্ট সিন্ডিকেট হতে সংগৃহিত
- মূলঃ ব্রহ্মা চেলানী
- ভাষান্তরঃ মোয়াজ্জেম হোসেন
-
ব্রহ্মা চেলানী, নয়াদিল্লী কেন্দ্রিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ এর স্ট্রাটেজিক ষ্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এবং বার্লিনের রবার্ট বচ্ একাডেমীর ফেলো। তিনি একাধারে আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিষয়ে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, লেখক এবং বুদ্ধিজীবী। তিনি ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাষ্ট এর পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য। এছাড়া তিনি নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিষয়ক বার্ষিক কমিটির সম্মানিত ফেলো এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি একজন সফল লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এ পর্যন্ত তার ৯ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকার জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বই 'Water: Asia's New Battleground' ২০১২ সালে বার্নার্ড শোয়ার্টজ বুক অ্যাওয়ার্ডে ভুষিত হয়। বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রকাশের অন্যতম প্লাটফর্ম ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’ ওয়েবসাইটে পানি নিয়ে সম্ভাব্য যুদ্ধ বিষয়ে তিনি নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেছেন।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ১:৪৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×